আসন্ন জাতীয় নির্বাচনটি কি একটি ভাগবাটোয়ারার নির্বাচনই হতে যাচ্ছে?
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০২৩ ২:১৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০২৩ ২:১৬ পূর্বাহ্ণ

সাকিব হাসান
নির্বাচন নিয়ে যা হচ্ছে তাকে গুড়-সন্দেশের ভাগাভাগির সাথে তুলনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বিরোধী দলের এক-নেতা এই ভাগ পাওয়াকে বলেছেন, খুদ-কুঁড়ার ভাগ পাওয়া; বলা বাহুল্য, খুবই জুতসই শব্দবন্ধ। তবে গুড়-সন্দেশ বা গুড়-বাতাসা অথবা দুধ-মাখন-পনিরের চেয়ে খুদ-কুঁড়া অনেকটাই তাচ্ছিল্যের বটে। খুদ দিয়ে খুদভাত হয়, জাউ-টাউও হয়-এসব গরিবের খাবার ছিল। সখ করে ধনীরাও খেতে পারে। যেমন, ইদানীং চটা বেশ জাতে উঠে গেছে-পূর্বাচলের ওদিকটায় নদীর পাড়ে বড়লোকেরাই দেদার খাচ্ছে এই চটা। ফাস্ট ফুড ছেড়ে অনেকেই হর সন্ধ্যায় ভিড় করছে ওই লীলা মার্কেটে; কেউ ভেবেছিল এমনটা! কুঁড়া বরাবরই মোরগ-মুরগি-হাঁসের খাবার। খুদও মুরগির বাচ্চার খাবার। হালে এই কুঁড়াও জাতে উঠেছে। ভোজ্যতেল হচ্ছে কুঁড়া থেকে।
ভাগ-বাটোয়ারার বড় ব্যবহার হচ্ছে মাতা-পিতার মৃত্যুতে ভাইবোনদের সম্পত্তির ভাগ নিয়ে। একই জমি নানাজন যৌথভাবে ভোগ করলেও কার কোনটুকু সেজন্য বাটোয়ারার দরকার হয়। এই বাটোয়ারা তথা বণ্টননামা রেজিস্টার্ডও হতে পারে। এখন আবার জমি বা ভবন কেনা-বেচায় এই বাটোয়ারার গুরুত্ব বেড়ে গেছে। প্রসঙ্গক্রমে বলা, এই বণ্টন বা বাটোয়ারার অনুপস্থিতিতে অসংখ্য মামলা চলছে আমাদের দেওয়ানি আদালতগুলোতে। কিছু দিন আগে একটা কবিতা পড়েছিলাম ‘বানরের পিঠে ভাগ’ শিরোনামে। কবি বলতে চেয়েছেন, আমাদের স্বাধীনতাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গত বছরের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যারা ছিল, এবার তাদের কেউ নেই; এবার অন্যরা। বানরের পিঠা ভাগের গল্প অবশ্য একটু ভিন্নপাঠ- পিঠা ভাগ করতে গিয়ে বানর নিজের ভাগটাই বড় করে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি যদি আওয়ামী লীগকে ওই বানর বলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। রূপকার্থে তো কত কিছুই বলা হয়!
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনটি কি একটি ভাগবাটোয়ারার নির্বাচনই হতে যাচ্ছে? আজকাল বিভিন্ন টিভির টক-শো দেখা সময় কাটানোর উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কতজন কত কিছু বলছেন! কত কত তত্ত্ব, ভাবনা, মতামত; কোনো উপান্ত খুঁজে পাওয়া ভার। মাঝে মাঝে মনে হয়, চিন্তার এত বহুমুখিনতা, এত এত বিজ্ঞজন দেশের কোনো কাজে না এলেও এসব তো বিদেশে রফতানি করাই যায়। সিঙ্গাপুরের প্রধান তিন আয়ের একটা নাকি বুদ্ধি বিক্রি থেকে! তো নির্বাচন ভাগ-বাটোয়ারার কিনা এই প্রশ্নটাও ওই টকশো থেকেই। কেউ আবার বলতে চায়, এটি আদপে কোনো নির্বাচনই না। কেন এমন কথা উঠেছে?
