গুমের দেশে ভাঙল ঘুম
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, নভেম্বর ২৮, ২০২২ ৬:৫৭ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, নভেম্বর ২৮, ২০২২ ৬:৫৭ অপরাহ্ণ

অধ্যাপক ড. মোঃ মোর্শেদ হাসান খান
অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাঃ শামীম
চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, সিলেট আর কুমিল্লা জয় করে এবার রাজশাহী মহাসমাবেশ। আন্দোলন, সংগ্রাম আর মুক্তির আহ্বানে গণমানুষকে কখনও বিমুখ করেনি উত্তরবঙ্গের মানুষ। আজকের রাজশাহী আরেকবার উত্তাল হয়েছে গণতন্ত্রের মুক্তি প্রত্যাশায়। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’ শীর্ষক দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের ইতিহাসে গণমানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো।
গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই সেই ধারাবাহিক আন্দোলনেরই উত্তরাধিকার। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক মানুষ যেভাবে আজ আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে জেগে উঠেছে, তারা জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি জান ও জবানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ইনশাআল্লাহ। বিপ্লব-সংগ্রামের পথচলায় প্রতিটি পদক্ষেপে আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠা রাজশাহীর মানুষ বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে আরেকবার হয়ে উঠবেন গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার উদ্ধারে চলমান এ আন্দোনের অগ্রপথিক।
রামপুর বোয়ালিয়া থেকে বান্ধাইখাড়া, কাশিমপুর, তালন্দ, পুঠিয়া, চাঁপাই, সুলতানগঞ্জ, গোদাগাড়ি আর ইসলামগাতি আজ বাঁধভাঙ্গা স্রোতের টানে মিলেমিশে একাকার। স্বাধীন দেশে মুক্তভাবে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে তানোর, বলিহার, দুবলাহাটি, খাজুরা, কলম, কুসুম্বাসহ রাজশাহীর প্রতিটি জনপদের মানুষ আজ একাত্ম-একপ্রাণ, ভাঙ্গনের দিনে আজ সবার মুখে একই সুর।
ভাত ও ভোটের অধিকার আর জান ও জবানের নিরাপত্তার প্রশ্নে সত্যিই ঘুম ভেঙেছে গুমের দেশে। আর তাইতো বজ্রকণ্ঠের দীপ্ত শ্লোগানে, দীর্ঘ মিছিলে আর অভীষ্ট অর্জনের পদযাত্রায় হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। দিনের ভোট মধ্যরাতে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে আয়োজনের প্রশ্নে প্রিয় দেশটির আদিগন্ত ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ৪৬০ বর্গ কিলোমিটারের ভূখ-ে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব জনজোয়ার, বলা যায় এখানে ঘটেছে গণবিষ্ফোরণ।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আহ্বানে বিগত মহাসমাবেশগুলোতে যে জনস্রোত দেখা গিয়েছে তাকে প্রতিহত করতে চেষ্টা তদবির তো কম হয়নি। শাসকের পক্ষ নিয়ে নজিরবিহীন পরিবহন ধর্মঘট, হুমকি-ধামকি আর সন্ত্রাসীদের আক্রমণ কোনোকিছুতেই কাজ হচ্ছে না। কারণ, অধিকারবঞ্চিত বিপন্ন গণমানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ছায়াতলে।
শহিদ জিয়ার জনকল্যাণকামী আদর্শ, গণতন্ত্রের পথে আপোসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রাম আর আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের সময় উপযোগী সিদ্ধান্তের উপরেই এখন আস্থা রাখতে চাইছে বাংলাদেশ। আপামর জনতাও তাই বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছুটে এসেছিলেন খুলনা, সিলেট, রংপুর, কুমিল্লা আর ফরিদপুরের মহাসমাবেশে। ঠিক যেভাবে কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে চেপে বসেছিলেন উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বীর চট্টলার সমাবেশে যোগ দিতে। বিক্ষুব্ধ স্রোত উপেক্ষা করে অনেকে ধেয়ে গেছেন বেলস পার্ক বরিশাল কিংবা সিংহের সাহস নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন ময়মনসিংহ অভিমুখে।
বিএনপির চলমান মহাসমাবেশগুলোতে যোগ দেওয়া কারও গল্প পুরোপুরি অন্যরকম নয়। কেউ এসেছেন জীবন সংগ্রামের পরাজয় মেনে নিতে না পেরে। কেউ কেউ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই সংগ্রামের আস্থা রাখতে চাইছেন অন্যায়ের শিকার হয়ে কারারুদ্ধ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং নির্বাসিত রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের উপর।
বাংলাদেশের মানুষ এখন বিশ্বাস করে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কিভাবে বিপন্ন দেশকে মুক্তির দিশা এনে দিয়েছিলেন। কিভাবে তিনি সামরিক উর্দি পরে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়েও একান্ত আপন করে নিয়েছিলেন দেশের মাটি ও মানুষকে। বাংলাদেশের মানুষ হয়তো আজও ভোলেনি তিনিই কিভাবে মুক্তি দিয়েছিলেন বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রকে।
