বাংলাদেশ ও গণহীন তন্ত্র : মুহাম্মদ কামাল হোসেন - জনতার আওয়াজ
  • আজ সন্ধ্যা ৭:২২, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ও গণহীন তন্ত্র : মুহাম্মদ কামাল হোসেন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, নভেম্বর ৩, ২০২৩ ১:১০ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, নভেম্বর ৩, ২০২৩ ১:১০ পূর্বাহ্ণ

 

ছোট্ট একটি ঘটনা দিয়ে আলোচ্য লেখাটি শুরু করা যাক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, কুমিল্লার সিংহপুরুষ, কুমিল্লøা-১০ নির্বাচনী এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রিয় ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আলহাজ মনিরুল হক চৌধুরীর ব্যক্তিগত প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে ২০১২-১৩ সালের দিকে কিছু দিন দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেই সময়ে স্যারের ঢাকা রাজাবাজার বাসায় (তিনি প্রায়ই মজা করে বলতেন, তার ‘বউয়ের বাসা’) অল্পবয়সী এক গৃহপরিচালক তরুণ দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামান্য আহত হয়। ঘটনার আইউইটনেস যেহেতু আমি ছিলাম, জানতাম জখমটা মোটেও গুরুতর বা উদ্বেগের ছিল না। হাত-পায়ের দু-এক জায়গায় সামান্য চামড়া ছিলে যায় মাত্র। তবুুও বিষয়টি স্যারের নজরে আসামাত্র তাকে জরুরি ট্রিটমেন্টের জন্য দ্রুত ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়। জখমটা এতটাই সামান্য ছিল যে, ডাক্তারের ট্রিটমেন্টের কোনো প্রয়োজন পর্যন্ত ছিল না। আজকের এই প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুম-খুন, হত্যা-নির্যাতন ও নিপীড়নের ভিড়ে এটি নিশ্চয় পাত্তা পাওয়ার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনাই নয়। কিন্তু সেদিনের সেই সামান্য ঘটনাকে ঘিরে স্যারের যে অসামান্য বদান্যতা, ব্যস্ততা, ব্যাকুলতা, আকুলতা ও মানবিকতা দেখেছি- সেটি আমাকে জাস্ট ছুঁয়ে যায়। ছেলেটি বাসায় ফিরে না আসা অবধি স্যারের দু’পা এক জায়গায় এক মুহূর্তের জন্য স্থির ছিল না। স্যার আমাকে বলেছিলেন, ‘বুঝলা কামাল, ওদের জন্যই এখনো রাজনীতিটা করি। ওদের নিরাপত্তা আমার কাছে সবার আগে। তা ছাড়া ও আমার পরিবারের একজন সদস্য। আমি দায়িত্বে অসচেতন হতে পারি না। মনে রেখো, সাধারণ জনগণ না থাকলে আমাদের রাজনীতিকদের দু’পয়সার কোনো মূল্য নেই।’ ওই ঘটনা সেদিন আমাকে হাতেকলমে শিক্ষা দেয়, প্রকৃত রাজনীতি মূলত গণমানুষের জন্য। রাজনীতি নিয়মরক্ষা বা দায়সারা সর্বস্ব নয়; বরং এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও বটে।

রাজনীতিবিদদের মধ্যে দায়বদ্ধতা থাকলে সামান্য গৃহপরিচারক থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সমানুপাতিক সুফল পায়। মানুষের মূল্যায়ন থাকে। মানবিক বোধ জাগ্রত হয়। আর কোনোরকম নিয়মরক্ষা বা দায়সারা সর্বস্ব হলে কার কী এলো-গেল কিংবা কে আহত হলো আর কে মরল কিংবা কে ক্ষতিগ্রস্ত হলো- সেই খবরাখবর রাখে কে? দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকাল আমাদের রাজনীতি থেকে এই ‘দায়বদ্ধতা’ জিনিসটিই হারিয়ে গেছে। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক গ্যাঁড়াকলে আবদ্ধ এ জাতির বন্দিত্ব যেন আজ কোনোক্রমইে শেষ হওয়ার নয়। বর্তমানে গণমানুষের কথা, তাদের দুঃখ-দুর্দশা-গ্লানি ও বঞ্চনার কথা চিন্তা করে কয়জনে? এক সময়ের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ধীরে ধীরে গণহীন তান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। স্বাধীনতার ৫২ বছর পেরিয়েও এখনো মানুষের ভোটের অধিকারের জন্য লড়াই করতে হয়। এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে? মানুষ এখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রতিনিয়ত খাবি খায়। এখন আর ভোটের সময় এলেও জনগণের ধার ধারে না কেউ। ভোটের প্রয়োজন পড়ে না। জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি করা লাগে না। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের বাইরে এক প্রকার প্রায় জনশূন্য থাকে। আমূল পাল্টে গেছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সঙ্গত কারণে স্যার প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, ‘হায় রে স্বাদের বাংলাদেশ ও গণহীন তন্ত্র!’

