জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে আওয়ামী লীগই চ্যাম্পিয়ন - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১২:৩৪, শনিবার, ১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৯শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে আওয়ামী লীগই চ্যাম্পিয়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৮, ২০২২ ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৮, ২০২২ ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

 

অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী

১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ ঘিরে ইতোমধ্যে দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠে থাকা বিএনপি নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সংঘাত ও সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন অনেকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি, আন্দোলনের অতীত-ভবিষ্যৎ, জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীর সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহ্‌সান মাহমুদ

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

দিলারা চৌধুরী: আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সবসময়ই দুই মেরুতে ছিল। রাজনৈতিক দলের কাজ হচ্ছে- সমাজ ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যে বিভেদ থাকে, তা দূর করা। সেটি হতে পারে গোষ্ঠীগত, শ্রেণিগত বিভেদ। রাজনৈতিক দলের কাজ এসব বিভেদ দূর করে সমাজ ও রাষ্ট্রে সমতা নিশ্চিত করা। আমাদের স্বাধীনতার যে অঙ্গীকার ছিল- সবার জন্য সমান অধিকার; এ দুটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আমাদের বিভেদ কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে। আমাদের দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য- ক্ষমতায় যাওয়া এবং একবার ক্ষমতায় যাওয়ার পরে তা ধরে রাখা। জনসাধারণের কাছে যাওয়ার চেয়ে তারা বিদেশিদের কাছে ধরনা দিতে পছন্দ করে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে আমাকে যদি নির্মোহভাবে মন্তব্য করতে বলা হয়, তাহলে বলতে পারি- রাজনৈতিক দল হিসেবে যেসব কাজ করার কথা ছিল, তারা কেউই তা করেনি।

বিএনপি টানা দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে। বিএনপি নেতারা বলছেন, আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁরা খালেদা জিয়াকে মুক্ত এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করতে পারবেন। আপনি কীভাবে দেখছেন?

দিলারা চৌধুরী:এখন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগও একসময় টানা ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। তাই বিএনপি এখন যে টানা ক্ষমতার বাইরে আছে- এটিই প্রথম ঘটনা নয়। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিষয় লক্ষণীয়- ক্ষমতার পালাবদল ঘিরে এখানে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শান্তিপূর্ণভাবে পালাবদলের উদাহরণ কম। রাজপথ কে দখল করতে পারবে- এটিই বিবেচনা করা হয়। এটি কোনো সাংবিধানিক পদ্ধতি হতে পারে না। খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে আওয়ামী লীগ হরতাল, অবরোধ করেছিল রাজপথ দখল করতে। তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীও একত্র হয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় আমলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিরোধী দলে ছিলেন, তিনিও তখন রাজপথ দখলের রাজনীতি করেছেন। তখন আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথ দখলে নেমেছিলেন। আওয়ামী লীগই জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে চ্যাম্পিয়ন। অথচ তখন জ্বালাও-পোড়াও না করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন হতে পারত।

শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হয় না কেন?

দিলারা চৌধুরী: এখানে যারা জয়ী হয়, তারা মনে করে- সবকিছুর সিদ্ধান্ত তারাই নেবে। আবার যারা পরাজিত হয়, তারাও পরাজয় মেনে নিতে পারে না। দেখা যাচ্ছে, রাস্তা দখল করে ক্ষমতার পালাবদল ঘটানোর একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এখানে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন রাস্তায় নেমেছেন। বিএনপির পক্ষে একটি জোয়ার দেখা যাচ্ছে। আবার আইসিটি আইন থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে জনসাধারণও এখন বিক্ষুব্ধ। মানুষ ভোট দিতে পারছে না। ভোট হচ্ছে মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার। ভোট দিতে না পেরে আমরা তো প্রজায় পরিণত হয়ে গেলাম! এমন বাস্তবতায় বিএনপি রাজপথে নেমেছে। রাজপথ যাদের দখলে থাকে, তারাই রাজনীতি ও ক্ষমতায় এগিয়ে থাকে- এমন একটি দুর্ভাগ্যজনক রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের এখানে তৈরি হয়েছে।

ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যে কোনো উপায়ে নির্বাচন করা যায়, বাংলাদেশে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে কীভাবে?

দিলারা চৌধুরী:ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হয়েছিল। সেই ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও এমন হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। এটি হয়তো এখন আওয়ামী লীগ পছন্দ করবে না। কিন্তু এটি তো সত্যি, ১৯৭৩-এর নির্বাচনে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট বাক্স নিয়ে আসা হয়েছিল। খন্দকার মোশতাক তো গোহারা হেরেই যাচ্ছিল। তাকেও বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। কোনো সদ্য স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি কেমন হবে, তা নির্ভর করে সে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ওপর। আমাদের কোনো নেতাই এটি শিখিয়ে দেননি; নিজেরাও প্র্যাকটিস করেননি- কীভাবে সহনশীল ও গ্রহণযোগ্য আচরণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নতি ঘটানো যায়।

জিয়াউর রহমানও তো প্রশ্নবিদ্ধ হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থেকেছেন।

দিলারা চৌধুরী: শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান বা এর পরেও কোনো রাজনৈতিক নেতা যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্র্যাকটিস করতেন, তাহলে তাঁদের দলের নেতাকর্মীরাও মেনে চলতেন। এখন আমরা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাতে এটি আর প্রত্যাশা করা যায় না। সামনের দিনে তেমন কোনো রাজনৈতিক নেতা যদি আমরা পাই, তাহলে গণতন্ত্র ঘুরে দাঁড়াতে পারব হয়তো। অনেক দেশেই এমন হয়েছে।

বিএনপির বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ করছেন ক্ষমতাসীনরা। এটিকে কীভাবে দেখছেন?

