ইউটার্নের পরও আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংকট কাটছে না
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, এপ্রিল ৫, ২০২৩ ৯:১১ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, এপ্রিল ৫, ২০২৩ ৯:১১ পূর্বাহ্ণ

শুরু থেকেই নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছিল বিএনপিসহ সরকারবিরোধী অনেক দল। এমনকি সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও ইভিএমের বিরোধিতা করছে। তবুও বিষয়টি আমলে না নিয়ে প্রথমে ১৫০ আসন, এরপর ১০০, এরপর ৭০-৮০, এরপর ৫০ এবং তারপর ২৫-৩০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলে আসছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে গত সোমবার কমিশন সভায় রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কথা জানায় ইসি। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনেই অতীতের মতো ব্যালটে ভোট গ্রহণের কথা জানানো হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের ইউটার্নের পরও আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংকট কাটছে না।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ইসির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও নির্বাচনে ইভিএম বা ব্যালট কী ব্যবহার হলো, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই বলে এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটির দাবি, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে। না হলে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না। এ ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছে দলটি। ফলে নির্বাচন নিয়ে সংকট রয়েই গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধের মধ্যেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত দেড়শ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করতে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার ইভিএম প্রকল্প পাসের তোড়জোড় করছিল ইসি। বিএনপি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সরাসরি বিরোধিতা করে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে। পাশাপাশি সরিকারবিরোধী সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোও ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে ছিল। সরকারি দল ছাড়া বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজও এটা সমর্থন করেনি। চলমান বৈশ্বিক টালমাটাল অবস্থা এবং দেশের আর্থিক সংকটের মধ্যে এ প্রকল্পের সমালোচনা করেছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরাও। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনে দেড়শ আসনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য নেওয়া প্রকল্পটি স্থগিত করে দেয় সরকার।
এর আগে গত বছর নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর নিবন্ধিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করে। সেখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল ৩০০ আসনেই ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দিলেও বেশিরভাগ দলই ইভিএমের বিরোধিতা করে। তবে বিএনপিসহ সমমনা নয়টি দল সেই সংলাপ বর্জন করলেও ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করে রাজপথে সরব রয়েছে। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হলে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন থেকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল নানা মহল থেকে। কারণ, বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল শুরু থেকেই ইভিএমের বিপক্ষে।
এ অবস্থায় সরকার ইসির সেই প্রকল্প নাকচ করে দিলে নির্বাচনে দেড়শ আসনের পরিবর্তে অন্তত একশ আসনে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলা হয় ইসির পক্ষ থেকে। নানা সীমাবদ্ধতায় সেটি দাঁড়ায় ৭০-৮০ আসনে। নষ্ট ইভিএম মেরামত জটিলতায় একপর্যায়ে সেটি নেমে আসে ২৫-৩০ আসনে। কিন্তু সেই অবস্থা থেকেও সরে গিয়ে সর্বশেষ জানানো হয়, জাতীয় নির্বাচনে কোনো ইভিএমই ব্যবহার করা হবে না। সব ভোট হবে ব্যালটে।
তবে বিষয়টিকে ক্ষমতাসীনরা স্বাগত জানালেও নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ এমন সিদ্ধান্তেও টনক নড়ছে না বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর। বিএনপি নেতারা বলছেন, ইভিএম বা ব্যালটে কোনো সমাধান নয়। সংকট সমাধান করতে হলে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা এবং এরপর নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে হবে। না হলে তারা ভোটে আসবে না।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, ক্ষমতাসীনদের স্বাগত এবং বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর উল্টোরথে অবস্থানে সংকট রয়েই গেছে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লষকেরা।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ বলেন, ‘বিএনপি এতদিন ইভিএমের বিরোধিতা করলেও এখন আবার ভিন্ন সুরে কথা বলছে। আসলে জনপ্রিয়তা হারিয়ে তাদের মধ্যে এখন নির্বাচনভীতি কাজ করছে। তারা জনগণের রায়কে ভয় পায়। সেজন্য আবোল-তাবোল দাবি নিয়ে আসছে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। আর নির্বাচন প্রতিহত করার ক্ষমতাও তাদের নেই।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এ নির্বাচন কমিশন কিসে ভোট করল না করল তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা তো বর্তমান অবস্থায় নির্বাচনেই যাব না এবং জনগণ এ সরকারের অধীনে নির্বাচনও হতে দেবে না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হলেই এসব নিয়ে কথা হতে পারে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ইসির সঙ্গে সংলাপে বেশিরভাগ দলই ইভিএমের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু ইসি তাদের সেই মতামত পাল্টে দিয়ে ভোটে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত অনড় ছিল। তবে নানা বাস্তবতার নিরিখে তারা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে, এটা নিশ্চয়ই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে নির্বাচনী সংকট সমাধানে এটি যথেষ্ট নয়। এ সংকট সমাধানে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে বড় বড় রাজনৈতিক দলকেই আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে হবে। এর বিকল্প নেই।
জনতার আওয়াজ/আ আ