সত্যি তাই, যে অন্যায়-অবিচার, শোষণ ও জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেসব থেকে কি আমরা আদৌ মুক্তি পেয়েছি? সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানিরা যেমন জনমতকে শ্রদ্ধা করেনি, পূর্বপাকিস্তানের নেতাদেরকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নির্বাচিত করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা ছাড়তে চায়নি; ঠিক স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাও হেঁটে যাচ্ছেন একই পথে। তারাও কোনোরকমে একবার ক্ষমতার মসনদে বসতে পারলে আর তা ছাড়তে রাজি হন না। মানুষ ভোটে অংশগ্রহণ করুক বা না করুক, দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে তারা লোকদেখানো নির্বাচন করে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেছেন বারবার। এরপর জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি ও দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করে সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালু হওয়ায় ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা থেকে বনাম ক্ষমতার স্বাদ পুনরায় গ্রহণ করার লড়াইয়ের জাঁতাকল থেকে দেশবাসী কিঞ্চিৎ রেহাই পেয়েছিল কয়েকটি বছর। কিন্তু এখন আবার সেই পুরনো জায়গাতেই ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দেশের ১৬ কোটি জনতাকে। অর্থাৎ স্বাধীনতার অর্ধশতবার্ষিকী পেরিয়েও জাতি নিজ দেশের রাজনীতিবিদদের অলিখিত গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ হয়ে আছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ অথচ সেই জনগণ এর ভাগ্য রাজনৈতিক দলগুলোর জিঞ্জিরে আবদ্ধ। তাই অনেককেই বলতে শোনা যায়, দেশটি বুঝি এ জন্যই জীবনবাজি রেখে স্বাধীন করেছিলাম?

গণতন্ত্র মানে কোনো জাতি-রাষ্ট্রের (অথবা কোনো সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। যেটি এখন কার্যত নেই বললেই চলে। গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের জনগণের এই ভোটাধিকারের ক্ষমতাটিকে পুরোপুরিভাবে নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এখন গণতন্ত্রে গণ নেই। সর্বত্র জোরজবরদস্তি ও লুটপাটতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ-মতাদর্শ, বিনয়-ভদ্রতা-সৌজন্য ও পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি একসময় এসবই ছিল আমাদের রাজনীতির প্রধান বিবেচ্য বিষয় ও মুখ্য উপাদান। রাজনীতি বলতে মানুষ বুঝত- ‘রাজার নীতি’ যাকে গণ্য করা হতো ‘নীতির রাজা’ হিসেবে। দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই রাজনীতিপ্রিয় প্রাণী। আর তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল রাজনীতি। মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে করপোরেট অফিসের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, সর্বত্রই চলে এই রাজনীতিবিষয়ক আলোচনা। তবে এই রাজনীতিবিষয়ক আলোচনাগুলো এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় নেতিবাচক আলোচনা। আলোচনা শুরু হয় রাজনীতি কতটা খারাপ সেই বিশ্লেষণ করে এবং শেষ হয় রাজনীতি থেকে আমাদের কতটা দূরে থাকা উচিত তা দিয়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন শিশু ছোটবেলা থেকে রাজনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক আলোচনা শুনতে শুনতে বড় হয় এবং তরুণ বয়সে এসে উপলব্ধি করে, রাজনীতি থেকে তার কতটা দূরে থাকা উচিত। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা তো দূরের কথা, সেই তরুণের মধ্যে বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক সচেতনতাবোধ তৈরি হয় না। রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করাকে সে এক ধরনের অপরাধ বলে ভাবতে শেখে। অতীতে যেমন তরুণদের অনেকেই রাজনীতিতে আসতে চাইতেন, হাল আমলে সে রকম সক্রিয় রাজনীতিবিদ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। হালুয়া রুটির ভাগবাঁটোয়ারা নিতে আসা তথাকথিত তরুণ রাজনীতিবিদদের অবশ্য গোনায় ধরে লাভ নেই। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় রাজনীতিতে আসা দূরে থাক, অনেক তরুণই রাজনীতিকে ও রাজনীতিবিদদের ঘৃণা করেন। আরো ভয়ানক, তারা সেটি প্রকাশ্যে স্বীকার করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না!

