সমান্তরাল : সেলিম মোহাম্মেদ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, মার্চ ১৫, ২০২৪ ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, মার্চ ১৫, ২০২৪ ৩:৪১ অপরাহ্ণ

আমাদের কোমলমতি শিশুদেরকে শিখানো হচ্ছে – এ দেশের মুসলিম শাসকরা ছিল বহিরাগত, সত্যিই কী তাই? না, কথাটা অর্ধ সত্য যা মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর। ভারতীয় আরএসএস বলে বেড়ায়- বাবর হলো বহিরাগত, কারণ বাবর এসেছে উজবেকিস্তান থেকে। হিন্দুদের কনিস্ক যদিও সেই উজবেকিস্তান থেকেই এসেছে, তাঁকে কিন্তু বহিরাগত বলা হয় না! এখানে পরিস্কার ভাবে প্রমানিত হয়, ধর্মীয় ঘৃণা থেকেই এমনটা করা হয়।
এম এন রায় একজন হিন্দু লেখক, তাঁর লেখা একটি বই ” The Historical Rol of Islam ” সেই বইয়ে তিনি লিখেছেন, পৃথিবীতে হিন্দুরা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে মুসলমানদের, যদিও হিন্দুদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল মুসলিম শাসকদের হাত ধরে সুলতানি আমলে। হিন্দুরা এই কথাটা স্বীকার করে না। আরএসএস না হয় মুসলিম বিদ্বেষী তাই মুসলিম শাসকদেরকে বহিরাগত বলে থাকে, নব্বই ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশে কেন শিশুদের শেখানো হচ্ছে মুসলিম শাসকরা বহিরাগত? মোর্য, আর্য, গুপ্ত,পাল,সেন এবং মুসলিম সবাই তো ছিল বহিরাগত! তাহলে একমাত্র মুসলমানদেরকে কেন বলা হচ্ছে বহিরাগত?
শিশুদের পাঠ্য বইয়ে আরো লেখা হয়েছে, সেন বংশের শাসকরা ছিল খুবই ভালো এবং গনতান্ত্রিক। সেন বংশের শাসনামলে বাংলা চর্চা হতো, মুসলিম শাসকরা বাংলায় এসে বাংলা চর্চা বন্ধ করে দেয়। এই কথাগুলো তো একেবারেই মিথ্যা এবং ভ্রান্ত। এই ধরনের অপপ্রচার সবচেয়ে বেশি করেছেন ” সুকুমার সেন ” তাঁর বিভিন্ন লেখায়, এসব যে শুধুই অপপ্রচার তার শক্তিশালী প্রমাণ হলো, সেনদের শাসনামলের পর প্রায় আড়াই শতাধিক সংস্কৃতি সাহিত্য পাওয়া গেলেও একটিও বাংলা সাহিত্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাহলে মুসলিম শাসকরা কী করে বাংলা চর্চা কিংবা সাহিত্যকে ধ্বংস করলো, যেখানে সেনদের পরে শুরু হয়েছে মুসলিম শাসন? উপরন্তু নিহার রঞ্জন রায় এর লেখা ” বাঙ্গালীর ইতিহাস আদি পর্ব ” পড়ে দেখবেন সেখানে লেখা রয়েছে ভিন্ন কথা। তিনি তাঁর বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন, গৌড় নাম লইয়া বাংলার সমস্ত জনপদগুলিকে একিভুত করিবার জন্য শশাঙ্ক,পাল ও সেন রাজারা যেই চেষ্টা করিয়াছেন, তাহাদের সেই চেষ্টা সফল হয় নাই। পাঠান আমলে সমস্ত বাংলা একিভুত হইয়াছিল এবং এর সম্পুর্ন পুর্নতা লাভ করিয়াছে আকবরী আমলে । এই কয়েকটি লাইন থেকে বুঝা যাচ্ছে মুসলিম শাসকরা বাংলাকে ধ্বংস করেনি, করেছে সমৃদ্ধ।
সেনদের আমলে সবচেয়ে বেশি বর্ণ বৈষম্য করা হয়েছে এই বাংলাকে নিয়ে। সেনরা এসেছে কর্নাটক থেকে, সেনরাই বর্ণ এবং গোত্রীয় বৈষম্য সৃষ্টি করে। সেনদের সময়ে বলা হতো, যদি কেউ বাংলায় ধর্ম গ্রন্থ পাঠ করে তাহলে সে রৌরক নামের নরকে যাবে। অথচ মুসলিম শাসকরা তাঁদের শাসনামলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ভগবত গীতা এবং রামায়ণ সংস্কৃত থেকে বাংলায় রুপান্তরিত করে। কোন মুসলিম শাসক কিংবা মুসলমান ধর্মে, বর্ণ বা গোত্রীয় বৈষম্যের স্থান নেই, আমাদের ধর্ম এসব বৈষম্যের বিরুদ্ধে। সেন শাসনামলে এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এসব বৈষম্য ছিলো আজও বিরাজমান। আর আমাদের কোমলমতি শিশুদের শেখানো হচ্ছে সম্পুর্ন অসত্য ইতিহাস যা কোন ভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়।
এসব অসত্য বিপরীতমুখী শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভুলিয়ে, নিজেদেরকে পরিচয়হীন করার জন্যই শিশুদের পাঠ্য বইয়ে এসব লেখা হয়েছে, এমন কি আমাদের চোখে দেখা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পর্যন্ত ভুলভাল তথ্য দিয়ে কিছু মানুষের ইচ্ছা মতো উপস্থাপন করা হয়েছে বিভিন্ন পাঠ্য বইয়ে, যাতে আমাদের সন্তানদের মনে ঘৃণা জন্ম নেয় নিজ ধর্ম গোষ্ঠী এবং আমাদের অর্জিত স্বাধীনতার প্রতি। সহানুভূতিশীল হয়ে উঠে একটি বিশেষ দেশ জাতি ও ধর্মের প্রতি। মীর জাফর যেভাবে বাংলাকে তুলে দিয়েছিল ইংরেজদের হাতে, ঠিক সে ভাবেই নব্য মীর জাফরেরা ভুল ইতিহাস শিখিয়ে বাংলা এবং নব্বই ভাগ মুসলমানকে তুলে দিতে চাচ্ছে একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর হাতে।
আমাদের সন্তানদের হাতে তুলে দিতে হবে সঠিক ইতিহাসের বই। এই বাংলার জন্ম একাত্তরে হয়নি! এই বাংলার জন্ম সাতচল্লিশে হয়নি, এই বাংলার জন্ম হয়েছিল তেরশ শতাব্দীতে একজন মুসলিম শাসক ” শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের ” হাত ধরে। তিনিই ছিলেন স্বাধীন বাংলার প্রতিষ্ঠাতা, তখন এই বাংলার টাইটেল দেয়া হয়েছিল – ” সুলতানে বাঙ্গালা “
এই বাংলা কোন মোর্য,আর্য, গুপ্ত,পাল কিংবা সেনদের হাত ধরে আসেনি। আমাদের উচিত শিকড়ের সন্ধানে সঠিক ইতিহাস খুঁজে বের করা। যারা এই পাঠ্য বই আমাদের সন্তানদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে, তাঁদের উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে নতুন করে যুগোপযোগী পাঠ্য পুস্তক শিশুদের হাতে ধরিয়ে দিতে হবে, তা না হলে ধ্বংস হয়ে যাবে পুরো জাতি।চলবে
জনতার আওয়াজ/আ আ