বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত থাকছে , আমদানি মূল্যস্ফীতি নিয়ে চিন্তিত অর্থ বিভাগ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ২:০১, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত থাকছে , আমদানি মূল্যস্ফীতি নিয়ে চিন্তিত অর্থ বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, জুন ৪, ২০২২ ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শনিবার, জুন ৪, ২০২২ ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

 

যুদ্ধ ও মহামারীর অভিঘাতে চরম অনিশ্চয়তায় বৈশ্বিক অর্থনীতি। এ অনিশ্চয়তার বাইরে নেই বাংলাদেশও। এর মধ্যেই আবার চলতি অর্থবছরের বিদায় মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। চলছে পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতি। নানা চ্যালেঞ্জকে সঙ্গে নিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

অস্থিতিশীল বৈশ্বিক জ্বালানি পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাজারটির পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হওয়ার কোনো নিশ্চয়তাও দিতে পারছেন না বাজার পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য পরিবহন খরচও এখন বাড়ছে। বিষয়টি অর্থ বিভাগকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্য, জ্বালানি ও সারের আমদানি মূল্যস্ফীতিকেই দেশের অর্থনীতিতে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে অর্থ বিভাগ।

অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি বছরে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), গম, রাসায়নিক সার, পাম অয়েল, সয়াবিন তেল, কয়লা, ভুট্টা ও চাল—এ নয় পণ্য আমদানিতে ব্যয় বাড়তে যাচ্ছে প্রায় ৮২০ কোটি ডলার (সর্বশেষ বিনিময় হার অনুযায়ী ৭২ হাজার ৯৮০ কোটি টাকার সমপরিমাণ)। এ অবস্থায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে সাজানো হয়েছে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজেটে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেয়া হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উৎপাদনমুখী প্রকল্পে বাড়তি বরাদ্দের মাধ্যমে জনসাধারণের আয় বাড়ানোরও পদক্ষেপ থাকছে আগামী অর্থবছরে। এছাড়া বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কভিডের সময় ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সারসহ জ্বালানি তেল, গ্যাস-বিদ্যুতের ভর্তুকি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও সম্প্রতি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধসৃষ্ট ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থেকে পুনরুদ্ধারই নতুন বাজেটে প্রাধান্য পেতে যাচ্ছে।

বাজেটে ইঙ্গিত থাকলেও অর্থবছরের শুরুতেই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হবে না বলে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আসন্ন বাজেটে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হবে। যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে পরে দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানো হবে। তবে এ ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়া হবে না। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন খাতের মোট ভর্তুকি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

অর্থবছরের শুরুতেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে কয়েক মাস পর্যবেক্ষণ করা উচিত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরাও। এ বিষয়ে তাদের প্রস্তাব হলো শুরুতে পর্যবেক্ষণ করে পরে প্রয়োজনে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির বিষয়টিতেও জোর দিতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্ববাজারে সার, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায় ভর্তুকির চাপ বাড়বে। বাজেট থেকে এত পরিমাণ অর্থ দেয়ার সক্ষমতা নেই সরকারের। এজন্যই আমরা অনেক দিন থেকেই রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে আসছি। কিন্তু রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারছে না সরকার। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো গেলে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের কষ্ট দেয়া লাগত না। তাই যদি দাম বাড়াতেই হয় তাহলে সবদিক বিবেচনায় নিয়ে সহনীয় পর্যায়ে বাড়ানোটাই যৌক্তিক হবে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আপত্তি রয়েছে ব্যবসায়ীদের। এরই মধ্যে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত না নিতে সরকারের কাছে আবেদনও করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তাতে মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হবে।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়ছে এটা ঠিক। জ্বালানি আমদানির পর সরবরাহের ক্ষেত্রে আমরা যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারি তাহলে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম খুব বেশি বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। এজন্য আমরা এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়িয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে বলছি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের করণে সারা বিশ্বই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডগুলোর পণ্য বিক্রি করতে পারছে না। এর প্রভাবে আস্তে আস্তে আমাদের রফতানিও বাধাগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে যদি জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে আমরা বিশ্ববাজারে কোনোভাবেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না।

অর্থ বিভাগ বলছে, কভিডের অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতে গোটা বৈশ্বিক পণ্যবাজারেই বড় ধরনের আলোড়ন তুলে দিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত। সাম্প্রতিক সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারের বেশিতে। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে অন্তত ১২ গুণ। আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি বছরের এপ্রিলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। ইউরিয়া সারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে তিন গুণ। সয়াবিন তেল ও গমের দাম বেড়েছে যথাক্রমে ৪০ ও ৮০ শতাংশ। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কভিড-উত্তর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। শুধু নয়টি পণ্যেই আমদানি ব্যয় বাড়তে যাচ্ছে অন্তত ৮২০ কোটি ডলার। এর সঙ্গে আবার শিল্প কাঁচামাল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামের পাশাপশি পরিবহন খরচও বাড়ছে, যা সার্বিকভাবেই সরকারের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, এবারের বাজেটটা কঠিন সময়ে দিতে হচ্ছে। কারণ করোনার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এতে সারা বিশ্বেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। আমদানিনির্ভরতায় দেশের বাজারেও কিছু কিছু পণ্যের দাম এরই মধ্যে বেড়েছে। কিছু পণ্যে বেশি ভর্তুকি দেয়ার কারণে তা এখনো বাড়েনি। তবে এভাবে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হলে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে। তার পরও আমি মনে করি এ মুহূর্তে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত নয়। কারণ এসব পণ্যের দাম বাড়ালে আমরা যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় কথা বলছি, তা বাধাগ্রস্ত হবে। তাই আরো কিছুদিন পর্যবেক্ষণের পর যদি আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে তখন সমন্বয়ের চিন্তা করা যেতে পারে। আবার ততদিনে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দামও হয়তো কমে আসতে পারে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংসদে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন ৯ জুন। এরই মধ্যে তার বক্তব্যের খসড়া তৈরিতে কাজ শুরু করেছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, বাজেট প্রস্তাবে আগামী অর্থবছরের জন্য আটটি মূল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত বাড়তি ভর্তুকির জন্য অর্থের সংস্থান করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ অব্যাহত রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এছাড়া আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশের মধ্যে রাখা, রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি হ্রাস, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেয়া ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানোকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রণয়ন-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার অত্যন্ত কৌশলী হবে। মূল কৌশল হবে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা অক্ষুণ্ন রেখে সরবরাহ বৃদ্ধি করা। সেজন্য পরিচালন বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি কেনা, নতুন ভবন নির্মাণসহ বিলাসী ও কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়গুলো কমিয়ে অর্থ সাশ্রয় করা হবে। এ অর্থ সরবরাহ করা হবে উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে।

তিনি আরো বলেন, আমদানি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বিলাসদ্রব্য ও দেশে উৎপাদনযোগ্য পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। উন্নয়ন বাজেটের আওতায় কর্ম সৃজনকারী ও উৎপাদনমুখী প্রকল্পগুলোয় অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এগুলোয় প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দেরও ব্যবস্থা করা হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেয়ার বিষয়টিও অব্যাহত রাখা হবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