কেবল একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে লঙ্কায় বসালে চলবে না : রিজওয়ানা হাসান - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ১০:৫৩, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

কেবল একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে লঙ্কায় বসালে চলবে না : রিজওয়ানা হাসান

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, আগস্ট ৭, ২০২৪ ১:৫৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, আগস্ট ৭, ২০২৪ ১:৫৮ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ফ্রেন্ডস অব আর্থ ইন্টারন্যাশনাল এবং আইইউসিএনের নির্বাহী সদস্য। ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক, পরের বছর স্নাতকোত্তর এবং ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আইজেনহাওয়ার ফেলোশিপ সম্পন্ন করেন। পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৭ সালে জাতীয় পরিবেশ পদক, ২০১২ সালে র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০০৯ সালে ‘পরিবেশের নোবেল’খ্যাত গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজে ভূষিত হন তিনি। ২০০৯ সালে টাইম সাময়িকী তাঁকে হিরোজ অব এনভায়রনমেন্ট খেতাবে ভূষিত করে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগের জন্য তাঁর নেতৃত্বাধীন বেলা সম্মানজনক ট্যাঙ্গ পুরস্কার লাভ করে। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের জন্ম ১৯৬৮ সালে, ঢাকায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের সহযোগী সম্পাদক শেখ রোকন।

সোমবার রাতে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় আপনি বলেছিলেন, দম বন্ধ করা পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। কেন দম বন্ধ পরিস্থিতি ছিল?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: দম বন্ধ করা ছিল; কারণ ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শাসনামলে ভিন্নমতের প্রতি কোনো সম্মান ছিল না। আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে আনসার পর্যন্ত সব বাহিনীকে সরকার তার দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণকে নিরাপত্তা দেবে; অবৈধ বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে; সেখানে তারাই অবৈধ আটক তো হরদম করে গেছে। তারা অপহরণ, গুম, খুনের মতো অপরাধও নির্বিচারে করে গেছে শুধু একটি নির্দিষ্ট সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে। তা ছাড়া অন্য যেসব জায়গায় মানুষ যাবে সরকারের অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে, যেমন বিচার বিভাগ, সংবাদমাধ্যম, সেসব জায়গায়ও সরকার আধিপত্য বিস্তার করেছিল।

বিচার বিভাগেও যাওয়া যেত না? আপনি নিজেও অনেকবার প্রতিকার চাইতে বিচার বিভাগে গিয়েছেন।

রিজওয়ানা হাসান: আমি চাইলেও রামপাল তাপভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারে হাইকোর্টে গিয়ে কোনো আদেশ পেতাম না, যদিও সব কাগজপত্রই আমার পক্ষে থাকত। আর কতকগুলো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সব দুর্নীতির ব্যাপারে বিভিন্ন গ্রহণযোগ্য সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার জন্য যেত না। শুধু বিচার বিভাগ নয়; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও প্রতিকার চাইতে যাওয়া যেত না। কারণ ওদের পক্ষেই সিস্টেমটা ডেভেলপ করা হয়েছিল, বাকি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। বাকি জনগোষ্ঠীর কেউ কথা বললেই দমন-পীড়ন বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। জনস্বার্থের কোনো বার্তা সরকারের কাছে পৌঁছাবার কোনো উপায়ই ছিল না। সরকার যেভাবে প্রতিটি বিষয় দেখতে চাইত, তার বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সংবাদমাধ্যমের সামনে ছিল না। সাধারণ নাগরিকের তো প্রশ্নই আসে না।

আপনি ব্যক্তিগতভাবে দম বন্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন কীভাবে?

রিজওয়ানা হাসান: আইনজীবী হিসেবেই আমি যখন প্রতিকার পেতাম না; সাধারণ মানুষের পরিস্থিতি চিন্তা করে আমার দম বন্ধ লাগত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ হয়ে যেভাবে দমন-পীড়ন করত, সেটা বিশেষভাবে দম বন্ধ লাগত। বিচার বিভাগের অসহায়ত্ব দেখে আইনজীবী হিসেবে আমার বিশেষভাবে অসহায়ত্ব লাগত। প্রতিকারহীনতায় দম বন্ধ লাগত।

আপনি সিস্টেমের কথা বলছিলেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তির বদলের মধ্য দিয়ে কি সিস্টেমেও পরিবর্তন আসবে?

