ঘোমটা পরে এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও বিএনপির কেউ সিটিতে যাবে না
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৩ ৩:২৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৩ ৩:২৯ অপরাহ্ণ

ডেস্ক নিউজ
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো ধরনের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। যে কারণে অনুষ্ঠেয় ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে না দলটি। এমনকি বিএনপি থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও কেউ যাবে না বলে এখন পর্যন্ত জানা গেছে। যদিও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির লোকজন ঘোমটা পরে সিটি নির্বাচনে অংশ নেবে। তার ধারণা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উকিল আবদুস সাত্তারের মতো বিএনপির অনেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিকে আওয়ামী লীগের এমন ভাবনাকে নাকচ করে দিয়ে বিএনপি নেতারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটার কোনো সুযোগই নেই। সিটি নির্বাচনে ‘উকিল মডেল’ নিয়ে সতর্ক তারা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, তাদের মূল ভাবনা হচ্ছে—আওয়ামী লীগ সরকারের দ্রুত পদত্যাগের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন। এই দাবিসহ ১০ দফার ভিত্তিতে বিএনপি এখন যুগপৎ আন্দোলনে রয়েছে। দাবি আদায়ে ঈদের পরে বড় আন্দোলনে নামার পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির। সেই লক্ষ্যে রমজানে ইফতার মাহফিলের মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে দলটি।
জানা গেছে, আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘উকিল সাত্তার মডেল’ নিয়ে সতর্ক বিএনপির হাইকমান্ড। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে উকিলের মতো কোনো নেতা যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বিএনপি। এক দফার আন্দোলন সামনে রেখে সংগঠনে শৃঙ্খলা রক্ষায় এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবে না হাইকমান্ড।
এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা ঘোমটা পরে অংশ নেবে।’ তার এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি বলছে, এগুলো তাদের মনগড়া কথা। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আমরা পরিষ্কার করে বলছি, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না। সুতরাং সিটি নির্বাচনে দলছুটের আশঙ্কা বিএনপিতে নেই। যারা অংশগ্রহণ করবেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত সিলেট সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী আবারও নির্বাচনে প্রার্থী হবেন কি না এ বিষয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা ছিল। কিন্তু তিনি গত মঙ্গলবার লন্ডনে যুক্তরাজ্য যুবদল আয়োজিত ইফতার মাহফিলে বক্তব্যকালে বলেন, এই সরকারের আমলে দুবার সিলেটের মেয়র নির্বাচিত হয়েছি। কিন্তু এবার যেহেতু আমার দল বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না, সেই সিদ্ধান্তে অটল থেকেই আমি এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব না। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সেখানে আরিফুল হক চৌধুরী আরও বলেন, সংবাদ মাধ্যমে নানারকম সংবাদ এসেছে। কোনো সংবাদপত্র লিখেছে, দুই সপ্তাহ ধরে আমি লন্ডনে আছি। কিন্তু আমি পাঁচ দিন হয়েছে লন্ডনে এসেছি এবং নেতার সঙ্গে মিটিংও করেছি। তিনি আমাকে সিগন্যালও দিয়েছেন; তবে সেটি গ্রিন সিগন্যাল, না রেড সিগন্যাল, তা সময়ই বলে দেবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ‘সরকারের ট্র্যাপ’। কিন্তু এবার জনগণ ও বিএনপি সরকারের কোনো ট্র্যাপে পা দেবে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের আন্দোলন একটাই, এই আন্দোলন হচ্ছে এই সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে না এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন তো অনেক আগেই বাদ দিয়েছি। কেউ যদি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে চায় সে ক্ষেত্রে দল তার সিদ্ধান্ত নেবে।
নির্বাচন কমিশনের সিডিউল অনুযায়ী, ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে, ১২ জুন খুলনা ও বরিশালে এবং ২১ জুন রাজশাহী ও সিলেট সিটির ভোট গ্রহণ হবে। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন হবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)। এর আগে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাঁচটির মধ্যে কেবল সিলেট সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন। তখন গাজীপুরে হাসান উদ্দিন সরকার, খুলনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সিলেটে আরিফুল হক চৌধুরী, রাজশাহীতে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং বরিশালে মজিবর রহমান সরোয়ার বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। তা ছাড়া দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটির ভোটের সবকটিতেই মেয়র পদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন।
জানা গেছে, সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিএনপির মেয়র প্রার্থীদের কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। তবে নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটিতে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন দুই প্রভাবশালী নেতা তৈমূর আলম খন্দকার ও মনিরুল হক সাক্কু। অতীতে সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দলের মেয়র প্রার্থীরা ছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেক জনপ্রিয় নেতা রয়েছেন যারাও সিটি করপোরেশনগুলোতে মেয়র পদে যোগ্য প্রার্থী। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দলে কোণঠাসা হয়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ নেতাদের অনেকেও নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। এর বাইরে অনেকের শঙ্কা, সিটি নির্বাচনকে ঘিরে কেউ কেউ নতুন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘উকিল সাত্তার’ হতে পারেন।
তবে সরকারি নানা প্রলোভনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এদের কেউ যাতে মেয়র পদে প্রার্থী হতে না পারেন, তা নিয়ে সতর্ক বিএনপির হাইকমান্ড। সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। হতাশ ও ক্ষুব্ধদের দলে সক্রিয় করার উদ্যোগ যেমন নেওয়া হয়েছে তেমনই দলবিরোধী চক্রান্তে জড়িতদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সন্দেহভাজন অন্যদের কঠোর বার্তা দিয়েছে দল। তবে বিএনপির প্রত্যাশা, সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলন শুরুর মুহূর্তে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ নির্বাচনে যাবে না। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলে দল তার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয়সহ স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ব্যাপারে দলের সিদ্ধান্ত রয়েছে। এখনো সেই সিদ্ধান্তই বহাল রয়েছে। এর পরও দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে তার বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে যেমনটা নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের সময় নেওয়া হয়েছিল। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপি এখন সরকারের পতন এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে রয়েছে। অন্য কিছু ভাবার সময় নেই।
জনতার আওয়াজ/আ আ