ফের সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলনের ঢেউ তুলতে বিএনপির ছক
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, এপ্রিল ২৯, ২০২৩ ৯:৩১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, এপ্রিল ২৯, ২০২৩ ৯:৩১ অপরাহ্ণ

ডেস্ক নিউজ
চট্টগ্রামে গত ১০ অক্টোবর বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশে বিপুল লোকসমাগম ঘটে। এরপর টানা আরও ৮টি বিভাগে সফল রাজনৈতিক গণসমাবেশ করে দলটি। নেতাকর্মীদের মধ্যেও চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা যায়। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর রাজধানীতে গণসমাবেশ করতে গিয়ে নানাবিধ বাধার মুখে পড়ে দলটি। কর্মসূচির দুদিন আগে ৮ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে শুরু করে বেশকিছু শীর্ষ নেতাকর্মী। এরপরও সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য কমানোসহ বেশকিছু দাবিতে আন্দোলনের মাঠে ছিল অন্যতম এই রাজনৈতিক শক্তি। এমনকি রমজান মাসেও তাদের ছিল একগুচ্ছ কর্মসূচি; কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। টানা কর্মসূচি পালনে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা ক্লান্তিভাব তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হওয়ার পথে থাকলেও দলটির নেই বড় কোনো কর্মসূচি। এ অবস্থায় ফের আন্দোলনের ঢেউ তোলার পরিকল্পনা করছে বিএনপি। আগামী সোমবার ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে ঢাকায় বড় ধরনের শোডাউন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এ বিষয়ে ব্যাপক প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় প্রস্তুতি সভা করছেন।
সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলনের আগে আবারও তৃণমূলে যাবে বিএনপি। মূলত এক দফার চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার আগে তৃণমূল পর্যায়ে জনস্বার্থে এবং অতিপ্রয়োজনীয় ইস্যুভিত্তিক আরও কিছুদিন ধারাবাহিক কর্মসূচিতেই থাকবে দলটি। আগের মতো তৃণমূল থেকে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, গণঅবস্থান, গণসমাবেশ, সমাবেশ, পদযাত্রার মতো কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ‘বড় সমাবেশ’ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এককথায় ১০ দফা দাবি আদায়ে নিজেদের আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে চায় দলটি। আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি দাবির সপক্ষে আন্তর্জাতিক মহলেও নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরে অবস্থান জানান দিতে চায় বিএনপির হাইকমান্ড। এ ছাড়া সরকারবিরোধী আন্দোলন ও আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে করণীয় ঠিক করতে নিয়মিত কেন্দ্রীয় নেতাদের মতামতও নেওয়া হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতেই এক দফা আন্দোলনের চূড়ান্ত কর্মকৌশল প্রণীত হবে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে চলমান আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালবেলাকে বলেন, আমরা এখন যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, সেখানে একটাই মাত্র পথ খোলা। সেই পথ আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণকে সংগঠিত করে জাতির ঘাড়ে চেপে বসা ভয়াবহ দানবীয় সরকারকে সরিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, চলমান আন্দোলন শুধু বিএনপিকে ক্ষমতায় নেওয়ার জন্য নয়; দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ফেরানোর আন্দোলন। দেশের বর্তমান সংকট বিএনপির একার নয়, এটা সমগ্র দেশবাসীর সংকট। এই সরকারকে না সরালে কেউ রেহাই পাবে না। সুতরাং আন্দোলন আরও গতিশীল হবে।
বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, এবারের আন্দোলনকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে বিএনপি। যে কারণে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়নে কোনো হঠকারিতা না করে জেনে বুঝে পা বাড়াচ্ছেন নীতি-নির্ধারকরা। আন্দোলনকে এক দফায় পরিণত করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ছাড়াও শ্রমিক দলকে আরও বেশি সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের শক্তিমত্তা পরীক্ষা করতে নিয়মিত কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত রয়েছে তাদের। মহানগরকেন্দ্রিক ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি অঙ্গ-সংগঠনগুলোকেও পৃথক কর্মসূচিতে মাঠে নামানো হবে। ঈদুল ফিতরের আমেজ শেষ হওয়ায় পৃথক কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামবেন দলটির নেতারা। আগামী পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসকে টার্গেট করে ঢাকায় বড় ধরনের শোডাউন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মে দিবসের শোডাউন সফলের লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে নয়াপল্টনের মহানগর বিএনপির কার্যালয়ে প্রস্তুতি সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, কোনো দেনদরবার নয়, কোনো আলোচনা নয়। এ অবৈধ ও নিশিরাতের ভোটের সরকারকে অপসারণ করতে হবে, সরকারকে পদত্যাগ করতেই হবে। জনগণ আজ অতিষ্ঠ। এ সরকারকে মানুষ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। সরকার দেশের বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি। এদের যত তাড়াতাড়ি বিতাড়িত করা যাবে, ততই দেশের মঙ্গল।