রিজওয়ানা হাসান: যে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে বা যে দল ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছে, তারা সিস্টেমটা এমনভাবে সাজিয়েছিল, প্রথম ব্যক্তি থেকে শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত চরম অনুগত। তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী না হয়ে দলীয় কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছে। এখন যে সরকার ব্যবস্থার কথাই বলুন না কেন, মেনে নিতে হবে যে এই সিস্টেম পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কেবল নির্বাচন উপহার দেওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হলেই তো হবে না; সিস্টেমের সংস্কার করে যেতে হবে। কারণ আজকে আওয়ামী লীগ সরকার গণরোষে চলে গেছে। ২০০৮ সালেও কিন্তু আরেক সরকারের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে রাস্তায় নামতে হয়েছিল। সেই সরকারও কিন্তু জনসমাদৃত হয়ে বিদায় নেয়নি। তার মানে, সিস্টেম এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে সরকারের গোষ্ঠীস্বার্থ, ওদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, ওদের ন্যস্ত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়; জনগণের স্বার্থে ব্যবহৃত হয় না। নতুন যে সরকার আসবে, তার দায়িত্ব কেবল একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে লঙ্কায় বসিয়ে দেওয়া নয়। সিস্টেমকে সেট করে দিতে হবে।

সেটা কোন প্রক্রিয়ায়?

রিজওয়ানা হাসান: সিস্টেমটা আবার যেহেতু রাজনীতিকদের হাতেই যাবে; চেক অ্যান্ড ব্যালান্সটা তৈরি করে দিতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব রাজনৈতিক দলের সমঝোতার ভিত্তিতে আইন ও সংবিধান সংশোধন করার লিখিত চুক্তির মাধ্যমে করে যেতে হবে। কারণ সংসদ ছাড়া তো সংবিধান ও আইন পরিবর্তন করা যাবে না। এই সময়টুকু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে জনমত ভালোভাবে যাচাই করার জন্য আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, সংবাদমাধ্যম– সবার মতামত নিয়ে পরিবর্তনের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে হবে। তার পর সেটার ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি আনতে হবে।

ঠগ বাছতে গিয়ে গাঁ উজাড় হবে না তো?

রিজওয়ানা হাসান: কোনো কোনো জায়গায় ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতে পারে। সেখানে ওপরের পর্যায়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব। যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যম পর্যায়ে বা নিম্ন পর্যায়ে নতুন মোটিভেশন দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে– যে পদ্ধতিতে সরকার চলছিল, সেই পদ্ধতিতে সরকার চলার পরিণাম শেখ হাসিনার বিদায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে। এই পরিণাম আমরা আর কেউ চাই না। বলতে হবে, আগে তুমি ছিলে আওয়ামী লীগ পুলিশ অথবা বিএনপি পুলিশ। এখন হবে বাংলাদেশ পুলিশ। ১৮৭২ সালের পুলিশ আইন ছিঁড়ে-কেটে গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী পুলিশ আইন করতে হবে। ওপরের পর্যায়ের ব্যক্তিদের সরানোর পাশাপাশি জরুরি কাজ হচ্ছে এমন একটি আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে দিয়ে যাওয়া এবং সেটাতে রাজনীতিকদের সম্মতি নেওয়া, যাতে আমাদের আর আগের অবস্থায় ফেরত যেতে না হয়। চার শতাধিক লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা প্রহসন করতে পারি না।

সরকার গঠন প্রক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত?

