জিয়াউর রহমানের কীর্তিগাথা : সাইফুল ইসলাম শুভ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৮:৫৯, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জিয়াউর রহমানের কীর্তিগাথা : সাইফুল ইসলাম শুভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১৯, ২০২৩ ১:০৩ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১৯, ২০২৩ ১:০৩ পূর্বাহ্ণ

 

রণাঙ্গনের যোদ্ধা জিয়া
সময়টা ১৯৬৫ সাল। কাশ্মিরের অধিকারপ্রশ্নে পাক-ভারত যুদ্ধের উন্মত্ততা উপমহাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে নড়িয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। আমেরিকার সাথে সেন্টো-সিয়াটো চুক্তির বলে বলিয়ান হয়ে পাক-প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান প্রাসাদ ছেড়ে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন যুদ্ধের ময়দানে। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তো সোভিয়েত ইউনিয়নের ভরসায় ভোরবেলায়ই লাহোর দখল করে ‘নাস্তা সেরে’ গোটা পাকিস্তানকেই নিশ্চিহ্ন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এমনই কঠিন পরিস্থিতিতে পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর রক্ষার ডাক পড়ল লে. কর্নেল আতিক হকের নেতৃত্বাধীন ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাদের ওপরে। আবহমানকাল ধরে ‘যোদ্ধার জাত নয়’ বলে অবহেলিত বাঙালি সৈনিকদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে লাহোরের উপকণ্ঠে এসে সেদিন থেমে গিয়েছিল ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা। আর সে দিনের সেই সফল প্রতিরোধ যুদ্ধের অন্যতম নায়ক ছিলেন পাকিস্তান আর্মির তরুণ অফিসার জিয়াউর রহমান। অসীম সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখে মাত্র ৪৬৬ জন সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে তিনিই প্রথম ভারতীয় বাহিনীর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তারই অধীনস্থ সৈনিক তাজুল ইসলাম নিজের বুকে মাইন বেঁধে আগুয়ান ভারতীয় ট্যাংক বহরের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দিলেন। লাহোর রক্ষার সেই যুদ্ধে অভ‚তপূর্ব বীরত্বের জন্য জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘হিলাল-ই-জুররাত’ পদক লাভ করেছিলেন। আর তার ইউনিট তিনটি সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘সিতারা-ই-জুররাত’ ও ৯টি চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘তঘমা-ই-জুররাত’ অর্জন করেছিল।

স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া
উত্তাল মার্চ, ১৯৭১। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার কালেই ঘোষণা করেছিলেন, জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে এবং পাকিস্তানের উভয় অংশের জনগণের পক্ষেই গ্রহণযোগ্য হবে এমন একটি সংবিধান প্রণয়নে তিনি বদ্ধপরিকর। আর এ জন্য তিনি ঘোষণা করেছিলেন ইতিহাস খ্যাত ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’। আর এই আইনগত কাঠামো আদেশের ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ’৭০-এর সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন। আইনগত কাঠামো আদেশে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রথম কাজ হবে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রেখে গোটা পাকিস্তানের জন্যই একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান প্রণয়নে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, তারপরে ক্ষমতা। দলগুলো এসব শর্ত মেনে নিয়েই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল এবং আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে আওয়ামী লীগের জয়লাভের ফলে, তাদের বয়ানও পাল্টে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তার পূর্বঘোষিত ছয় দফার ভিত্তিতেই পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনায় অনড়, অন্যদিকে ছয় দফা ছিল ইয়াহিয়া খান ও নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর কাছে ‘স্পষ্টতই বিচ্ছিন্নতাবাদ’ তথা পাকিস্তান ভাঙার যড়যন্ত্র। অবশ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে দুই পাকিস্তানের মধ্যে কনফেডারেশন করার প্রস্তাব দিলেও, তা অদূরদর্শী পাকিস্তানি শাসকরা গ্রহণ করেনি। ফলে আলোচনা ভেস্তে যায়। ২৫ মার্চের কালো রাতে ব্যারাক ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে পাকবাহিনী। শুরু করে ব্যাপক তাণ্ডবলীলা, জাতি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আর সেই কঠিন সময়ে, ত্রাতারূপে জাতির সামনে হাজির হয়েছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। ২৫ মার্চের কালো রাতের পরে যখন সমগ্র জাতি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য, যখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নিজের ও পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে সরে গেছেন, যখন ইয়াহিয়া খান ঘোষিত ‘ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ স্বেচ্ছায় আর্মির হাতে ধরা দিয়ে পশ্চিমে চলে গিয়েছেন, যখন তার মর্দে মুজাহিদ, বীর সিপাহসালাররাও কলকাতায় চলে গিয়েছিল নিরাপদ আশ্রয়ে, যখন জনতা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছিল না, কী করণীয়, কী বর্জনীয়, কী করলে দেশ নিরাপদ ও শত্রুমুক্ত হতে পারে, ঠিক তখনই চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে উর্দিপরা জিয়াউর রহমান জাতিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘উই রিভোল্ট’ অর্থাৎ আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলাম তথা আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আর শুধু ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি, নিজেরই কমান্ডিং অফিসার কর্নেল জানজুয়াকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা করে দেশকে শত্রæমুক্ত করতেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। মেজর জিয়ার সেই স্বাধীনতার ঘোষণা পৌঁছে গিয়েছিল শহর থেকে গ্রামে, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের খেটে-খাওয়া কৃষক-শ্রমিক যুবকদেরও।

