কবে ফিরবে সংবাদপত্রের সুদিন : হোসাইন মোহাম্মদ দিদার - জনতার আওয়াজ
  • আজ ভোর ৫:৩৫, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

কবে ফিরবে সংবাদপত্রের সুদিন : হোসাইন মোহাম্মদ দিদার

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ১৮, ২০২৩ ১১:৩৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ১৮, ২০২৩ ১১:৩৪ অপরাহ্ণ

 

রাষ্ট্রের ‘দর্পণ’ বলা হয় সংবাদপত্রকে। অপর দিকে, জাতির বিবেক বলা হয় চতুর্থ স্টেট খ্যাত সাংবাদিকদের। আয়নার সামনে গেলে যেমন নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছবি ভেসে আসে আয়নার সামনে। ঠিক তদ্রুপ একটি দেশের ছবি ফোটে উঠে সে দেশের গণমাধ্যমের দিকে তাকালে। কিন্তু যদি সেই গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা হয় তাহলে কখনো দেশের চিত্র ফোটে উঠবে না।

তখন দেশে অনাচার, দুর্নীতি, বিচারহীনতার বন্যা বয়ে যাবে, প্রকৃতপক্ষে গণমাধ্যম জগতে কর্মরত সাংবাদিকরা যদি মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারে তাহলে ওই দেশে অন্যায়, দুর্নীতি ও অনাচার তুলনামূলক অনেকাংশে কমে যাবে।

আজকের বিশ্বে সংবাদপত্র এক রোগে আক্রান্ত। কেনো জানি, সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিকস মিডিয়া থেকে মানুষ দিনে দিনে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

এই গণমাধ্যম থেকে যদি মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম চরম হুমকির মুখে পড়বে। নিরপেক্ষ সংবাদ লিখতে বিশ্বের অনেক দেশে গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মীরা স্বাধীন। আবার কোনো কোনো দেশে সংবাদকর্মীরা ও গণমাধ্যম স্বাধীন নয়। তবে কি গণমাধ্যমকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করে?

আমাদের দেশে প্রচলিত আইনের কারণে অনেক সাহসী সংবাদকর্মী মনোবল হারিয়ে ফেলেছেন। এই আইনের বিপরীতে সংবাদ লিখে শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয়েছে অনেককেই। পাশাপাশি মামলা-হামলার খড়গ ও অত্যাচারের স্টিম রোলার তো আছেই। সেই সাথে জেলের ঘানি টানা কমন। এমন সব প্রতিকূলতায় নিজেকে সাহসী সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার মতো পরিবেশ থাকে না। সত্য তুলে ধরা যায় না।
বিষয়টি অনেকটা ‘শক্তের ভক্ত-নরমের যম’।

অসহায় মানুষ যদি কোনো দোষ ত্রুটি কিংবা লঘু অপরাধ করে সেসব নিউজ আমরা বুক ফুলিয়ে অনায়াসেই ফলাও করে প্রচার করি কিন্তু যদি দেখি, বিত্তশালী বা ক্ষমতাবান লোকেরা অপরাধ বা দুর্নীতি করে।’ চিত্র তখন উল্টো হয়, সেই সংবাদ লিখতে ভয়ে আমরা জবুথবু হয়ে যাই। কারণ এই সংবাদ লিখতে গিয়ে যদি আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়, অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে তখন আমার উপায় কী হবে? কে আমাকে রক্ষা করবে? এসব ভেবে অনেকটা ‘ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি’ অবস্থায় থাকি নিরাপদে।

আর যে হামলা মামলার ভয় উপেক্ষা করে যথাযথ প্রমাণ সাপেক্ষে কোনো জাঁদরেল ব্যক্তির অপরাধ চিত্র নিয়ে নিউজ করে তাহলে ওই সংবাদকর্মীর অবস্থাটা হলো- ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা’র মতো। কারণ এই সংবাদকর্মীর নিজের রক্ষা নিজেই করতে হবে। দুর্বৃত্তদের লাল চোখ রাঙানি বা হুমকিধমকি থেকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসবে না।

