প্রহসনমূলক নির্বাচন দেশকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৯, ২০২৪ ৫:৩২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৯, ২০২৪ ৫:৩২ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ১৮ কোটি মানুষের দাবি এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বের আহ্বান পরোয়া না করে পূর্ব নির্ধারিত ফলাফলের একদলীয় একতরফা ভোটার বর্জিত ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে মূলতঃ বিজয় হয়েছে স্বতস্ফূর্ত ভোট বর্জনকারী গণতন্ত্রকামী বীর জনতার।
তিনি বলেন, চরম কলংকিত অপদস্তমূলক লজ্জার পরাজয় ঘটেছে গণবিচ্ছিন্ন বেপরোয়া একনায়ক মাফিয়া প্রধান শেখ হাসিনা গংদের। এই দিনটি অনন্তকাল একটি জঘন্য কালো দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দিনে ভোট বর্জন করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ আওয়ামী লীগকে লাল কার্ড দেখিয়েছে।
৭ জানুয়ারী বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগনের অভাবনীয়-অভূতপূর্ব নীরব প্রতিবাদে একটি উদ্ভট, গণ বর্জিত প্রহসনের প্রকাশ্য অটো ভোট ডাকাতির মঞ্চায়ণ দেখলো দেশবাসীসহ গোটা বিশ্বের মানুষ। শত ভয়-ভীতি, জেল-জুলুম নির্যাতন-প্রলোভন ও সরকারের সাড়াশি চাপ উপেক্ষা করে ভোট প্রদান না করার মাধ্যমে জনগণ এই নির্বাচনকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) বিকেলে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, ৭ জানুয়ারি গভীর রাত থেকে চুরি-ডাকাতি, জাল ভোট, শিশু কিশোর ভোট, রাস্তা থেকে পথিক ধরে নিয়ে ভোট, একই ব্যক্তির ৫০ ভোট, মিনিটে ৫০ ভোট, একই লাইন থেকে ঘুরেফিরে বার বার জাল ভোট দিয়েও বিকাল তিনটা পর্যন্ত ২৭ দশমিক ১৫% ভোটের ঘোষণা দিয়ে গণভবনের চাপে আবার এক ঘন্টা পরেই ৪০% এবং গতকাল দুপুরে তা আরেক দফা বাড়িয়ে ৪১ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভোটের গোজামিলের ভৌতিক হিসাব বানানোর এই ভূয়া হাস্যকর নির্বাচন ভোটের ইতিহাসে কলংক তিলক উৎকীর্ন করলো ডামি সরকার।
বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ গণতান্ত্রিক বিশ্ব এই অংশগ্রহনহীন ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি প্রদান করেছে। বিশ্বের সমস্ত মিডিয়া এবং পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগন ও ভোটার সম্পর্কহীন পুরোপুরি ‘ওয়ান উয়োম্যান শো’-এর ঘোষিত জয়-পরাজয়ের ভোট বলে আখ্যায়িত করেছে। পাতানো ডামি নির্বাচনের ফাঁদে পা দেয়নি দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ। সারা দেশের ভোট কেন্দ্রগুলো ছিল ভোটারশূন্য।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার এই প্রহসনমূলক নির্বাচন দেশকে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা ব্রিটিশ পর্যবেক্ষক জেজ কৌলসন সাংবাদিকদের বলেছেন, আই ফাউন্ড দ্য নর্থ কোরিয়া মডেল হিয়া’র। বাংলাদেশে উত্তর কোরিয়া স্টাইলের একদলীয় নির্বাচন হয়েছে।
রিজভী বলেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির নির্বাচনের পর আবারো অভিনব কায়দায় বিরোধীদলহীন, ভোটারবিহীন ভোট ডাকাতির একটি ডামি নির্বাচন করার জন্য গত ৫ বছর গণবিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনা বিএনপিসহ বিরোধী দল ও ভিন্ন মতের প্রতিটি মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছেন। বিএনপির নেতাকর্মীদের গুম খুন নির্যাতন মিথ্যা মামলা হুলিয়া গৃহ ছাড়া করেছে।
জনপদগুলো গডফাদার-সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ-কিলার বাহিনীর মাধ্যমে জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ বানিয়েছে। দেড় লক্ষাধিক মিথ্যা মামলায় অর্ধ কোটির বেশী বিএনপির নেতা কর্মীকে আসামী করা হয়েছে। কোটি অধিক বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্বাস্তু করেছে। কারাগারগুলোতে ধারন ক্ষমতার কয়েকগুন বেশী বিএনপি নেতাকর্মীকে বন্দী করে রেখে মৃত্যুর মুখে নিপতিত করেছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব বলেন, দেশকে করেছে বৃহৎ কারাগার। কারা হেফাজতে প্রতিদিন বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের কারো না করো মৃত্যুর সংবাদ আসছে। নতুন নতুন কালাকানুন করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশা ও সাধারন জনগনকে শৃংখলিত করেছে। আচার-বিচার-আইন আদালত, পুলিশ, সিভিল প্রশাসন সবকিছু দলীয়করন করে প্রতিষ্ঠা করে সমস্ত মৌলিক অধিকার কবর দিয়ে ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। লুটপাট করে দেশকে দেউলিয়া বানিয়েছে।
