কাঁচের দেয়ালে ঘেরা পরিপাটি গণতন্ত্র কতোটা টেকসই?
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, জানুয়ারি ২০, ২০২৪ ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, জানুয়ারি ২০, ২০২৪ ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাসময়ে সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন। ক্ষমতাসীনদের নিকট ৭ই জানুয়ারি ২০২৪ এর নির্বাচন একটি মডেল হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে এ নির্বাচন পঁচাত্তর-পরবর্তী সর্বাধিক অবাধ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন। আসলেই বাংলাদেশে এযাবৎ এমন ধাঁচের নির্বাচন আর হয়নি। সর্বশেষ ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যেটিতে প্রায় সকল রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে এবং দেশ-বিদেশে উক্ত নির্বাচন ব্যাপক প্রশংসিত হয়। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শতকরা ৮৭ ভাগের অধিক ভোটার ভোট প্রদান করে। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে ভোটারদের তেমন আগ্রহ ছিল না। প্রথমটিতে বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি, দ্বিতীয়টিতে অংশগ্রহণ করলেও কারচুপির কারণে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। উক্ত নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার তাগিদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই ভূমিকা রাখে।
যারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে তাদের ভিসা নীতির আওতায় আনার ঘোষণা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার বিষয়ে উদ্বেগ জানায়।
দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব এমন যুক্তি দেখিয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য সমমনা দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে। আগের দু’টি নির্বাচনে সাধারণ জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়ায় বিএনপি’র দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে এবং আন্দোলনে সক্রিয় হয়। দেশি-বিদেশি চাপে সরকারও বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করার সুযোগ দিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু গত বছরের ২৮শে অক্টোবর বিএনপি’র ডাকা স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সমাবেশটি পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে গেলে সেই থেকে শুরু বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং দমন-পীড়ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি’র ক্রমবর্ধমান জনসম্পৃক্ততায় সরকার বিচলিত হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োগ দ্বারা বিএনপিকে মাঠছাড়া করে। এমন অভিমতের অনুকূলে কিছু যুক্তিও আছে। যেমন- ২৮শে অক্টোবর জনসমাবেশ পণ্ড করে সরকার গণহারে বিরোধী নেতাকর্মী গ্রেপ্তার শুরু করে, যাদের কেউ কেউ রয়েছেন পরিচ্ছন্ন ইমেজের। বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন একজন যিনি বরাবরই অহিংস আন্দোলনের পক্ষে কথা বলতেন কিন্তু তাকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজ বাসভবন থেকে আটক করে। বিরোধীদের জন্য রাজনীতির ময়দান ক্রমে সংকুচিত হতে থাকে। বিএনপি’র দাবি- এযাবৎ তাদের প্রায় ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অস্বাভাবিক দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অনেককে শাস্তি দেয়া হয়েছে। যারা গ্রেপ্তার হয়নি তারাও আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সরকারের এমন আচরণে দেশ-বিদেশে মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি ও সংস্থা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ্ (এইচআরডব্লিউ) গত ২৬শে নভেম্বর ২০২৩ তারিখ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক অংশীদারদের কাছে দাবি করছে, তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু একইসঙ্গে দেশটির রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিরোধীদের দিয়ে কারাগার ভরছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সাধারণ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ দেশটির বিরোধী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের লক্ষ্যবস্তু করছে, যেটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিরোধী দলবিহীন একটি প্রতিযোগিতা শূন্য নির্বাচন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী ২৮শে অক্টোবর প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র একটি পূর্বপরিকল্পিত সমাবেশের পর এক মাসের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নির্বাচনের প্রায় দু’মাস আগেই বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের অধিক মানুষ আটক ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার ও ভিডিও বিশ্লেষণ দ্বারা এইচআরডব্লিউ প্রমাণ পেয়েছে, নির্বাচনসংক্রান্ত সহিংসতার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়ী (দ্য ডেইলি স্টার, ২৭শে নভেম্বর ২০২৩ থেকে অনূদিত)। জোহানেসবার্গ ভিত্তিক নাগরিক পরিসর পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সিভিকাস’ (ঈওঠওঈটঝ) গত ৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের নাগরিক পরিসর ‘ক্লোজড’ শ্রেণিভুক্ত করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। মূলত বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত উপাত্ত সমন্বয় করে সিভিকাস একটি দেশের নাগরিক স্বাধীনতার শ্রেণিবিভাজন করে থাকে। পাঁচটি শ্রেণির মধ্যে প্রথমটি হলো ‘ওপেন’ বা উন্মুক্ত, ২য়, ৩য় এবং ৪র্থ অবস্থানে যথাক্রমে ‘ন্যারোড’ বা সংকুচিত, ‘অবস্ট্রাকটেড’ বা বিঘ্নিত এবং ‘রিপ্রেসড’ বা নিপীড়িত। বাংলাদেশ রয়েছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থানে, যেটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ক্লোজড’ বা রুদ্ধ (দ্য ডেইলি স্টার, ৬ই ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে অনূদিত)। এর বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় ছয়টি মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশে নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব সংগঠন ১২ই ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, গত অক্টোবরের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশ সরকার বানোয়াট মামলার ভিত্তিতে ২০ হাজারের বেশি বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে এবং গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে (দৈনিক প্রথম আলো, ১২ই ডিসেম্বর ২০২৩)।
জনতার আওয়াজ/আ আ