প্রস্তুতি সভায় অংশ নেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, আব্দুস সালাম আজাদ, মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নবী উল্লাহ নবী, রফিকুল আলম মজনু, ইউনূস মৃধা, মোহাম্মদ মোহন, মোশাররফ হোসেন খোকন, আব্দুস সাত্তার, হাজি মনির হোসেন, লিটন মাহমুদ, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসাইন, সুমন ভূঁইয়া ও বদরুল আলম সবুজ প্রমুখ।
দলীয় সূত্র বলছে, আন্দোলনের জন্য সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী ঢাকা। আন্দোলনের সফলতা ও সংগঠন গতিশীল করতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপিকে আরও বেশি সক্রিয় করতে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। দলটির নেতারা জানান, যে কোনো সময়ের চেয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি যথেষ্ট শক্তিশালী। এখন এই সংগঠনের ওপর ভিত্তি করে আন্দোলনে যাওয়া যেতে পারে। তবে মহানগর বিএনপির সক্ষমতা নিয়ে আরও নিশ্চিত হতে চাচ্ছে দলের হাইকমান্ড। চূড়ান্ত আন্দোলনের আগে আরেকটি মহড়া দিয়ে নিতে চান তারা। একই সঙ্গে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনকেও আরও সক্রিয় করতে পৃথক উদ্যোগ নেবে বিএনপি।
সূত্র জানায়, বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ইউনিয়ন থেকে শুরু করে পৌর, থানা, জেলা ও বিভাগীয় সমাবেশের জন্য নিজেদের তৈরি করছে। একইভাবে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলকেও প্রস্তুত করা হচ্ছে। সম্প্রতি যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এখন এসব সংগঠনের নেতাদেরও কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ কালবেলাকে বলেন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল অতীতের মতোই বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে মাঠে থাকবে। ছাত্রদল আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ। সবাইকে বলব, এবারের আন্দোলন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষা, মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, আসুন সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলে দেশকে রক্ষা করি।
সংবিধান অনুযায়ী, ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে অনুযায়ী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ঘোষণা হতে পারে নির্বাচনের তপশিল। তপশিলের আগের চার মাসের মধ্যেই আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে চায় টানা ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি। সে লক্ষ্যে আগামী দু-তিন মাসে তৃণমূল থেকে আন্দোলনের ঢেউ তুলতে চায় তারা। তারপর ঢাকাসহ সারা দেশের রাজপথে চূড়ান্ত আন্দোলনের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২২ সালের জুলাই থেকে সরকারের পদত্যাগ দাবিতে রাজপথে লাগাতার আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। ওই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন জেলায় ১৭ নেতাকর্মী নিহত ও অসংখ্য আহত হন। কারাগারেও যেতে হয়েছে উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মীকে। জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দলীয় কর্মসূচিতে গুলি করে নেতাকর্মী হত্যার প্রতিবাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে ধারাবাহিক ওই আন্দোলনের অংশ হিসেবে সারা দেশে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করে দলটি। সরকারের বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে এসব সমাবেশ সফল করলেও ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় বাহ্যিকভাবে অনেকটা ব্যাকফুটে যায় দলটি।
দলটির নেতাদের মতে, সারা দেশে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে যেভাবে তারা গণজাগরণ সৃষ্টি এবং জনসম্পৃক্ততা ঘটিয়েছিলেন, তাতে অনেকটাই ছেদ ঘটে ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে সংঘর্ষের ঘটনায়। যদিও এরপর ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন তারা; কিন্তু সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের জন্য তাদের আবারও জনমত তৈরির বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে আবারও একেবারে তৃণমূল থেকে শুরু করতে চাইছেন বিএনপির হাইকমান্ড।
জনতার আওয়াজ/আ আ