রিজওয়ানা হাসান: আমি যেটা বলব, সেটাই একমাত্র পথ বা সঠিক হবে, এমন কোনো কথা নেই। প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য ছিল। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত সরকার বিচার বিভাগের মাধ্যমে সেই বিধান বাতিল করেছে, যাতে নির্বাচন সবসময় তার অধীনেই হয় এবং কারচুপি করে সবসময়ই ক্ষমতায় থাকতে পারে। কিন্তু এটাও সত্য কথা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা করার জন্য পাঁচ বছর পরপর এতগুলো উপযুক্ত লোক কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে? তার পর দেখা যাবে, ভালোমানুষদের যে অবদান রাখার কথা, সেটা রাখছেন না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার জন্য। এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতিতে এবারের মতো সরকার গঠন করে একটা সংস্কার সূচি দেওয়া যেতে পারে। সংস্কারগুলো করার জন্য সেই সরকারকে সময়ও দিতে হবে। তবে সেই সরকারে কেবল নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবীরা থাকবেন; না রাজনীতিকরাও থাকবেন; নাকি সেনাবাহিনী থাকবে– সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। আপাতত ১০-১২ সদস্য নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে পারে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় প্রথম থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি থাকতে হবে। বার্তাটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে রাজনীতিকদের কাছে যেতে পারে– পরিবর্তনের রূপরেখা মানতে হবে।

নতুন সরকারের সম্ভাব্য ব্যক্তিদের বাছাইয়ের মাপকাঠি কী হবে?

রিজওয়ানা হাসান: মাপকাঠি ঠিক করা কঠিন নয়। যেসব তালিকা দেখা যাচ্ছে, সেখান থেকেই হতে পারে। শুধু দেখতে হবে, সেখানে যেন অসৎ মানুষ না থাকে; দুরভিসন্ধিমূলক মানুষ না থাকে। জাতীয়ভাবে, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষ যেন অন্তর্ভুক্ত থাকুন। নতুন সরকার গঠিত হতে হবে তারুণ্য, দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে। এমন একটি সরকার আপাতত দৈনন্দিন কাজ শুরু করুক। আমি মনে করি, যে নামে বা প্রক্রিয়াতেই হোক, এই মুহূর্তে একটা সরকার লাগবে। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কমান্ড দিতে হবে।

সেই সরকারে কি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিও থাকবে?

রিজওয়ানা হাসান: আমি বলব, এখনই তাদের মন্ত্রী বা এমপি হয়ে যাওয়ার দরকার নেই। তারা বরং সংস্কার এজেন্ডা প্রস্তুত করুক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করে দিতে পারে। সেই কমিটিতে তাদের প্রতিনিধি থাকুক। সেই কমিটিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব বেশি হোক। কারণ আমাদের দেশের ৫০ ভাগের বেশি জনসংখ্যা তরুণ। তাদের প্রতিনিধিত্বও বেশি থাকতে হবে। তরুণদের প্রতিনিধিত্ব বাদ দিয়ে শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে না। আমরা যেভাবে দেশকে দেখি, তরুণরা সেভাবে দেখে না। তারা অনেকে বেশি সম্পৃক্ত ও সাহসী। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমে তাদের মতামত প্রতিফলিত হবে এবং সংস্কারের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে। আমরা তো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাই চাই; তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তো সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রশাসক গোষ্ঠীর মাধ্যমে একটি সরকার হবে; আরেকটি সংস্কার এজেন্ডা অনুমোদন করার জন্য থাকবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি।

উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটিতে তরুণদের বাইরে আর কারা থাকবেন?

রিজওয়ানা হাসান: নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সমাজ, রাজনীতিক, সাংবাদিক– সবাই থাকবেন। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব আসতে হবে। লিখিত সম্মতি দিতে হবে রাজনীতিকদের। এর আগেও তিন জোটের রূপরেখা ছিল; সেটা পরে কেউ মানেনি– মনে রাখতে হবে। তবে সবকিছুর আগে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হতে হবে। অবিলম্বে হতে হবে।

অবিলম্বে কেন?

