দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা জরুরি : এ কে এম আতিকুর রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৩ ৯:১২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৩ ৯:১২ অপরাহ্ণ

রাজনীতি ও গণতন্ত্র—এই দুটি শব্দের মধ্যে স্বাভাবিক কারণেই একটি বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। একটির অস্তিত্ব ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ এবং অর্থহীন হয়ে যায়। গণতন্ত্রহীন দেশে রাজনীতির অবস্থা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে রাজনীতি গণতন্ত্রকে শ্বাসরোধ করতে চেষ্টা চালায়, সেই রাজনীতি নিজেই একসময় শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আসলে রাজনীতি যেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, তেমনি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখে। রাজনীতি যখন তার গণতান্ত্রিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তখনই দেশের গণতন্ত্র হুমকিতে পড়ে।
রাজনীতি হয়তো নানা অবয়বে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে একই আদর্শ ও উদ্দেশ্যে বিশ্বাসী বিভিন্ন গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা সংগঠিত জনসমষ্টির মধ্যে। মূলত নিজেদের কল্যাণে বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার চিন্তা থেকেই মানুষের মনে সংগঠিত হওয়ার জন্য দল ও নেতৃত্বের বিষয়টি একসঙ্গে চলে এসেছিল। আর এভাবেই সমাজে রাজনীতির চর্চা শুরু হয়ে যায়। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চিন্তাধারাও বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিকশিত হতে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। পরিবর্তনশীল সেসব চিন্তাধারা চর্চার মাধ্যমে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদি কাঠামোতে জনগণ ও রাজনীতি আবদ্ধ হতে থাকে। এসব প্রক্রিয়া যেমন চলমান ছিল এবং আছে, ভবিষ্যতেও বোধ হয় চলতে থাকবে। তবে এসবের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে একমাত্র জনগণের ওপর, যদি তা প্রকাশের ক্ষমতা জনগণ প্রয়োগ করার সুযোগ পায়। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনীতি বাঁচতে পারে না।
এ কথা বলা বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না যে জনগণকে ঘিরেই রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্ম, বিকাশ, উৎকর্ষ এবং কর্মকাণ্ড। আসলে জনগণ, রাজনীতি ও গণতন্ত্র একই সূত্রে গাঁথা। তবে জনগণ না থাকলে অন্য দুটির উদ্ভব বা সৃষ্টিও হয় না। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী রাজনীতির গতি-প্রকৃতি যেমন নির্ধারিত হয়, তেমনি তাদের পছন্দে এবং প্রয়োজনে গণতন্ত্র স্থায়িত্ব পায়, শক্তিশালী হয়। যদি কোনো কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গণতন্ত্রকে অবমূল্যায়নের চেষ্টা করে, তবে তা হয় গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নতুবা ওই নেতৃত্বকেই রাজনীতির মাঠ ছেড়ে পালাতে হয়। যা হোক, এই তিনের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশ, শান্তি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্যতা।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মুক্ত এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পছন্দ বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা, জনগণের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ, সব নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং আইনের শাসন থাকতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই জনগণকে ধোঁকা দিয়ে বা উপেক্ষা করে রাজনীতি করা হয়। নির্বাচনের সময় জনকল্যাণে বা দেশের উন্নয়নের জন্য অনেক মূল্যবান প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ব্যক্তিস্বার্থই প্রাধান্য পায়। অনেক সময় সামরিক শাসকরা বা তাঁদের মদদপুষ্ট বেসামরিক লোকজন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে দেশ চালানোর চেষ্টা করেন। ইতিহাস বলে যে যাঁরাই যখন এই কাজটি করতে গেছেন, তাঁরাই চরম পরিণতি ভোগ করেছেন। যত শক্তিধর রাজনীতিকই হোন না কেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা যায় না। একদিন চরম পরিণতি তাঁকে বরণ করতেই হয়, এর থেকে নিস্তার নেই। কারণ জনগণই হচ্ছে রাজনীতিকদের ক্ষমতা প্রদানকারী। আর ক্ষমতা দেওয়া হয় একমাত্র দেশ ও জনগণকে সেবা করার জন্যই। এর ব্যত্যয় ঘটালেই ক্ষতির সমূহ সম্ভাবনা, গণতন্ত্র তা-ই বলে।
গত ৮ জানুয়ারি রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জাতীয় পার্টির ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনের প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণদানকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ভালো মানুষ রাজনীতিতে আসতে চায় না। আমরা রাজনীতিকে তাদের জন্য উপযুক্ত করতে পারিনি। চরিত্রবানদের রাজনীতিতে নিয়ে আসতে হবে। চরিত্রবানরা রাজনীতিতে না এলে রাজনীতি খারাপ হয়ে যায়।’ এর সপ্তাহ দুয়েক পর ২৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রতিনিধিসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, নিজের লোক, আত্মীয়-স্বজন দিয়ে কমিটি করা চলবে না। ত্যাগী, দুঃসময়ে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের দিয়ে কমিটি করতে হবে।
ওবায়দুল কাদের অত্যন্ত মূল্যবান শব্দগুলোই উচ্চারণ করেছেন, যা বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই অপরিহার্য। তৃণমূল থেকে উঠে এসে তিনি কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা এবং নির্ভরতার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন। ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি শুধু তাঁর দলেরই নয়, প্রতিটি দলেরই নাড়িনক্ষত্র জানেন এবং বোঝেন। তাই আমরা ধরে নিতে পারি, তিনি দলের সঠিক চিত্রটিকেই জনসমক্ষে উপস্থাপন করেছেন। এই চিত্রটি আওয়ামী লীগসহ দেশের সব দলের ক্ষেত্রেই দেখা যায় এবং দিন দিন এই অবস্থা ভয়াবহতার দিকেই ধাবিত হচ্ছে। আর যদি তেমনটিই হয়, তাহলে রাজনৈতিক নেতাদের কি করণীয় কিছুই নেই? নাকি এসব কথা শুধু বক্তৃতার জন্যই মুখ থেকে নিঃসৃত হয়ে থাকে?
