লোকে বলে, বুদ্ধিমানরা নাকি শীতকালেই বিয়ে করেন!
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, মার্চ ১৩, ২০২৩ ৮:৪৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, মার্চ ১৩, ২০২৩ ৮:৪৮ অপরাহ্ণ

বছরের কোন সময়ে বেশি বিয়ে হয়ে থাকে? এমন প্রশ্ন করা হলে অনায়াসেই যে কেউ উত্তর দিবেন- শীতকালে। লোকে বলে, বুদ্ধিমানরা নাকি শীতকালেই বিয়ে করেন! সেজন্য শীত থাকতেই বিয়ের পাত্রী খোঁজেন অনেকেই। শীতকালকে বিয়ের মৌসুম বলা হয়ে থাকে। কিন্তু কেন বিয়ের জন্য মানুষ এই মৌসুমকেই বেছে নেন? এই প্রশ্নটা নিশ্চয়ই আপনার মনে কখনো না কখনো এসেছে!
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশজুড়ে বিয়ের ধুম পড়ে যায়। অনেক সময় এমনও হয় যে, বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে গিয়ে সম্ভাব্য তারিখগুলোতে কমিউনিটি সেন্টার, পার্লার বা মেকআপ আর্টিস্ট, ক্যামেরাম্যান, বাবুর্চি নির্ধারণ করাসহ একই দিনে অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজনের অনুষ্ঠান আছে কি না এসব নিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়।
এমনও হয় যে, কমিউনিটি সেন্টারে একই দিনে একই ফ্লোরে দুটি অনুষ্ঠান বুকিং করতে হয়, সেক্ষেত্রে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একজনের জন্য বরাদ্দ হলে সন্ধ্যা থেকে রাত বরাদ্দ পায় অন্যজন। এক অনুষ্ঠানের অতিথিরা কমিউনিটি সেন্টার ত্যাগ করবার আগেই অন্য অনুষ্ঠানের অতিথিরা এসে অপেক্ষা শুরু করে। আবার একই দিনে দুজন আত্মীয়ের অনুষ্ঠান পড়ে গেলে মেহমান কোনটি রেখে কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবে তা মনস্থির করতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়।
সে যাই হোক, ‘শীত এবং বিয়ে’র এই মেলবন্ধন কিন্তু অযৌক্তিক নয়। বরং হিসেব করলে দেখা যাবে এর পেছনে যৌক্তিক কারণটাই মূখ্য। শীতের সময় দিন ছোট হলেও বিয়ের আয়োজনে পাওয়া যায় নানা রকম সুবিধা। আজ শীতকালে বিয়ে বেশি হবার কারণ ও সুযোগ সুবিধা নিয়েই আমাদের এই আয়োজন। চলুন জেনে নেয়া যাক-
সাজ-সজ্জা
বিয়েতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুজন মানুষ, বর-কনে দুজনকেই সাজতে হয়। বরের সাজ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা না থাকলেও বিয়ের সাজে কনেকে দেখতে সবার থেকে সুন্দর লাগা চাই। তাই কনের সাজ হোক বা বরের, শীতকালে বিয়ে হলে যত খুশি সাজুন, নষ্ট হওয়ার এতটুকু ভয় নেই। আর বর-কনে ছাড়া বাকিরাও বিয়েবাড়ির সাজের আনন্দ নিতে পারেন চুটিয়ে।
পরিশ্রম ও ক্লান্তি
একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে এত এত কাজ থাকে যে সময় মতো একটু বিশ্রামেরও ফুরসত মেলে না। আগে দাদি-নানিরা বলতো ‘বিয়ে করা আর ঘর করা সমান খাটনি’; মানে একটা ঘর বা বাড়ি বানাতে যে ইফোর্ট দিতে হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ঠিকঠাক চালিয়ে যেতেও সেই একই ইফোর্টের প্রয়োজন পড়ে। এখানে মূল অনুষ্ঠানের মাস খানিক আগে থেকেই শুরু হয় ছোটাছুটি। আর তা শেষও হয় বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের অন্তত ৫/৭ দিন পরে। আর এই সময়টাতে টানা চলতে থাকে একটা না একটা কাজ।
বাড়ির মহিলারা সেই ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘরের মেহমান সামলাবার কাজ করেন, আর পুরুষরা আনুষ্ঠানিকতার বাকি সব দেখভাল করতে করতেই সময় পার করে। বছরের অন্য সময়টাতে অনেকেই এত লম্বা সময় সমানতালে কাজ করতে পারে না, কিংবা অনেকেই কাজের মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে তুলনায় শীতের এই ঠাণ্ডা সহজেই এই পরিশ্রমের ক্লান্তিকে কমিয়ে নিয়ে আসে, আর ক্লান্তিও দূর করে নিমিষেই।
সহজলভ্য বাহারি ফুল
শীতকালকে বলা হয় ফুলের মৌসুম। সব ধরনের ফুলই সহজলভ্য। হাত বাড়ালেই ফুল আর ফুল। ফুলের সহজলভ্যতা বিয়ের উৎসবকে আরও বেশি জমকালো আর অভিজাত করে তোলে। ডালিম, রজনীগন্ধা, অর্কিড, গাঁদা, গোলাপ, জুঁই– সব ধরনের ফুল পাওয়া যায় প্রায় অর্ধেক দামে। তাই স্টেজ ডেকরেট ও বিয়ের নানা আয়োজনে ফুল কিনতে খরচ অনেক কম হয়ে থাকে। তাই অনেকেই এখান থেকেও বেশ কিছু টাকা সাশ্রয় করতে পারেন। শীতকাল মানেই পারফেক্ট ডেকোরেশন।
হানিমুনের চার্ম
ভালো-মন্দ মিলিয়ে শীতের সময়টা ঘোরাঘুরির জন্যও এক্কেবারে পারফেক্ট। বিয়ের পরের দু-তিন মাস প্রচুর জায়গায় বেড়ানো হয়। নব দম্পতির বিবাহের পরে একসাথে ছুটি কাটানোর অর্থাৎ হানিমুনের জন্য সবথেকে ভালো সময় এটি। শীতকালে বিয়ে এবং এর পরে হানিমুনে ঘোরাঘুরিটা জমে বেশ। আবার হোটেলসহ সব জায়গায় কাপল প্যাকেজ থাকায় নব-বিবাহিতরা অনেক সুবিধা পেয়ে থাকেন। রোদের তাপ নেই, ক্লান্তি নেই। বরের হাত ধরে নতুনের স্বাদটা ভালোই উপভোগ করা যায় শীতে।
আবহাওয়া ও পরিবেশ
আবহাওয়া বিয়ের আনুষ্ঠানিতকায় কত বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে তা যে নিজে এমন বিরূপ অবস্থায় না পড়েছে সে অনুধাবনও করতে পারবে না। সুন্দর সাজগোজ করে বিয়েতে উপস্থিত হলেন, এর মাঝে শুরু হলো বৃষ্টি কিংবা দারুন তাপদাহ। অবস্থাটা ভাবুন একবার। সুন্দর পরিহিত পোষাকটা তখন সাপটে থাকবে আপনার সাথে; চুপচুপে ঐ পোষাকে থাকলে যতই দারুন আপ্যায়ন কিংবা খাবার হোক না কেন, কোনটাই আপনাকে স্বস্তি দিতে পারবে না। তাছাড়া শেরওয়ানি কিংবা সুট আর দামি দামি ভারী সব বিয়ের শাড়ি কিংবা লেহেঙ্গাতে বর-কনে’র যে কি অবস্থা হয়, তা একমাত্র তারাই বলতে পারবে। এর সাথে যুক্ত হয় ক্যামেরার অসহনীয় উজ্জ্বল ও তপ্ত লাইট; ঐ সময়টা মনে হয় প্রখর রৌদ্রে কেউ জোর করে গাড়ি থেকে উত্তপ্ত পিচের রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে।