নির্বাচন আদতেই একটা খেলা। নির্বাচন গণতন্ত্রে অর্নিবচনীয় একটা পর্যায়। দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচনই বৈধ পন্থা। ফলে এই খেলা আসলেই হাজারো ঝামেলা। এই ঝামেলার বড় কারণ, স্বাধীনতার বায়ান্ন বছরেও সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, যার জন্য রাজনীতিকরাই সমধিক দায়ী; সে অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।
গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নির্বাচনে বহু দলের অংশগ্রহণ কাম্য- এটি নির্বাচনের কেবল সৌন্দর্যই নয়, শর্তও বটে। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই দেশের কয়েকটি নির্বাচনে নানা কারণে বড় রাজনৈতিক দল (ভোটের বিবেচনায়) অংশ নেয়নি। একটি নির্বাচনে বড় কোনো দল অংশ না নিলেও নির্বাচন বৈধ হতে পারে, তখন সরকারও বৈধ হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনটি ঠিকঠাক না হলে সরকার যদি টিকেও যায়, থেকে যায় নৈতিকতার প্রশ্ন।
জাতীয় নির্বাচনে বড় কোনো দলের অংশগ্রহণ না করাই নয়, আরো একটি দুর্ভাগ্য এই যে, কখনো কখনো সরকারকে বিরোধী দল ঠিক করে দিতে হয়, ঠিক করতে হয় বিরোধী দলের ভূমিকা কী হবে, সেটাও। ১৯৮৮, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি.), ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এটির মূল কারণও স্পষ্ট। জনভোটের বদলে অন্য উপায়ে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হলে ক্ষমতাসীনরা সব শক্তির নিয়ামক হয়ে ওঠে, আর তখন সরকারকেই ঠিক করতে হয় বিরোধী শিবিরে কারা বসবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি খুবই জরুরি। সরকারকেই যখন বিরোধী ভূমিকা ঠিক করে দিতে হয়, তখন যথার্থ বিরোধী দলের ধারণাটির মৃত্যু ঘটে। বিরোধী দল যথার্থ ভূমিকা না রাখতে পারলে একটি সরকার স্বৈরাচার হয়ে ওঠে- জবাবদিহির প্রশ্ন থাকে না তখন। আবার সরকারই যদি বিরোধী দল ঠিক করে দেয়, সেই বিরোধী দলের কোনো ভূমিকা থাকে না- হয়ে ওঠে গৃহপালিত। এটি সম্মানের নয়। জাতির জন্য চরম অবমাননাকর।
আমাদের রাজনীতিতে প্রধান একটি দল, তথা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। ফলে সরকারকেই আবারো বিরোধী দল ঠিক করে দিতে হবে। সেটাই নির্বাচনপূর্ব সেমিফাইনাল; সম্ভবত নির্বাচন ও রাজনীতির মাঠে সেটাই চলছে এখন।
বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে না, নাকি সরকার বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখছে, এই নিয়ে নানা মত আছে। অনেকেই বলছেন, বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার কৌশলে আওয়ামী লীগ চূড়ান্তভাবেই সফল। ঠিক ততটাই ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি ভাঙার কৌশলে। প্রথমটি সফল; পরেরটায় ব্যর্থ বলেই আসন্ন নির্বাচনটি আসন ভাগাভাগিতে রূপ নিয়েছে। নির্বাচনে মূল নিয়ামক আওয়ামী লীগেরই দু’অংশ। নৌকা মার্কার আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবং নৌকাহীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। অন্যরা হয়ে পড়েছে নিতান্তই গুরুত্বহীন। এই গুরুত্বহীনরাই বসে আছে খুদ-কুঁড়ার ভাগ পেতে। বিএনপিকে ভাঙতে পারলে তথা ওত পেতে মুরগি ধরতে পারলে এই অবস্থা নাও হতে পারত।
আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে ভোট ছাড়াই ১৫৩ আসনে জয়ের ঘটনা মাথায় রেখে সর্বত্র ডামি প্রার্থীর নতুন কায়দা উদ্ভাবন করেছে। এটি আগে ছিল কেউ যদি বাছাইয়ে বাদ পড়ে, তখন সামাল দেয়ার জন্য। এবার হচ্ছে নৌকা প্রার্থী যেন ভোটের মাঠে একা হয়ে না পড়ে। শরিকদের সাথে আসন দফারফার পর এই ডামিদের কেউ কেউ আবার বিদ্রোহী হয়ে পড়বে। যদিও দলটির গঠনতন্ত্রে বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা; সেটাও হয়তো এবার পরিপালিত হবে না। একটি দলের জন্য এটি নিঃসন্দেহে ক্ষয়িষ্ণুতার আভাস।
