প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতা, পরীক্ষায় বসতে পারেনি শিমু হতাশায় আত্মহত্যার চেষ্টা - জনতার আওয়াজ
  • আজ ভোর ৫:৩০, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতা, পরীক্ষায় বসতে পারেনি শিমু হতাশায় আত্মহত্যার চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, মে ১, ২০২৩ ৫:৩৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, মে ১, ২০২৩ ৫:৩৭ অপরাহ্ণ

 

নীলফামারী প্রতিনিধি

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার কষ্ট নিয়ে হাউ মাউ করে কাঁদছে শিমু আক্তার (১৬)। আরও এক বছর মেয়ের পড়ালেখার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য নেই দিনমজুর বাবার। স্বল্প আয়ে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয় রবিউল ইসলামকে। মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা নেই তার, একরাশ চিন্তা নিয়ে রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ি (সহকারী) হিসেবে কাজ করছেন।

পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার হতাশায় আত্মহত্যার চেষ্টাও করে এই শিক্ষার্থী। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা টের পাওয়াতে রক্ষা পায় সে। মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তায় কাঁদছেন মা রুবি আক্তারও। সন্তানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারায় পুরো পরিবারে নেমে এসে শোকের ছায়া।

জানা গেছে, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খগা বড়বাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মারুফা আক্তার লিজাকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য নির্ধারিত এক হাজার ৭০০ টাকার পরিবর্তে দুই হাজার ৪০০ টাকা দিয়েছিল ওই শিক্ষার্থী। পরীক্ষার আগে সবার প্রবেশপত্র হাতে দেওয়া হয়। শিমু আক্তার রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানে গেলে প্রধান শিক্ষক জানান শিমুর ফরম পূরণ হয়নি।

কারণ জানতে চাইলে তালবাহানা করে কালক্ষেপণ করেন এই শিক্ষক। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে অভিযোগ করলে তিনি আশ্বস্ত করেন। এ ঘটনায় পরীক্ষা দিতে পারবে না জেনে ভেঙে পড়ে ওই শিক্ষার্থী। গত ৩০ এপ্রিল রাতে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে।

কান্না জড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শিমু আক্তারের বলে, কি কারণে ম্যাডাম আমাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দিল না? আমি বিচার চাই। আমার গরিব বাবা-মা কীভাবে আমার আরও এক বছর লেখাপড়ার খরচ চালাবে। সবাই দুই হাজার ৩০০ দিয়েছে আমি দুই হাজার ৪০০ টাকা দিয়েছি। তারপরেও আমার ফরম পূরণ হয়নি কেন?

তার মা রুবি আক্তার জানান, শনিবার থেকে মেয়েটা কান্নাকাটি করছে, দু’দিন ধরে কিছুই খাচ্ছে না। রাতে রুমে গলায় ওড়না পেচিয়েছে, ছোট মেয়ের চিৎকার শুনে এসে নামিয়ে নেই। সারারাত পাহারা দেই। বন্ধু-বান্ধব সবাই পরীক্ষা দিতে গেলেও আমার মেয়ে যাইতে পারেনি। তার কাছে আরও ছয় হাজার টাকা চেয়ে ছিল ম্যাডাম। কই পাব এত টাকা?

বাবা রবিউল ইসলাম জানান, মানুষের কাছে ঋণ করে মেয়ের ফরম পূরণের টাকা দিয়েছি। মেয়েটা ফাঁস দিছিল, কীভাবে বুঝাবো মেয়েটাকে? কেন দিতে দিল না পরীক্ষা? আমার মেয়ের কিছু হলে কে দায় নিবে? ইউএনও আশ্বাস দিয়েছিল কিন্তু কিছুই হলো না? আমরা গরিব বলে ন্যায় বিচার পাব না?