লেজেহুমু এরশাদের ঘৃন্য স্বৈরাচার যখন আবার বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার এবং গণতন্ত্রকে গ্রাস করেছিল দেশের মানুষ আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে মুক্তিমিছিলের নেতৃত্ব দিতে দেখেছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। রাজনীতি সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত কম ধারণা রাখা কিন্তু গণমানুষের ভালবাসায় উজ্জীবিত একজন গৃহবধু তখন নিজ সাহস, আর সহজাত নেতৃত্বের দক্ষতায় পরিণত হয়েছিলেন আপোসহীন দেশনেত্রীতে।
বাংলাদেশের মানুষ যেই আপোসহীন দেশনেত্রীর হাত ধরে লেজেহুমু এরশাদের স্বৈরতন্ত্রের হিংস্র ছোবল থেকে উদ্ধার করেছিল গণতন্ত্র আর ভোটাধিকার তিনি আজ মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ। এমনকি ভয়াবহ জিঘাংসার কবলে পড়ে তাঁকে তার মৌলিক অধিকার হিসেবে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না। আর এখানেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনৈতিক শক্তির নব উত্থান ঘটেছে।
একটা সময় যে আপোসহীন দেশনেত্রীকে স্বৈরতন্ত্র বিরোধী মঞ্চে দাঁড়িয়ে মিছিলে, শ্লোগানে, নির্দেশে নেতৃত্ব দিতে দেখেছে, আজ তাঁকে সবাই ধারণ করছে নিজ নিজ হৃদয়ে। তিনি আজ কারাগারে থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে স্থান করে নিয়েছেন সবার মাঝে।
গণতন্ত্র উদ্ধারের তেজদীপ্ত শ্লোগানে হুংকার দেওয়া বাংলাদেশের মুক্তিকামী প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই নিয়েছেন সবার প্রিয় আপোসহীন দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়া। লন্ডনে নির্বাসিত গণনায়ক জনাব তারেক রহমানের উপরও আস্থা রাখতে চাইছেন বাংলাদেশের জনগণ।
তারা বিশ্বাস করছেন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিগত বিপ্লবের পর তাদের যেহেতু নিরাশ করেননি, তাই বাংলাদেশের এই বিপন্ন সময় থেকে শাপমুক্তির জন্য একমাত্র তারেক রহমানের উপরেই আস্থা রাখা যায়।
বিএনপির সাম্প্রতিক মহাসমাবেশগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত করেছে অনেক বিপ্লবী ঘটনা। একটি জাতীয় দৈনিকে ছাপা হওয়া ছবিতে দেখা যায় জনৈক বৃদ্ধ ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে আছেন মাঠের মধ্যে। পরনে লুঙ্গি, গায়ে গরম কাপড়। যানবাহনের অভাবে ট্রলারে করে সমাবেশের আগের দিন শুক্রবার মধ্যরাতে বরিশালে পৌঁছেছেন। তারপর শীতের রাত অনেকের সঙ্গে পার করেছেন মাঠের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে। জীবনের ঘানি টেনে ক্লান্ত এই বয়োবৃদ্ধ মানুষটি মুক্তি চাইছেন স্বৈরতান্ত্রিকতা থেকে, তিনিও ফিরে পেতে চাইছেন ভোটাধিকার।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ জনগণ এখন বিশ্বাস করছেন বর্তমান দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া গেলে ডলারের দামও কমবে, বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সেই সঙ্গে তেল, লবণ, চিনি আর চালের দাম নিয়ে সৃষ্ট ভয়াবহ পরিস্থিতিও চলে আসবে নাগালের মধ্যে।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ পড়তে হবে না, কারণ আপনারা কমবেশি সবাই বাজারে যাচ্ছেন। আপনারা জানেন নতুন দর অনুযায়ী সয়াবিন তেলের এক লিটারের বোতল ১৭৮ টাকার বদলে এখন কিনতে হচ্ছে ১৯০ টাকায়, খোলা চিনি ১১০ টাকা, চালের কেজি ছাড়িয়ে গেছে ৭৫-৯০ টাকা।
হাজারের কোটা স্পর্শ করার অপেক্ষায় থাকা গরুর মাংস ক্রয়ের কথা হয়তো সবাই ভুলেই গেছেন। আটা, ময়দা, ছোলা, মুগ, মটর ও মসুর ডালের মধ্যে দাম বাড়েনি কোনটির? আপনার স্কুল-কলেজগামী সন্তানের বইপত্র, খাতা-পেন্সিল এমনকি ইরেজারের দামটাও এখন নাগালের বাইরে। ভেবে দেখুন আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম!!
আপসহীন দেশনেত্রী গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি থেকে শুরু করে আমার আপনার সবার ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার এ লড়াই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের একার নয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট দূরীকরণ, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সর্বসাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির এ সংগ্রামে যুক্ত হতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তের সব মানুষকে।
দেশ বাঁচানোর এ দীর্ঘ সংগ্রামে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, সিলেট ও কুমিল্লার বিপ্লবী মানুষ সব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে এগিয়ে এসেছেন। দেশ, মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ে এবার রাজপথে নামার সময় হয়েছে রাজশাহীর বিপ্লবী মানুষের।
মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে রাজশাহীর বিপ্লবী জনগণ এতোদিন যে দৃঢ় মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন ইনশাআল্লাহ তাড়াশ থেকে তানোরের প্রতিটি রাজপথ আর গলিপথ পেরিয়ে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠ এবার তার স্বাক্ষী হবে। ‘বাংলাদেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজপথে’।
লেখকদ্বয়: অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
জনতার আওয়াজ/আ আ