আন্তর্জাতিকভাবে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে মান্যতা দেয়ার কয়েকটি মানদণ্ড আছে। এটি প্রতিযোগিতামূলক কোনো ফুটবল-ক্রিকেটের মতোই। সবার দেখার মধ্যেই হবে-এমন নয় যে, আগের দিনে ক’খান গোল দিয়ে রাখা যাবে। খেলা হবে দর্শকের অবাধ অংশগ্রহণে। সমান সমান দল থাকবে; প্রতিদ্বন্দ্বী সমান সামান না হলেও উনিশ-বিশ হবে। রেফারি ও খেলা পরিচালনার সাথে সম্পৃক্তরা নিরপেক্ষ হবে। খেলার ফলাফল আগেই নিশ্চিত হবে না; বলা যাবে না, অমুক ১০০ রান করবেই। এখন এই বিবেচনায় আসন্ন নির্বাচনকে দেখার দরকার আছে। এই দেখাটা আগাম দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে বলেই অনেকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে আদৌ নির্বাচন বলতেই নারাজ।
শুরু হয়েছিল ভাগবাটোয়ারার প্রসঙ্গ দিয়ে। মুরগি ধরা বা বিএনপি ভাঙায় স্পষ্টত আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগ চাইলে তিনশত আসনই পেতে পারে। নির্বাচন করেই সেটা সম্ভব। এই দুর্নাম দলটি নেবে না। নেবে না বলেই বাটোয়ারার প্রশ্ন এসেছে। জাপা অনেক আগেই নিজস্বতা বিকিয়ে দিয়ে পরপর দু’বার সংসদে বিরোধী দল। বিএনপি নেই বলে তৃতীয়বারও সেটা হতে চাইছে জাপা। কিন্তু এককভাবে নির্বাচন করে সেটা অর্জনের মুরোদ নেই তাদের। তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভিক্ষার দানের ওপর ভর করছে। বাড়িয়ে নিতে চেয়েছে খুদ-কুঁড়ার ভাগ। ২৬ আসনে ছাড়ের বন্দোবস্তই নাকি পাকা! কিন্তু নৌকাহীন আওয়ামী লীগের ডামি অথবা বিদ্রোহী প্রার্থীদের ছাপিয়ে বাটোয়ারায় প্রাপ্ত আসনের ক’খানা জাপা ধরে রাখতে পারবে, সেটাই জৌলুশহীন নির্বাচনে একটি চমক হতে পারে।
আওয়ামী লীগের শরিক ১৩ দলের জন্য মাত্র ছয়টি আসন দেয়ার কথা প্রায় পাকা হয়েছে শেষ পর্যন্ত)। তাও হাতজোড় করে অনেক কাকুতিমিনতি, গায়ে অনেক হাত বুলিয়ে পাওয়া। এই ছয়টি আসন কেবল তিনটি দলের কপালে জুটেছে। মেনন-ইনু-মঞ্জুর যথাক্রমে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও জেপিই। জোটের শরিক তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর একটিও পেলেন না। আবার এই ছয়টিতে নৌকার প্রার্থীকে বসিয়ে দিয়ে শরিকদেরই নৌকা প্রতীক দেয়া হবে। তাতেও কি শেষ রক্ষা হবে ইনু-মেননের? এটাও দেখার আছে। স্মর্তব্য, এই দুই রাজনীতিকই আওয়ামী লীগের কাঁধে সওয়ার হয়ে দু’বার মন্ত্রী হয়েছেন। নিজের মেরুদণ্ড সোজা করতে পারেননি। করুণা হয় এদের জন্য।
যথার্থ অর্থেই খুদ-কুঁড়া খেতে গেছে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম এবং কল্যাণ পার্টি- পা চেটে চেটে (দুঃখিত, এই শব্দ ব্যবহারের জন্য) হলেও কিছুটা ভাগ পেতে চায়। আসন বণ্টনে ভাগ নেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ৬-৭টি ইসলামী দলের। কংগ্রেস নামের দলটির খোঁজই নেই। আবার কেন্দ্রীয়ভাবে আসন ছেড়ে দিলেই এই খুদ-কুঁড়া প্রত্যাশীরা আসন পাবে, এমন নয়। এটা নিশ্চিত যে, বিএনপিহীন নির্বাচনে নৌকা এবং নৌকাবিহীন আওয়ামী লীগের ডামি কিংবা বিদ্রোহীরা জিততে মরিয়া হবে। এমন সুযোগ জীবনে ক’বার আসে! তার চেয়ে বড় কথা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে লীগের কর্মীরা নৌকা বা আওয়ামী লীগের বাইরে কাউকে জিততে দেবে তো? এসবই হবে জানুয়ারির নির্বাচনের মূল খেলা, যদি বিএনপি ও সমমনা ভোটার ব্যতিরেকে সর্বোচ্চ ৫০ ভাগ ভোটারের জীবিতদের সবাই ভোট দিতে যায়। এমন তো হয় না কখনো। তাও হোক। আমরা দেখব। আর এই নির্বাচনকে কেন আসন ভাগাভাগির নির্বাচন বলবো না, কেউ বলে দেবেন কি?
জনতার আওয়াজ/আ আ