এছাড়া এই সময়টাতে মেহমানদের ম্যানেজ করাও কিছুটা সহজ হয়। অন্য সময়টাতে একত্রে অনেক মানুষ জমায়েত হলে দেখা যায় কয়েকটি ফ্যান কিংবা এসিও সেখানে পর্যাপ্তভাবে তাপমাত্রা ঠিক রাখতে পারে না। সেদিক থেকে শীতের এই সময়টা অনেকটাই সুবিধা প্রদান করে। এ সময়টাতে অতিরিক্ত ফ্রান বা এসি চালানোর প্রয়োজন না হওয়ায় বিদ্যুৎ কম খরচ হয় এবং বিলও কম আসে।
এমনও হয় যে হোস্টের বাড়ির বিছানা সরিয়ে সেখানে ঢালাওভাবে ফ্লোরে বিছানা পাতা হয়। আর আমন্ত্রিত অতিথিরাও আনন্দ চিত্তে সেই বিছানা দখল করে নিচ্ছে। যদিও লেপ কিংবা কম্বল ভাগে পাওনা নিয়ে অনেকেই অনেক অভিযোগ তোলেন। কিন্তু এই একত্রে ঢালাও বিছানায় সবাই মিলে শুয়ে শুয়েও রাতভর গল্প করবার একটা দারুন সুযোগ পেয়ে বসে। আর অনেকের কাছে এই সুযোগটাও একটা গোল্ডেন মেমরি হয়ে রয়।
মেহমানদের উপস্থিতি
যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্যেই মেহমানদের উপস্থিতি বিশেষরকম গুরুত্ব বহন করে। দেখা যায়, আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতের এই সময়টাতে একটু ঢিলেঢালা ভাব থাকে। বার্ষিক ছুটি, পরীক্ষার ছুটি, মিড বা সেমিস্টার ফাইনাল এক্সাম শেষ হয়ে নতুন সেশন শুরু হয় এই সময়টাতে, তাই ইচ্ছে হলেই ২/৪ দিনের জন্যে কোন অনুষ্ঠানে সে সময়টাতে উপস্থিত হওয়া যায়। তাছাড়া বেশিরভাগ প্রবাসীদের এই সময়টাতে দেশে আসবার সুযোগ ঘটে, তাই পরিবার নিয়ে এমন একটা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া এবং প্রায় বাকি সকল আত্মীয়দের সাথে দেখা করবার দারুণ একটা সুযোগ পায় তারা। সেই সুবাদে বিয়ের অনুষ্ঠানে মেহমানদের উপস্থিতি বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে।
রাত জাগা ও মশারি টানানো
বিয়ে মানে কত-শত কাজ! খাওয়া-দাওয়া, প্যান্ডেল নিয়েই তো ৪-৫ দিনের ধকল যায়। সবাই মিলে হাত লাগিয়ে সারতে হয়। রাত জাগা, প্রভৃতি উৎপাতে এনার্জি খরচ হয় বিস্তর। তাই শীতই সই। শীতে অনেক কাজ করলেও এনার্জিতে ঘাটতি দেখা যায় না। নতুন বউয়ের দিকে তাকালে এমনিতেই মাথার নেটওয়ার্ক হারিয়ে যায়। যেহেতু ঋতুটা শীতের তাই আপনার নেটওয়ার্ক হারাক আর তার-খাম্বা হারাক। আপনি যত অলসই হোন না কেন, মশারি টানানো নিয়ে আপনার কোনো চিন্তা নেই। কারণ কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমালে মশা কামড়ানোর আর কোনো চান্স নেই।
শীতের সময় প্রকৃতি তার অপরূপ সৌন্দর্যে সেজে ওঠে। সবাইকে তার অপরূপ সৌন্দর্য দিয়ে বরণ করে নেয়। এই অপরূপ সৌন্দর্য আপন মানুষের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য এই মৌসুমকে বিয়ের জন্য সেরা মৌসুম হিসেবে বাছাই করে তরুণরা।
জনতার আওয়াজ/আ আ