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, এই শিক্ষক জঘন্য, ইতোপূর্বে এ রকম অনেক কর্মকাণ্ড রয়েছে। বেশি করে টাকা নেওয়া, এছাড়া অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিচারও হয়েছে অনেকবার। ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষার্থীরা যদি কোনো গণ্যমাধ্যম বা কোনো অফিসার এলে কিছু বলে পরে শিক্ষার্থীদের মারধরসহ বিভিন্নভাবে অত্যাচার করা হয়।

প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে তিলোত্তমা রানী নামে এক শিক্ষককে পাওয়া যায়। তিনি জানান, সবাই (শিক্ষকরা) এসেছে কিন্তু বাইরে গেছে। কতজন শিক্ষক এসেছে তিনি উপস্থিত সংখ্যা জানেন না। পরে সবাইকে ফোন করে নিয়ে আসেন? প্রধান শিক্ষককের অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি জানান, তিনি বাইরে গেছেন দায়িত্বে রয়েছে সহকারী প্রধান শিক্ষক।

সহকারী প্রধান শিক্ষক আকমল হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি জানান, আমি নামাজ শেষে খেতে এসেছি। আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত সেটা জানিনা। ম্যাডাম কখন গেছে সেটাও জানি না। কিছু সময় পরে তিনি উপস্থিত হলে মুভমেন্ট খাতায় প্রধান শিক্ষক প্রবেশের সময় থাকলেও বের হওয়ার কোনো সময় পাওয়া যায়নি। এছাড়াও তিনি নিয়মিত এভাবেই বিদ্যালয় থেকে চলে যান। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককের কোনো স্বাক্ষরও মিলেনি সেই খাতায়।

তিনি আরও জানান, আসলে আপনারা উনার কিছুই করতে পারবেন না? ইতোপূর্বে কত সাংবাদিক এসেছে, মাধ্যমিক অফিসার এসেছে, ইউএনও এসেছে কোনো কিছুই করতে পারেনি। বরং তারাই সাইলেন্ট হয়েছে। বর্তমান ডিডি স্যার তিনি নিজেই এখানে এসেছিলেন কিছুই করতে পারেনি। প্রধান শিক্ষক আমার বোন হয় মাঝে মাঝে এগুলো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, উনার স্বামী রংপুর ক্যান্টমেন্ট পাবলিকের প্রভাষক সেজন্য মনে হয় কেউ কিছু করতে পারে না। উনি আসেন খুশি মতো আর চলেও যান খুশি মতো। আমরা সবাই তার কাছে অসহায়। কেন আপনারা অসহায় -এমন প্রশ্নের জবাব দিতে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আপনারা বুঝে নেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষক মারুফা আক্তারের মোবাইল ফোনে একাধিক বার কল করা হলেও সরাসরি তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার অফিস সহকারী ফোন রিসিভ করে ‘ম্যাডাম নেই’ বলেই মোবাইল ফোন সুইচ অফ করে দেন।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার আব্দুল হালিম জানান, তার কর্মকাণ্ডের কারণে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয়েছিল কিন্তু কোনো কাজে আসেনি। আমাদের কোনো কিছু করার নেই। সবকিছু ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি করতে পারেন।

নীলফামারী জেলা শিক্ষা অফিসার মো. হাফিজুর রহমান বলেন, পরীক্ষার্থীও বলেনি, অভিভাবকও বলেনি বা প্রতিষ্ঠান প্রধান আমাকে জানাননি, আমি একটি পত্রিকায় দেখেছি জেলায় কেন্দ্রে সচিবদের যে মিটিং ছিল সেখানে বলেছি। তবুও সেখানকার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে দেখতে বলেছি। যেহেতু ইউএনও বরাবর আবেদন করেছিল সেহেতু ইউএনও দেখবেন। ইউএনও যেহেতু সেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী সেখানে তিনি, ফন্ট এ্যাকশনের মাধ্যমে পাঠাবেন এবং দ্রুত সমাধাণ আসতো। আমি উপজেলা মাধ্যমিক অফিসারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জন্য অবগত করছি।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমি অবগত। ঘটনার বিস্তারিত জানতে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আপনারা যেহেতু জানালেন প্রতিবেদন হাতে পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