রিজওয়ানা হাসান: দেখুন, দেশে এখন সাংবিধানিক শূন্যতা চলছে। কোনো সরকারপ্রধান নেই। সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতি আছেন; কিন্তু তিনি তো পুতুলের মতো, ক্ষমতা নেই। এক্সট্রা অর্ডিনারি পরিস্থিতিতে এক্সট্রা অর্ডিনারি ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই এক্সট্রা অর্ডিনারি সমাধান দেওয়ার মতো প্রুডেন্স বা প্রজ্ঞা জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকতে হতো। কিন্তু অতি রাজনীতিকীকরণের কারণে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। কারণ জানা ছিল না যে, গণভবনে হামলা হতে পারে। সংসদ ভবনে হামলা হতে পারে। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অতি রাজনীতিকীকরণ না হলে এসব স্থাপনায় সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকত। সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক নিয়ে থাকতে পারত; আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান নিয়ে উত্তেজিত জনতাকে ফিরিয়ে দিতে পারত। তাহলেই শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি এড়ানো যেত। বাংলাদেশে এর আগেও তো গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। তখন তো এমন পরিস্থিতি হয়নি। কারণ তখনও আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এতটা রাজনীতিকীকরণ হয়নি। এখন (মঙ্গলবার দুপুর) পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনিশ্চিত। কারণ দেশে কোনো সরকার নেই। সোমবার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পোড়ানো হয়েছে; ব্যক্তিগত অনেক বাসা লুটপাট, ভাঙচুর হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি কারও পছন্দ নাও হতে পারে; কিন্তু বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের কী দোষ?

নাগরিক সমাজ এই কথাগুলো সেনাবাহিনীকে বা রাষ্ট্রপতিকে গিয়ে বলতে পারে না?

রিজওয়ানা হাসান: দেখুন, সোমবারই সেনাবাহিনী বা বঙ্গভবনের উচিত ছিল সমাজের সব পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে মতামত নেওয়া। সেখানে নাগরিক সমাজের সঙ্গে একটি মিটিং হতে পারত; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে একটি বৈঠক হতে পারত; সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে একটি বৈঠক হতে পারত।

আপনার এই সাক্ষাৎকার বুধবার প্রত্যুষে পাঠকের কাছে যাবে। এর মধ্যে কী কী করা দরকার?

রিজওয়ানা হাসান: আমি তো মঙ্গলবারের মধ্যেই সরকারের শপথ অনুষ্ঠান চাই। মঙ্গলবারের মধ্যেই সরকারের কমান্ড প্রতিষ্ঠা চাই। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সরকার আদেশ দেবে– কোনো থানায় বা অন্য কোথাও কোনো হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ হবে না। দোষীদের তালিকা সরকারকে দাও, সরকার ব্যবস্থা নেবে। সেই ব্যবস্থা দৃশ্যমানও হবে। বিশেষভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সুরক্ষা দেওয়া। এখন আমি দেখতে চাইব, নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনায় বসে যাবে। তারা দেশের ক্ষমতা না নিয়ে দায়িত্ব নিক। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসুক; নাগরিক সমাজের সঙ্গে বসুক; রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসুক; নারী সমাজের সঙ্গে বসুক; আদিবাসীদের সঙ্গে বসুক। তাদের মতামত নিয়ে আগামী ছয় মাস বা এক বছরের পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরুক।

শেষ করি। নতুন সরকারের সম্ভাব্য সদস্যদের যেসব নাম সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, সেখানে আপনার নামও রয়েছে। কোনো মন্তব্য?
রিজওয়ানা হাসান: বিষয়টা আমার জন্য অনেক আনন্দের ও সম্মানের এ জন্য যে, মানুষ আমাকে বিশ্বাস করে; ভরসার জায়গা হিসেবে দেখে। এই বিশ্বাস আর ভরসা আমার চালিকা শক্তি। যে কোনো অবস্থান থেকে আমি দায়িত্ব পালন করে যাব; পদ- পদবি কোনো বাধা না। একটি নিরপেক্ষ সরকার এলে আইনি কাজ রাজনৈতিক বাধা ছাড়া করতে পারব– আমি সেই প্রত্যাশাতে আছি।

ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রিজওয়ানা হাসান: ধন্যবাদ।

সূত্রঃ সমকাল

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