একটা সময়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নীতি-আদর্শের কথা বলত, সেসবের জন্য আত্মত্যাগ করত, সংগ্রাম করত, আদর্শ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাত। সততা ও ন্যায়পরায়ণতার চর্চার একটি সুপ্ত প্রতিযোগিতা ছিল। যে যত বেশি সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠতার পরাকাষ্ঠা দেখাতে পেরেছে, সে তত বড় নেতা হিসেবে সম্যক পরিচিতি পেয়েছে। দেশের সাধারণ জনগণের কাছে আস্থা ও ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক হতে পেরেছে। কিন্তু দিন যত গেছে তত হাওয়া বদল হয়েছে। বদলে গেছে সব কিছু। সত্যের বদলে নানা রঙচঙ মেখে মিথ্যা এসে জায়গা নিয়েছে। এক সময় মিথ্যা (মিছা) বাড়তে বাড়তে সেটিকে রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেয়া হয়েছে, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই!’ কিংবা মিথ্যার আলঙ্কারিক ভার্সন ‘রাজনৈতিক রেটরিক’ (Political Rhetoric) কথাগুলোর মধ্য দিয়ে। মিথ্যার আবার অলঙ্কার কিসের? অলঙ্কার তো হওয়া উচিত সত্যের। অথচ এগুলো সর্বৈব মিথ্যা। প্রতিটি মিথ্যাই মারাত্মক কবিরা গুনাহ। কোনো মুসলমান জেনেশুনে মিথ্যা বা ছলচাতুর্যের আশ্রয় নিতে পারে না। অথচ মিথ্যা এখন চর্বিতচর্বণ। মিথ্যা ছাড়া যেন এখন কোনো রাজনীতিই হয় না। রাজনীতিবিদদের বেশির ভাগই এখন কোনো রাখঢাক ছাড়াই অন ক্যামেরা-টেলিভিশনে মিথ্যা বলে বেড়ায়। যে যতবড় মিথ্যুক সে এখন ততবড় নেতা। সকালে এক কথা তো বিকেলে আরেক কথা। রাজনীতি অঙ্গনে এখন আর কর্মী পাওয়া যায় না, প্রায় সবাই নেতা। রাজনীতির সেই সম্মান-মর্যাদা এখন প্রায় লুপ্ত।

রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ও লুটপাটতন্ত্রের শিকার হয়ে তার তথাকথিত ‘মূলধারা’ আজ অনাচার ও রুগ্নতায় ভরে গেছে। এই অধঃপতনকে পাল্টে দেয়া আজ গোটা জাতির জন্য জরুরি কর্তব্য হয়ে উঠেছে। রাজনীতিতে শক্তির বিন্যাস এখন আগের মতো নেই। দেশের কথিত মূলধারার বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো নীতি-আদর্শ-মতাদর্শকে প্রায় সর্বাংশে ত্যাগ করেছে। এসব দলের এখন প্রধান ভাবনা হলো- ‘যেকোনো উপায়ে যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যেতে হবে’। নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে হলেও এবং চুরি-বাটপাড়ি-প্রতারণা-সহিংসতা-বিদেশে তাঁবেদারি প্রভৃতির আশ্রয় নিয়ে হলেও গদিতে বসতে হবে। ক্ষমতার জন্য তাদের এই মরিয়া লালসার আসল কারণ ও উৎস কী? এর আসল উৎস হলো ব্যক্তিগতভাবে টাকাওয়ালা হওয়ার উদগ্র লোভ-লালসা। সত্যের খাতিরে বলতেই হবে, এমন অনেক রাজনীতিক রয়েছেন, তারা যে আজ বিপুল অর্থ-বৈভব ও সম্পত্তির অধিকারী তা প্রধানত রাজনীতির জন্যই সম্ভব হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী তাদের মূল পেশা (ব্যবসায়) ঠিক রেখে রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছেন। শুধু ঝুঁকেননি, তারা তাদের ব্যবসাকে রাজনীতির জন্যই অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে পেরেছেন, যা নিছক ব্যবসায়ী হলে সম্ভব হতো না। বাংলাদেশে দু’-তিনটি দলই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বাকিরা শুধু দল। আর কিছু আছে নামসর্বস্ব ভুঁইফোড় দল। তাদের ভূমিকায় সরকার বা দেশের কোনো তেমন লাভ বা ক্ষতি হয় না। কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রয়োজন হলে কেউ কেউ তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ন্যায়-নীতি, সততা আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো খুব একটা মানে বলে মনে হয় না। রাজনীতি পরিণত হয়েছে অনেকটা নীতিহীনতায়, যাকে অপরাজনীতি বলে। এই অপরাজনীতির কারণে দুর্বৃত্তায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়ে উঠছে দুর্বৃত্তরা। রাজার নীতি রাজনীতিকে তারা ব্যবহার করছে অপরাধ-দুর্নীতি, লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে। নানা বাহিনী গড়ে লুটতরাজ, টেন্ডারবাজি এমনকি ধর্ষণ-গণধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। রাজনীতিক নামে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নানা স্বার্থে এসব দুর্বৃত্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, মাসোয়ারা দিচ্ছে। সমাজ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, রাজনীতিকদের জনসেবা কথাটি রাজনীতির অভিধানে খুব সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। গ্রামগঞ্জের কোথাও গিয়ে নেতাকর্মীদের কাউকে এখন আর জনসেবা করতে দেখা যায় না, সবাই নিজ নিজ আখের গোছাতে ব্যস্ত, নিজ সেবায় মত্ত। একটা সময়ে দু’-চার গ্রাম খুঁজে একজন সোশ্যাল টাউট পাওয়া যেত। এখন যুগ পাল্টেছে। প্রতিটি গ্রামেগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় অবস্থাভেদে ১০-২০ জন কিংবা তারও অধিক পলিটিক্যাল টাউট-বাটপাড়-চিটার চোখে পড়ে। এদের কাছে রাজনীতি মানেই হলো, ২৪ ঘণ্টা ধান্দাবাজি-ধাপ্পাবাজি। এদের রুজি-রোজগারের দ্বিতীয় আর কোনো উৎস নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে শুরু হয় তাদের অপকর্ম, রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত চলতে থাকে। পদ বাণিজ্য করা থেকে শুরু করে অপরের পকেট কাটা, জোর জুলুমবাজি করে অর্থ-আত্মসাৎ করা কিংবা অপরের সম্পদ, জায়গাজমি জবরদখল করা, হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা তারা করে না।

টোটাল রাজনীতির ওপর ভর করে বেড়ে উঠছে একটি বৃহৎ দুর্বৃত্ত শ্রেণী। তাদের কাছে অপরাধ-দুর্নীতি-লুটপাট সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা, নীতি-নৈতিকতা সেখানে যেন কোনো বিষয়ই নয়। লোভ-লালসা ও ভোগ-বিলাস, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা, সততা ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অধঃপতন ও শূন্যতা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার অভাব দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসে আছে। এসব শিকড় জন্ম দিচ্ছে নিত্যনতুন নৈতিক, মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অপরাধ। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অবশ্যই জরুরি। নচেৎ রসাতলে যাবে দেশ। জনগণই হচ্ছে রাষ্ট্রের একমাত্র মালিক। এই জন্য সবার আগে দেশের মালিকানা এবং ভোটের অধিকার অবশ্যই তাদের হাতে সসম্মানে ফিরিয়ে দিতে হবে। তথাকথিত, ২০১৪-১৮-এর মতো নির্বাচন এ দেশের মানুষ আর দেখতে চায় না। যে দলই ক্ষমতা আসুক- দেশে গণতন্ত্র থাকলে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, দেশের জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত হলে, জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা থাকার পাশাপাশি, দেশে প্রকৃত আইনের শাসন ও ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক বিচার সংস্কৃতি নিশ্চিত হলে তবেই ভঙ্গুুর এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ মিলবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক, কুমিল্লা

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