ইয়াসমিন ট্রাজেডি দিবস আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৪, ২০২৩ ২:৫০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৪, ২০২৩ ২:৫০ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। ভোরে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী হাছনা এন্টারপ্রাইজ নৈশ কোচের সুপার ভাইজার ইয়াসমিন নামে এক কিশোরীকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামিয়ে দেয়। এক চায়ের দোকানদারকে বলা হয় সকাল হলে কিশোরীকে যেন দিনাজপুর শহরগামী বাসে উঠিয়ে দেন তিনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেখানে পৌঁছে নৈশ্য টহল পুলিশের একটি পিকআপভ্যান। পুলিশ সদস্যরা চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে থাকা কিশোরী ইয়াসমিনকে নানা প্রশ্ন করে; একপর্যায়ে দিনাজপুর শহরে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে জোরপূর্বক পুলিশভ্যানে তুলে পাশ্ববর্তী সাধনা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে রাস্তার পাশে মরদেহ ফেলে রেখে যায় বর্বর পুলিশ সদস্যরা।
বর্বরোচিত সেই ঘটনা শিকার ইয়াসমিন দিনাজপুর শহরের রামনগর এলাকার গরিব ঘরের শরীফা বেগমের মেয়ে। অভাবী সংসারে জন্ম নেয়ায় চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পেরেছিলেন। টাকা জমিয়ে আবার লেখাপড়া করার স্বপ্ন বুকে পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। আট-নয় মাস কাজ করার পর নিজের বাড়িতে যেতে চান। কিন্তু গৃহকর্তা তাকে দুর্গাপূজায় বাড়িতে যেতে বলেন। তবে মায়ের জন্য মন ছুটে যায় ইয়াসমিনের। আর সে কারণেই হয়তো ২৩ আগস্ট ওই পরিবারের ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে কাউকে না জানিয়ে একাই দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন ইয়াসমিন।
সেদিন ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরার সময় ভুল করে ঠাকুরগাঁওগামী নৈশকোচ হাছনা এন্টারপ্রাইজে উঠে পড়ে সে। বাসটি রাত ৩টার পরে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-রংপুরের সংযোগ মোড় দশমাইল এলাকায় এসে পৌঁছায়। তিন রাস্তার মোড় বলে সেখানে রাতেও চায়ের স্টল, খাবারের দোকান প্রায়ই খোলা থাকে। বাসের সুপারভাইজার খোরশেদ আলম ও হেলপার সিদ্দিকুর রহমান ইয়াসমিনকে সেখানে নামিয়ে জনৈক চা দোকানদার জোবেদ আলীকে অনুরোধ করেন, সকালে যেন ইয়াসমিনকে দিনাজপুরগামী কোনো গাড়িতে উঠিয়ে দেন। সে সময় জয়ন্ত নামে একজন যাত্রীও বাস থেকে নামেন। বাস থেকে নেমে জয়ন্ত ও ইয়াসমিন জোবেদ আলীর চায়ের দোকানের পাশেই একটি দোকানে নাস্তা খায়। আবদুর রহিম নামে এক পান দোকানদার ইয়াসমিন কীভাবে দিনাজপুরের শহরে যাবে জানতে চাইলে জয়ন্ত তাকে পৌঁছে দেবে বলে জানান। এ সময় উপস্থিত কয়েকজন আপত্তি জানিয়ে ইয়াসমিনকে তারাই দিনাজপুরগামী গাড়িতে তুলে দিতে চান।
এরপর পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানের (নং-ম-০২-০০০৭) চালক অমৃতলাল বিষয়টি জানতে চান। পিকআপ ভ্যানে পুলিশের সহকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মইনুল এবং আব্দুস সাত্তার বসে ছিলেন। অমৃতলাল এ সময় ইয়াসমিনকে তাদের সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে ইয়াসমিন সকাল না হওয়ায় যেতে সাহস পায়নি। এরপর অমৃতলাল ধমক দিয়ে তাকে পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে নিয়ে যান। পরদিন ওই এলাকার লোকজন রাস্তায় রক্তের দাগ, পাশে ইয়াসমিনের জুতা, রুমাল, হাতপাখা ও ভাঙা চুড়িও পড়ে থাকতে দেখেন। এর ঘণ্টা তিনেক পরে গোবিন্দপুর সড়কে ব্র্যাক অফিসের সামনে ইয়াসমিনের মরদেহ পাওয়া যায়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ‘রাস্তার ধারে বসে আমরা কয়েকজন গল্প করছিলাম। তারপর সাধনা স্কুলের সামনে গাড়িটা থেমে যায়। তারপর আমি কয়েকটা ছেলেপেলে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। মেয়েটা তখন সেখানে পড়েছিল। আর যখন আমরা কাছাকাছি চলে আসি তখন সেই গাড়িটা টেনে চলে যায়।’
পরে উত্তর গোবিন্দপুর এলাকায় পড়ে থাকা ইয়াাসমিনের মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির উদ্দেশে কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) স্বপন কুমার প্রকাশ্যে মরদেহ বিবস্ত্র করে ফেললে উৎসুক জনতার মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ঘটনার পরদিনই দিনাজপুরে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং হত্যা ও ধর্ষণের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দিনাজপুর কোতোয়ালি পুলিশ বিষয়টি সামাল দেয়ার জন্য একজন অজ্ঞাতপরিচয়ের মরদেহ উদ্ধার মর্মে ঘটনাটি সাজিয়ে থানায় একটি ইউডি মামলা করে। মরদেহের তড়িঘড়ি ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বালুবাড়ি শেখ জাহাঙ্গীর গোরস্থানে দাফন করা হয়। মরদেহের কোনো ধরনের গোসল ও জানাজা পড়ানো হয়নি।
