কুষ্টিয়া-২: বিএনপিতে বিভক্তি, আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া জামায়াত
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫ ৬:০১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫ ৬:০১ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রউফ চৌধুরীর ছেলে। ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবে এলাকায় তার সুনাম রয়েছে। তবে তাকে মেনে নিতে রাজি নন দলের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক তিন বারের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক শহীদুল ইসলামের অনুসারীরা। তারা রাগীব রউফের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
তাদের অভিযোগ, দল শহীদুলের দীর্ঘদিনের কাজের মূল্যায়ন করেনি। এতে স্থানীয় বিএনপিতে বিভাজন তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির মিত্র হিসেবে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মহাসচিব ও সাবেক এমপি আহসান হাবীব লিংকনও এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। জানা গেছে, এই আসনে বিএনপির ঘোষিত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে শহীদুল ইসলাম ও আহসান হাবিব কেন্দ্রে লবিং করে যাচ্ছেন।
এই আসনে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল গফুর। বিএনপি ও তার মিত্রদের দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে তিনি সুবিধা নিতে পারেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন থেকে মোহাম্মদ আলী, খেলাফত মজলিস থেকে আবদুল হামিদ ও এনসিপি থেকে ইয়াসির আরাফাত নয়নের নামও শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এনসিপি নেতা নয়ন তার অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-২ আসন। ৩১৭.৩৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মিরপুর এবং ১৫৩.৭১ বর্গকিলোমিটারের ভেড়ামারা উপজেলায় মোট ১৯টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভা রয়েছে। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৯৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭২ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ১২০ জন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ, জাসদ সভাপতি হাসানুল ইনু, জাপা (জাফর) মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকন এবং বিএনপির তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক শহীদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় এবং হেভিওয়েট নেতার বাড়ি এই নির্বাচনি এলাকায়। এ কারণে আসনটি রাজনীতির মাঠে বেশ আলোচিত।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর মাহাবুব উল আলম হানিফ পালিয়ে যান। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু রয়েছেন কারাগারে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
শুরু থেকেই আসনটি ছিল বিএনপির ঘাঁটি। বিশেষ করে মিরপুর উপজেলায় দলটির বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। কিন্তু এবার ছাড় দিতে রাজি নয় জামায়াতে ইসলামী। মিরপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এবং ক্লিন ইমেজের জামায়াতের প্রার্থী আবদুল গফুরের জনপ্রিয়তাও রয়েছে চোখে পড়ার মতো।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ আসনটি ছিল বিএনপির দখলে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের পক্ষে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এই আসনে মনোনয়ন পান। নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য অধ্যাপক মহিদুল ইসলামকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন ইনু। ইনু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বদলে যায় এই আসনের প্রেক্ষাপট। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও জাসদ নেতা-কর্মীরা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। সেই দ্বন্দ্ব জ্বালাও পোড়াও থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়ায়। ফলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার পরও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুল আরেফীনের কাছে পরাজিত হন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হিসাব ভিন্ন। নেতা-কর্মীরা পালিয়ে গেলেও এই আসনে আওয়ামী লীগ এবং জাসদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট রয়েছে। তাই প্রধান দুই দলের প্রার্থী বিভিন্ন কৌশলে সেসব ভোটের হিসাব রাখছেন। সেই সঙ্গে ভোটারদের মন জয় করতে তারা দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি।
নিজ দলের মধ্যে বিভক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ঘোষিত প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি একটি বিশাল দল। এই দলে প্রতিযোগিতা আছে, এবং থাকবে। কিন্তু কোনো বিরোধ বা বিভক্তি নেই। সময় এলে মান-অভিমান ভুলে সবাই মিলে ধানের শীষকে বিজয়ী করার জন্য একসঙ্গে কাজ করবেন।’
জামায়াতের প্রার্থী আবদুর গফুর মিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে এলাকায় তার সুনাম রয়েছে। এ ছাড়া মিরপুর উপজেলায় জামায়াতের নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে বিপুল ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছিলেন জামায়াতের প্রার্থী আবদুল ওয়াহেদ। তাই আসনটিকে পুনরায় জামায়াতকে উপহার দিতে দলটির প্রার্থী দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
জামায়াতের প্রার্থী আবদুল গফুর বলেন, ‘মানুষ দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারেনি। এবার তারা ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এই আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হব।’
এদিকে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ইয়াসির আরাফাত নয়ন বলেন, ‘দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ নির্মূল করতে আমরা গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিলাম। তাই দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। আশা করছি মানুষ আমাদের আপন করে নেবেন। এ ছাড়া ভোট দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের একটি নতুন এবং বৈষম্যমুক্ত সুন্দর দেশ গঠনের সুযোগ করে দেবেন।’
জনতার আওয়াজ/আ আ