সিন্ডিকেট করে মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের দাম আকাশচুম্বি করে দূর্ভীক্ষের পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। দেশের জনগনকে ভোটারহীন করে রিফিউজিতে পরিনত করেছে। এতো কিছু করার পর শেখ হাসিনার পরিকল্পিত এই স্বেচ্ছাচারি একতরফা প্রহসনের ভোটার বর্জিত নির্বাচনের পর এখন কদর্য উল্লাসে মেতে উঠেছে। ডামি নির্বাচনের ডামি প্রার্থীরা এখন ডামি পার্লামেন্টে নেতৃত্ব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদের কোন বৈধতা নেই।
এক মূহুর্তে ক্ষমতায় থাকার কোন অধিকার নেই। এই অবৈধ সরকারকে জনগন মানে না। আমি এই মুহূর্তে পাতানো গণবিরোধী ডামি নির্বাচন বাতিল করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষনার আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় জনগনের চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আরো দুর্বার করে এই ডামী সরকারের পতন ঘটানো হবে। ইনশাআল্লাহ।
রিজভী বলেন, পুরোপুরি এই ‘ওয়ান উয়োম্যান শো’-এর ঘোষিত জয়-পরাজয় ও ভোটের দেখানো সংখ্যা নিয়ে বিশ্লেষণ করার বা আনন্দ-বেদনা প্রকাশের কিছু নেই। কাউকে দিবে কিঞ্চিৎ এবং কাউকে করবে বঞ্চিত- এই ধারার এক স্বেচ্ছাচারি একতরফা প্রহসনে শেখ হাসিনা কাউকে জিতিয়েছেন, কাউকে হারিয়েছেন। সবই ভেলকিবাজি ও তার মর্জির ফল।
এর সঙ্গে জনগণ, ভোটার বা অন্য কারোর কোনও সম্পর্কই নেই। সাধারণ মানুষের এই বর্জন বর্তমান ‘ডামিক্রেসী সরকার’ ও শাসকগোষ্ঠীর প্রতি নীরব গণ-অনাস্থার সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। দৃশ্যমান এই অনাস্থা ক্ষমতাসীনদের ন্যূনতম বৈধতার ভিত্তি তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ভোটার সংখ্যা বাড়ানোতে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সরকার একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা ভুলুন্ঠিত করেছে এবং প্রজাতন্ত্রের জনগণের উপর কলঙ্ক লেপন করেছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যে পূর্বনির্ধারিত তা প্রকাশ্যে নির্বাচন কমিশন সচিব জাহাঙ্গীর আলম রবিবার (৭ জানুয়ারি) রাতে ফলাফল ঘোষনার সময় মিডিয়ার মাইক্রোফোন অন রেখে আওয়ামী দলদাস কর্মকর্তাদের সাথে সলাপরামর্শ করার সময় ফাঁস করে দিয়েছেন। যা মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে গোটা দেশের জনগন অবলোকন করেছেন।
সেখানে মঞ্চে পাশে বসা জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক একেএম হুমায়ূন কবীরের সঙ্গে আলাপের সময় ইসি সচিবকে বলতে শোনা যায়, ‘যেয়ে ঘুমাইয়া যামুগা। এখানে বসে থেকে লাভ আছে? সবাই রেজাল্ট জানে। ৬৪ জেলার ডিসিদের মেসেজ আছে। ৬৪ টা জেলার রেজাল্ট কি হবে সবাই জানে। পড়ে চলে যামুগা। ডিসিরা পাঠাইছে না। সব আছে। আমার কাছে আছেতো। এ সময় পাশে থাকা কর্মকর্তা ইসি সচিবের কানে কানে ফলাফল নিয়ে কিছু বলছিলেন। তখন ইসি সচিব বলেন- বিতর্কিত বানাইয়া ফালাইছে।’
সরকারের অন্যতম দোসর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের বলেছেন, সরকার যেখানে যাকে জেতাতে চেয়েছে, সে জিতেছে। এই নির্বাচন সরকারের নিয়ন্ত্রণেই হয়েছে। যেখানে তাদের প্রার্থীকে জেতাতে চেয়েছে, সেখানে তারা সেই ব্যবস্থা নিয়েছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন দেখানোর নাটক করতে, গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে নকল দল তথাকথিত কুইন্স পার্টি, ভূইঁফোড় পার্টি, ড্রিঙ্কস পার্টি, ছিন্নমূল পার্টি এবং খুচরা কিছু পার্টি, উচ্ছিষ্টভোগী জোট, গৃহপালিত বিরোধীদলকে এমপি বানানোর মূলার প্রলোভন দেখিয়ে নির্বাচনে এনেছিল। শেখ হাসিনা তাদের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দেয়ার পর এখন তারা গাল ফুলিয়ে প্রকাশ্যে কিভাবে ভোট ডাকাতি হয়েছে, তার সরল সত্য গল্প বলে হা হুতাশ করে বেড়াচ্ছেন।
রিজভী বলেন, দুর্নীতিবাজ ‘ডামি সরকার’ দিয়ে দেশ চলতে পারেনা। ভোট ডাকাত শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে রেখে শিগগিরই আরেকটি ‘রিয়েল নির্বাচনে’র জন্য প্রস্তুত থাকার জন্য মাফিয়া শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ আহ্বান জানিয়েছেন। তার নেতৃত্বে গণতন্ত্রকামী মানুষের চলমান আন্দোলন এগিয়ে যাবে, জনগনের বিজয় হবেই হবে ।
চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বারো কোটি মানুষের লুন্ঠিত ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার চলমান আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। আপনি যে দল কিংবা যে মতেরই হোন, আমাদের আন্দোলনকে বেগবান করতে আমাদের হাতকে শক্তিশালী করুন। আমাদের সঙ্গে রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিন। আপনার সাধ্য ও সামর্থের সবটুকু দিয়ে বিএনপিসহ ৬৩টি রাজনৈতিক দলের চলমান আন্দোলনের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। কারণ, আপনার তথা প্রতিটি নাগরিকের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই আমাদের চলমান আন্দোলন।
জনতার আওয়াজ/আ আ