এ ঘটনায় দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদ-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে দোষীদের শাস্তির দাবি করা হয়। ২৬ আগস্ট রাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জনতা কোতয়ালী থানা ঘেড়াও করে। ২৭ আগস্ট সকাল থেকে প্রতিবাদী মানুষেরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এরপর দুপুর ১২টার দিকে কয়েক হাজার জনতা বিক্ষোভ মিছিল সহকারে দোষীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি প্রদান করতে যায়। এ সময় পুলিশ বিনা উসকানিতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে সামু ,কাদের, সিরাজসহ ৭ জনকে হত্যা করে। আহত হয় প্রায় ৩ শতাধিক মানুষ।
শহরের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। মোতায়েন করা হয় তৎকালীন বিডিআর। দিনাজপুর থেকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ ১৩ থানার সকল পুলিশকে একযোগে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি তিনটি আদালতে ১২৩ দিন বিচার কাজ শেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মতিন মামলার রায় ঘোষণা করেন।
মামলার রায়ে আসামি পুলিশের এএসআই মঈনুল, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার ও পুলিশের পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্ম্মনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান ‘৯৫-এর ৬ (৪) ধারায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেন। আলামত নষ্ট, সত্য গোপন ও অসহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এএসআই মঈনুলকে আরও ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
অপর দিকে দণ্ডবিধির ২০১/৩৪ ধারায় আলামত নষ্ট, সত্য গোপন, অসহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত আসামি দিনাজপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেব, ডা. মহসীন, এসআই মাহতাব, এসআই স্বপন চক্রবর্তী, এএসআই মতিয়ার, এসআই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের খালাস দেন।
চাঞ্চল্যকর ইয়াসমিন ধর্ষন ও হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয় ৮ বছর পর অর্থাৎ ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। মামলার অন্যতম আসামি এএসআই মইনুল হক গাইবান্ধার পলাশবাড়ি উপজেলার বিশ্রামপাড়া গ্রামের জসিম উদ্দীনের ছেলে। কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার নীলফামারির ডোমার উপজেলার চন্দনখানা গ্রামের এসএম খতিবুর রহমানের ছেলে। ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে রংপুর জেলা কারাগারে তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃতুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অপর আসামি পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্মন নীলফামারি সদর উপজেলার রাজপুর গ্রামের লক্ষীকান্ত বর্মনের ছেলে। সে বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে রংপুর জেলা কারাগারে তাকেও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইয়াসমিনের মা শরীফা বেগম বলেন, ‘‘দিনাজপুরের মানুষকে বলা হয় ‘বাহের দেশের বা মফিজ দেশের মানুষ’। কিন্তু আমার মেয়েকে বেইজ্জত করার কারণে দিনাজপুরের এমন আন্দোলন সংগ্রাম করলো যে সারা বিশ্বের মানুষকে তাক লাগিয়ে দিল। পুলিশের ফাঁসি হয় এমন কথা আমি আগে কোনোদিন শুনিনি। দিনাজপুরের মানুষ একত্র হয়ে প্রতিবাদ করায় ও বিচার চাওয়ায় আমার মতো গরিবের মেয়ে ধর্ষণ ও হত্যার বিচার হয়েছে। সে সময় দিনাজপুরের মানুষসহ বিভিন্ন সংগঠন এগিয়ে আসার কারণে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা আদালত পর্যন্ত গড়েছিল। শেষ পর্যন্ত দোষী তিন পুলিশের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এই আন্দোলন সংগ্রামে আমাকে কোনদিন একা মনে হয়নি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘দিনাজপুরের মানুষ পারে এবং পারে। মা–বোনের ইজ্জত রক্ষায় এ জেলার মানুষ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। সে সময়ের জেলা প্রশাসক এটিএম জব্বার ফারুক ও পুলিশ সুপার মোতালেব হোসেনের সাজা হলে আরও খুশি হতে পারতাম।’
ইয়াসমিনের স্মরণে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে তৈরি করা হয়েছে ইয়াসমিন স্মরণী। পাশে তৈরি হয়েছে ইয়াসমিন যাত্রী ছাউনি ও পাঠাগার। এ ঘটনায় সম্মিলিত নারী সমাজের পক্ষ থেকে ‘২৪ আগস্ট নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
জনতার আওয়াজ/আ আ