আমেরিকার গণতন্ত্র সম্মেলন ও বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৩ ৫:৪৫ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৩ ৫:৪৫ অপরাহ্ণ

এম হুমায়ুন কবীর
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্সিলর ডেরেক শোলে কয়েক দিন আগে ঢাকা সফর করে গেলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের কাছে আমেরিকা গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি রোডম্যাপ প্রত্যাশা করেছিল। সেটি তারা দেখতে পায়নি বলেই বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এটি আমাদের কারোরই জানার কথা ছিল না। যেহেতু তিনি জনসমক্ষে এটি বলেছেন, তাই আমরা সবাই এখন জানতে পারছি।
এখন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, গণতন্ত্র বলতে আমরা কী বুঝব? আমাদের দেশের একটি দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য রয়েছে। সেই আলোকে বিবেচনা করলে আমেরিকার গণতন্ত্র সম্মেলনে আমাদের আমন্ত্রণ পাওয়া উচিত ছিল। আমাদের দেশ যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে, আমরা সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছি; সেটির পেছনে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি দুটি প্রধান বিষয়ও ছিল। সে দুটির একটি হলো, পাকিস্তান আমাদের গণতান্ত্রিক পথকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লড়াই করতে হয়েছিল। আরেকটি হলো, বৈষম্য কমিয়ে আনা। পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের ভূখণ্ডে যে বৈষম্য জারি রেখেছিল, সেসব থেকে মুক্তি পেতে আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলাম। একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। তাই বলা যায়, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গণতন্ত্রের বিষয়টি জড়িত ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গত ৫০ বছরে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে আমরা নানা লড়াই-সংগ্রাম দেখেছি। যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য, সেই বাংলাদেশ গণতন্ত্রের একটি আদর্শ ভূমি হবে- এটা ছিল প্রত্যাশিত। গণতান্ত্রিক দেশের সামনের সারিতে থাকার কথা ছিল আমাদের। কিন্তু আমরা তা পারলাম না। যেখানে আমেরিকার গণতন্ত্র সম্মেলনে ১১০টি দেশ যাবে, সেখানে বাংলাদেশ আমন্ত্রণ পেল না- এটা আমাদের প্রত্যাশার বাইরে। এ সম্মেলনে বাংলাদেশ আমন্ত্রণ পাবে- এটা আশা করেছিলাম। তা না হওয়ায় খানিকটা হতাশ হয়েছি।
আরেকটি বিষয় এখানে খেয়াল রাখতে হবে, গণতন্ত্র কেবল আমেরিকা আমন্ত্রণ জানাল কিনা, এর ওপর নির্ভর করে না। এটি একটি বৈশ্বিক আমন্ত্রণ। এর চেয়েও লক্ষণীয়, আমরা আমাদের সক্ষমতা কতটা বাড়াতে পেরেছি; গণতন্ত্রের জন্য যে সবার অংশগ্রহণ অপরিহার্য, তা কতটা নিশ্চিত করতে পেরেছি- এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা এখন যে বড় ধরনের উন্নয়নের কথা বলছি, তার প্রধান চালিকাশক্তি সব মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সেটি করছে বলেই আমাদের অর্থনীতিতে অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্বব্যাপীও আমাদের অর্থনীতি নিয়ে একটি সুনাম তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন অর্থনীতিকে সব মানুষের জন্য উপাদেয় করা। এ ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করা যেতে পারে তখনই, যখন একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গণতান্ত্রিক অবস্থা নিরাপদ থাকে। সেটি হতে পারে রাজনৈতিক পদ্ধতিটি যদি গণতান্ত্রিক হয়।
আমাদের যে রাজনৈতিক ঐতিহ্য, সেই ধারাবাহিকতায় আগামী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হওয়া দরকার। সেটি করা গেলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন আরও সহজ হবে। এখন আমাদের দেশে প্রচুর বিনিয়োগ দরকার। সরকারের পক্ষ থেকেও বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলা হয়। এ বিনিয়োগ আসতে হলেও রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও অগ্রগতি খুব জরুরি। উন্নত দেশগুলো থেকে আমাদের এখানে যাঁরা বিনিয়োগ করবেন, তাঁদের সামনে গণতন্ত্রকে চলমান ও শক্তিশালী হিসেবে হাজির করতে হবে। আমরা যদি আমাদের গণতন্ত্রকে বিনিয়োগকারীদের সামনে অগ্রগামী ও শক্তিশালী হিসেবে দেখাতে পারি তাহলে তাঁরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। এখন যে অর্থনৈতিক ধারবাহিকতা, সেটিও অব্যাহত থাকবে।
গণতন্ত্রের শেষ কথা হলো, দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা। এগুলো যদি নিশ্চিত করতে পারি তাহলে আমাদের আর পিছিয়ে পড়তে হবে না। যদি কোনো ব্যবস্থায় দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা থাকে, তবে তা ক্রমাগত এগিয়ে যেতে থাকে এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাতে মানুষের আস্থাও বাড়ে। আমি মনে করি, গণতন্ত্রের যে মৌলিক উপাদান- দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা, এটি যদি আনা যায় তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন জাগে না। এ দুটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাতে অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠে। বৈশ্বিকভাবেও নিজেদের অবস্থান উজ্জ্বল হয়।
আমেরিকার গণতন্ত্র সম্মেলনে কী ঘটল, সেটি যেমন একটি বিষয়; আমাদের নিজেদেরও বোঝাপড়ার বিষয় আছে। সে বিষয়গুলোর প্রতিও আমাদের মনোযোগী হতে হবে। গণতন্ত্র সম্মেলন ছাড়াও গণতন্ত্রের সূচক নিয়ে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় একটি মূল্যায়ন হয়ে থাকে। সেখানেও আমাদের একটি অবস্থান নিতে হবে। মোদ্দাকথা, আমেরিকা গণতন্ত্র সম্মেলনে আমাদের কেন আমন্ত্রণ জানাল না- এটি নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। নিজেদের প্রয়োজনেই আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটিকে সচল রাখতে হবে।
আরেকটি বিষয়ে কথা বলা দরকার, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বহুমাত্রিক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যান্য ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। আমরা এখানে একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরেকটু পরিস্কার করতে পারি। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৯ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এটি একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। তাই বলা যায়, আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এ দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে কিনা, তা নির্ভর করবে এখানে আইনের শাসন সংহত হওয়া, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু থাকা ও মানবাধিকার সুরক্ষার ওপর। অর্থনৈতিক সম্পর্কটি যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে থাকে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের দেশের গণতন্ত্র সম্মেলনে আমাদের আমন্ত্রণ জানাল না, এটা বহুমুখী দিক থেকে দেখতে হবে। আবার এটিও সত্যি, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক জোরদার হবে কিনা, তা নির্ভর করবে আমাদের আত্মোপলব্ধির ওপর। যত তাড়াতাড়ি এটা করা যাবে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল।
এম হুমায়ুন কবীর :যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
জনতার আওয়াজ/আ আ