খুলনা বিভাগে ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছেন উত্তরসূরি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৫ ৪:৪৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৫ ৪:৪৮ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
খুলনা বিভাগে ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছেন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও প্রভাবশালী নেতার উত্তরসূরিরা। এরই মধ্যে তাদের অনেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। দলের সিনিয়র নেতার ছেলে-মেয়ে বা সহধর্মিণী হওয়ায় উত্তরসূরিদের প্রতি আলাদা আবেগ রয়েছে তৃণমূলে। ফলে মনোনয়ন দৌড়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করছেন দলের কর্মীরা।
এদিকে পূর্বসূরিদের দেখানো পথে হেঁটে অনেকে আবার দলের মধ্যে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন। উত্তরসূরি পরিচয়ে তারা ভোটের মাঠে নামছেন আটঘাট বেঁধে।
জানা যায়, খুলনা বিভাগের ৫টি জেলার ৭টি আসনে উত্তরসূরিদের দাপট রয়েছে। এর মধ্যে ঝিনাইদহ জেলায় সর্বোচ্চ তিনজন ও খুলনা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরায় একজন করে সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।
অতীতে বিএনপির রাজনীতির মাঠ-কাঁপানো নেতাদের উত্তরসূরিদের কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হচ্ছেন অনেকে। বিগত দিনের স্মৃতি রোমন্থন করছেন। প্রচারে নেমে শুরুতেই ভালো সাড়া পাচ্ছেন তারা।
উত্তরসূরিদের দাপট
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও যশোরের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তরিকুল ইসলাম। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে বিলুপ্ত যশোর-৯ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের সমাজকল্যাণ এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন। অষ্টম সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোট সরকারের সময় তিনি প্রথমে তথ্য ও পরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
এবার যশোর-৩ আসনে প্রার্থী হচ্ছেন তার ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। বিএনপির রাজনীতিতে এরই মধ্যে গ্রহণযোগ্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন।
স্বামীর আসনে সহধর্মিণী
ঝিনাইদহ-৪ আসনে চারবারের সংসদ সদস্য ছিলেন এম শহীদুজ্জামান বেল্টু। তিনি ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ, জুন ১৯৯৬ সালের সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৫ সালে তিনি এলজিআরডি মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী উপকমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন। স্বামীর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে এই আসনে এবার বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন তার সহধর্মিণী মুর্শিদা জামান বেল্টু। এরই মধ্যে তিনি কর্মী-সমর্কদের নিয়ে দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান করেছেন। সেই অনুষ্ঠানে এম শহীদুজ্জামান বেল্টুর অনুসারীরা উপস্থিত ছিলেন।
বাবার আসনে ছেলে
ঝিনাইদহ-২ আসনে চারবারের সংসদ সদস্য ছিলেন মসিউর রহমান। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় তিনি বিরোধীদলীয় হুইপসহ সংসদীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কমিটি, কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাবার আসনে এবার প্রার্থী হতে চান তার ছেলে ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং জেলা বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. ইব্রাহিম রহমান বাবু। একইভাবে ঝিনাইদহ-৩ আসনে চারবারের সংসদ সদস্য ছিলেন শহিদুল ইসলাম মাস্টার। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হতে চান তার ছেলে মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মেহেদী হাসান রনি।
কুষ্টিয়া-১ আসনে আহসানুল হক মোল্লা জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৯১, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, জুন ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসন থেকে পরপর চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার ছেলে দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজা আহাম্মদ বাচ্চু মোল্লা এবার কুষ্টিয়া-১ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী।
বাবার পরিচয়ে নতুন বলয়
খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ আরিফুর রহমান মিঠু বর্তমানে এনসিপির নেতা। তিনি এনসিপির হয়ে খুলনা-৩ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মিঠুর পরিচিতি রাজনীতিবিদ এস এম এ রবের বড় ছেলে তিনি। ২০০০ সালের ১১ আগস্ট এস এম এ রব নগরীর সোনাডাঙ্গা সংলগ্ন নিজের বাড়ির সামনে জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন।
পিছিয়ে নেই মেয়েরাও
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদে সহিদুল ইসলাম বিশ্বাস চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালের ১১ নভেম্বরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। এবার সহিদুল ইসলাম বিশ্বাসের মেয়ে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সদস্য মিলিমা বিশ্বাস মিলি চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী।
মাগুরা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মজিদ উল হক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। জিয়াউর রহমান তাকে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। ১৯৭৯ সালে মাগুরা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে শিল্প, রেল ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি একাধারে কৃষি, সেচ, পানিসম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি নেতা মেজর জেনারেল মজিদ উল হকের কন্যা ও চিকিৎসক ডা. সিমিন আকতার অনজু বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে একই আসনে মনোনয়ন চাইবেন। শহরের বিভিন্ন স্থানে তার ব্যানার ফেস্টুন দেখা যাচ্ছে। তিনি বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। চব্বিশের গণ-আন্দোলনে আহত ও নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছেন।
নতুন সমীকরণ নতুন মেরূকরণ
দলের একসময়ের পোড়-খাওয়া নেতাদের উত্তরসূরিরা ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী মুর্শিদা জামান বেল্টু স্বামীর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে চান। তিনি বলেন, ‘ভোটের মাঠে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। পাশে থেকে সবাই সহায়তা করছেন। নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি এলাকার উন্নয়নে তার স্বামীর অসমাপ্ত কাজ শেষ করবেন।’
দলের সিনিয়র নেতারা বলছেন, বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ তরুণদের অনেকেই যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তাদের অবস্থান মজবুত করেছেন। দলের জন্য অবদান রাখায় তাদের মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত। আর উত্তরসূরি হিসেবে মনোনয়নযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন ঝিনাইদহ প্রতিনিধি এম মাহফুজুর রহমান, মাগুরা প্রতিনিধি কাশেমুর রহমান শ্রাবণ, নড়াইল প্রতিনিধি শরিফুল ইসলাম এবং চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি মিজানুর রহমান)
জনতার আওয়াজ/আ আ