দিলারা চৌধুরী: সব সরকারই বিরোধীদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ এনে থাকে। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন বলেছে, আওয়ামী লীগ নাশকতা করছে। এখন আওয়ামী লীগ বলছে, বিএনপি নাশকতা করছে। আবার নাশকতা যে একেবারে হয় না, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় সরকার নিজেই নাশকতা করে বিরোধীদের অভিযুক্ত করে। যেমন- ঢাকায় বাসে আগুন জ্বালিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনা। এ ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করা হলো। বহুদিন পর্যন্ত মানুষ বিশ্বাস করত, এ ঘটনায় বিএনপি দায়ী। পরে জানা গেল ঘটনা ঘটিয়েছেন বরিশালের এক আওয়ামী লীগ নেতা। তাই বিরোধীদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়।

সম্ভবত এসব ঘটনার কারণেই একদল আরেকদলের অধীনে নির্বাচনে যেতে না চাওয়ার আস্থাহীনতার তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ফেরাতে কী করণীয়?

দিলারা চৌধুরী:স্বাধীনতার ৫১ বছর পেরিয়ে গিয়েছি আমরা। এই দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা ফেরাতে আমরা বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করেছি। তবুও তো আস্থা ফেরাতে পারলাম না! রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি কথা আছে- প্রত্যেক মানুষই রাজনৈতিক। তাই মানুষের মধ্যে বিভেদ আছে। এই বিভেদ দূর করতে কতগুলো সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে আস্থাহীনতা দূর করা যায়। কিন্তু আমাদের এখানে গণতান্ত্রিক এই আস্থা ফিরিয়ে আনার বদলে রক্তাক্ত ইতিহাস দেখতে পেয়েছি। শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের ফলে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা আর ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। তারা ভাবে- ক্ষমতা ছাড়লে পরিণতি খারাপ কিছু হতে পারে। এভাবে বিভেদ ও আস্থাহীনতা টিকে আছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থাহীনতায় দেশে তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনা কতটুকু দেখছেন?

দিলারা চৌধুরী:তৃতীয় শক্তি বলতে কাকে বুঝব? আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল, নাকি অরাজনৈতিক শক্তি? মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের রাজনীতিটা আসলে রাজনীতিকদের হাতে নেই। থাকলে সবকিছুর সমাধান রাজনৈতিকভাবেই হতো। তৃতীয় শক্তির কথা উঠত না। কিন্তু দেখুন, এখনও দেশের প্রধান দুটি দল আমেরিকান অ্যাম্বাসাডরের পেছনে দৌড়াচ্ছে। আমি সবসময় মনে করি, রাজনৈতিক যে কোনো সমস্যা রাজনীতিবিদরাই সমাধান করতে পারেন। তাঁদেরই উচিত এটি করা। বাংলাদেশে আমরা মিলিটারি ক্যু দেখেছি। সরাসরি না হলেও ওয়ান ইলেভেনে এক ধরনের ঘটনা দেখা গেল। এর মধ্য দিয়েও অভিজ্ঞতা হয়েছে আমাদের। আমি মনে করি, এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না।

আগামী নির্বাচনের আগেই একটি জাতীয় সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুঞ্জন রয়েছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?

দিলারা চৌধুরী:এটি এখন আর গুঞ্জনের মধ্যে নেই। গণতন্ত্র মঞ্চসহ অনেকে এটি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছে। কিন্তু জাতীয় সরকারের ধারণাটি আমার অপছন্দনীয়। কারণ এই পদ্ধতিতে নির্বাচিত নয়- এমন একটি গ্রুপের কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেওয়া হবে। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। সেটিও অনির্বাচিত সরকার ছিল। কিন্তু তাদের জন্য তিন মাসের সময় নির্ধারণ করা ছিল। জাতীয় সরকার নিয়ে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁরা দুই বা তিন বছর মেয়াদের কথা বলছেন। রাজনীতি তো স্থির কোনো বিষয় নয়। মিনিটে মিনিটে তা বদলায়। জাতীয় সরকারে কাদের রাখা হবে- নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের? তাঁরা কি রাজনীতির জঞ্জাল সাফ করবেন? এ কথা ওয়ান ইলেভেনের সময়েও বলা হয়েছিল। সেই সরকার কিছু ক্ষেত্রে জঞ্জাল সাফ করেছিল- এ কথা সত্যি। রাজনীতি স্বাভাবিক হওয়ার পরে আবার সব বদলে গেল। রাজনীতির সমস্যা রাজনীতিবিদদেরই ঠিক করতে হবে। বাইরের কেউ এসে ঘরের সমস্যা ঠিক করবে- এতে আমার আস্থা নেই। জাতীয় সরকার এসে আমাকে একটি সোনার ডিম পাড়া হাঁস উপহার দেবে- এটি আমি বিশ্বাস করি না।
আপনাকে ধন্যবাদ।
দিলারা চৌধুরী: ধন্যবাদ।

সূত্রঃ সমকাল

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