বাস্তবতা হলো, জনসমক্ষে এসব কথা বলে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা আসল কর্মকে আড়ালে রাখেন। বোধ হয় দলের কর্মীরা এবং দেশের সাধারণ মানুষ সেটি বুঝেও থাকে। প্রায়ই আমরা দেখতে পাই এমন সব ব্যক্তিকে দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কথার ঠিক বিপরীত। জানা মতে, ওই সব ব্যক্তির না আছে রাজনৈতিক মেধা, সততা বা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্য গুণাবলি। জানি না দলের নেতৃত্ব কী গুণাবলির ভিত্তিতে ওই লোকগুলোর মধ্যে পদ বিতরণ করে থাকেন। দলগুলো কি এতটাই দৈন্য হয়ে পড়েছে যে যাকে-তাকে ধরেই পদে বসাতে হয়? গণতন্ত্রের এমন ধারা যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো অনুশীলন করে, তাহলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায় কি? আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তাহলে কিভাবে ভালো, মেধাবী ও চরিত্রবানদের দলে আনতে সক্ষম হবে? ওবায়দুল কাদেরের কথার সূত্র ধরে বলতে হয়, আসলে রাজনীতি তো খারাপ হয়েই আছে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের পূজারি, সব দলই গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। যেহেতু জনগণ ও রাজনীতি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভালোমন্দের জন্য দায়ী, তাই রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড এবং দলের নেতাদের দায়িত্ব বর্তায় জনগণকে সঠিক পথের দিকে নিয়ে যাওয়া। আর সে ক্ষেত্রে নেতারা যদি দলকে সঠিকভাবে পরিচালনা না করতে পারেন, ব্যর্থতার সেই দায় তাঁদের ওপরই বর্তাবে। আশা করি এ ব্যাপারে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা অবশ্যই গুরুত্ব দেবেন এবং আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সবার আগে সেই পদক্ষেপটি গ্রহণ করে অন্যদের দেখাবে।
আজকের বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডে জনগণের মতামতকে কতটুকু ভিত্তি করে গণতন্ত্রের চর্চা চলেছিল সেই ইতিহাসে যেতে চাই না। তবে ব্রিটিশের কলোনি হিসেবে ১৯০ বছর কাটানোর পর পাকিস্তানের পূর্বাংশ পরিচিতিতে থাকাকালে গণতন্ত্রের নানা খোলসে কেটেছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। সামরিক শাসন বা উর্দি পরিহিত লোকজনের দেশ চালনার সময় বাদ দিলে অন্য সময় গণতন্ত্রের বাতাস কমবেশি প্রবাহিত ছিল এবং সেভাবেই চলছে। একটু লক্ষ করলে আমরা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দুটি রূপ দেখতে পাই। দেশে এখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে, তাদের মধ্যে একটি ছাড়া আর কোনো দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অনুশীলন আছে বলে মনে হয় না।
যদি দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা না থাকে বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণে দলের নেতৃত্ব নির্ধারিত না হয়, তাহলে দেশে কী করে একটি পরিপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে? কারণ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন—আমি যদি মিথ্যা কথা না বলি, তবেই অন্যজনকে মিথ্যা কথা বলতে নিষেধ করতে পারি। তা না হলে আমিই তো প্রশ্নের সম্মুখীন হব। আমি যদি মিথ্যা কথা বলি এবং অন্যজনকে নিষেধ করি, সেটি হবে ভাঁওতাবাজি। ভাঁওতাবাজির রাজনীতি করে কি সঠিকভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়? রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে যদি গণতান্ত্রিক চর্চা থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের প্রতি দলের একটি অঙ্গীকার জন্ম নেয় এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অনেক সহজ হয়। কারণ একজন তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মী একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে উচ্চতর ধাপে উঠে আসবেন, তাঁর মনমানসিকতা আর চিন্তা-চেতনায় গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ়তর হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি এবং নেতৃত্বদানের ক্ষমতা পরিপক্বতা লাভ করবে, যা দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করায় দৃঢ় ভূমিকা রাখবে। যত দিন না দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অনুশীলন প্রতিষ্ঠিত হবে, তত দিন পর্যন্ত বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অসহায়ত্ব কাটবে না।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব
জনতার আওয়াজ/আ আ