জনগণের প্রাণের জিয়া
সময়টা ১৯৭৫ সাল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি তখন বড়ই টালমাটাল। একদিকে, ভারত কর্তৃক ছলে-বলে-কৌশলে স্বাধীন রাষ্ট্র সিকিম দখল যেমনি একদিকে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস উত্তোলন নিয়েও বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। ঠিক তখনই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে সেনাবাহিনী কর্তৃক নিহত হলে, দেশের শাসনক্ষমতার অধিকার নিয়ে চলছিল চরম অরাজকতা ও অনিশ্চয়তা। শেখ মুজিবুর রহমানের পরে ক্ষমতার মসনদে আসীন হন, তারই এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা খন্দকার মোশতাক আহমেদ। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী উপরাষ্ট্রপতিকে পাশ কাটিয়ে তার এই ক্ষমতাগ্রহণ বৈধতা পায়নি পার্লামেন্টে এমনকি সশস্ত্র বাহিনীরও একাংশ মোশতাককে হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণে ছিল উন্মুখ। ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর খন্দকার মোশতাককে হটিয়ে ক্ষমতাগ্রহণ করেন ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে পরিচিত জেনারেল খালেদ মোশাররফ। তিনি ক্ষমতায় এসে প্রথমেই নিখাঁদ দেশপ্রেমিক ও মহান স্বাধীনতার ঘোষক বলে তুমুল জনপ্রিয় সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেন। কিন্তু মাত্র তিন দিনের মাথায় ’৭৫-এর ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহের তার বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে অভ্যুত্থানে ঝাঁপিয়ে পড়লে খালেদ মোশাররফ নিহত হন এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। কার্যত কোনো সরকার না থাকায় তখন সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত প্রয়াসে জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ৩০ মে তার প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ে হ্যাঁ-না ভোট অর্থাৎ গণভোটের মাধ্যমে বিপুল ম্যান্ডেট পেয়ে উর্দি ছেড়ে জনগণের কাতারে নেমে আসেন।

শাসক হিসেবে শহীদ জিয়া
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান যখন প্রথমবার ভারত সফরে গিয়েছিলেন তখন প্রোটোকল ভেঙে ভারতের রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি ও প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই দু’জনেই তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে দিল্লি বিমানবন্দরে হাজির হয়েছিলেন। ক্ষমতাগ্রহণের পর জিয়াউর রহমান বাঙালি-অবাঙালি, মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি-বিপক্ষের শক্তি ইত্যাদিতে শতধাবিভক্ত জাতিকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ভাষাতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদের বদলে ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ তথা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষকে বাংলাদেশী হিসেবে পরিচয়দান করেছিলেন। ফলে গোটা দেশবাসী একই পরিচয়ে ঐক্যের এক সুতায় গ্রথিত হয়েছিল। অন্য দিকে, যেসব প্রতিভাবান ও পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক নাগরিক বিভিন্ন কারণে মহান মুক্তিযুদ্ধে শামিল হতে পারেননি, তাদেরও তিনি যোগ্যতামাফিক রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশগ্রহণ করে দেশসেবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সব ধরনের স্বৈরতান্ত্রিকতাকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে তিনি বাকস্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে ও এর সমাজব্যবস্থাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নয়, দেশের স্বার্থরক্ষা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নেও তিনি ছিলেন শতভাগ সফল। ভারত অন্যায়ভাবে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ দখল করলে, তিনি কোস্টগার্ড পাঠিয়ে যেমন সেটি পুনরুদ্ধার করেছিলেন, ঠিক তেমনি পুরো জাতিকে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে ফারাক্কা বাঁধের ফলে আমাদের পানি সমস্যাটিকেও আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরেছিলেন। আমেরিকা, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে তিনি পারস্পরিক সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্কের নবদিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। আজকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের যে দুটি প্রধান মাধ্যম তথা রেমিট্যান্স বা জনশক্তি রফতানি ও গার্মেন্টস ব্যবসায় বিদেশী বিনিয়োগ তারই দূরদর্শী ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির সুফল।
পরিশেষে বলা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতো না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসত না, মানুষের বাকস্বাধীনতা থাকত না। আজ ১৯ জানুয়ারি, ৮৭তম জন্মদিনে জিয়াউর রহমানের প্রতি রইল অফুরান শুভেচ্ছা, গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক : শিক্ষার্থী
E-mail: syfulislam01799@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