আজ থেকে দু-এক দশক আগেও মানুষকে ফাঁকি দেয়া যেত সহজে; তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ছিল না। এখন হালের চতুর্থ প্রজন্ম অনেক চৌকশ ও বিচক্ষণ। কোনো অপরাধের ঘটনা যদি পেশি শক্তির ভয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা লিখতে ব্যর্থ হয় তখন সেটি এ দেশের সাহসী যুবকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখে মুহূর্তেই ভাইরাল করে নিতে পারে।

তাহলে ভাবুন, আমাদের গণমাধ্যম যেটি পারেনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তা পেরেছে?
বিষয়টি এমনও নয়। এর মূল কারণ গণমাধ্যমকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়নি।

এ জন্যই আমজনতা আগের মতো গণমাধ্যমে ভরসা রাখতে পারছে না বলেই গণমাধ্যম জগৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সংবাদপত্রে এখন আগের মতো সার্কুলেশন নেই। যে খোরাকের আশায়, বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যান্বেষী সংবাদের আশায় মানুষ পত্রিকা কিনবে, সেটি যদি না পায়, সেই সংবাদ যদি দেখতে না পায় তখন একবার পত্রিকা কিনলেও পরেরবার আর পাঠক পত্রিকা কিনতে চায় না।

কার্যত বলার অপেক্ষা রাখে না। গণমাধ্যমের বর্তমান ও ভবিষৎ কী?
এ ক্ষেত্রে মানুষ সংবাদমাধ্যম থেকে দিন দিন আস্থা হারিয়ে ফেলছে। সাম্প্রতিককালে আপনি খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন- বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় বিভিন্ন সংবাদ প্রচার বা আপলোড করার পর যখন দর্শক বা পাঠকরা কুরুচিপূর্ণ তির্যক মন্তব্য করেন।

এ থেকে অনুধাবন করা যায়, সাধারণ বা নিরপেক্ষ মানুষেরা ইতোমধ্যে কিছু কিছু সংবাদপত্র বয়কট করার মিছিলে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। কোনো পত্রিকার পাঠক বা কোনো টিভি চ্যানেল এর দর্শকের ক্ষোভ সম্পাদকরা কি কোনো দিন বুঝতে চেষ্টা করেছেন? না। তা করেননি। তাই আমি নির্দ্বিধায় বলছি আমাদের দেশ থেকে সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানলগুলোকে বাঁচাতে হলে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশ করার মানসিকতায় ফিরে আসতে হবে।

গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে এর অস্তিত্ব দিনে দিনে বিলীন হয়ে যাবে। বর্তমান আইসিটি আইন বাতিল করে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমকে অবাধে সংবাদ লেখার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। নচেৎ এর জন্য আগামীর দিনগুলোতে মানুষ তার মৌলিক নাগরিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে যাবে।

গণমাধ্যম বাঁচাতে হলে,গণমাধ্যম শক্তিশালী করতে হবে; কারো তাঁবেদারি করা চলবে না। নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ লেখার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে রাষ্ট্রকে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভ‚মিকা ইতিবাচক ও অপরিসীম।
শুরু হোক সত্যান্বেষী সংবাদ-এর পথচলা। গণমাধ্যম এর কণ্টকাকীর্ণ রাস্তা ধরে যারা হাঁটতে শিখেছে, তারা লোভ, নির্মোহ, ভয়, স্বার্থ ও স্বজনপ্রীতি উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে।

তা না হলে সাংবাদিকতার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এমনিতেই মানুষেরা গণমাধ্যমের প্রতি আস্থাহীন। তাই গণমাধ্যম মানেই জনগণ। জনগণ যদি গণমাধ্যম থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে, জনগণ যদি গণমাধ্যম বিমুখী হয় তাহলে আর দরকার কি এই গণমাধ্যমের? গণমাধ্যম কখনো রাষ্ট্র বা কোনো গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি থাকতে পারে না। আসুন, গণমাধ্যমকে পুরানো জৌলুশে আবার ফিরিয়ে দেই। এ ক্ষেত্রে সব ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকরা ও সংবাদকর্মীরা এগিয়ে আসার এখন-ই মুখ্য সময়। সৌরভে গৌরবে ফিরে আসুক সংবাদপত্রের সুদিন।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক
ইমেইল : hussaain82@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