নজরুলের গান-কবিতা তরুণদের ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, মে ২৭, ২০২৫ ১:২৭ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, মে ২৭, ২০২৫ ১:৩০ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেছেন, নজরুলের গান ও কবিতা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জালেমের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে। আজ যখন আমরা নজরুলকে এমন এক বৃহৎ আয়োজনে স্মরণ করছি, তখন সেটি তাঁর প্রতি জাতি হিসেবে আমাদের ঋণ শোধের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।
সোমবার (২৬ মে) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ১২৬তম নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা জাতি হিসেবে এক অস্থির সময় অতিক্রম করছি। তবে একইসঙ্গে সামনে উন্মোচিত হয়েছে অপার সম্ভাবনার দ্বার। আমরা ইতোমধ্যেই একটি অপশক্তিকে পরাজিত করেছি—এখন প্রয়োজন সমাজে নানা স্তরে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের। তবে এই পরিবর্তন কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়।
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আমরা বিশ্বাস করি জাতি হিসেবে সম্মিলিত উদ্যোগ ও সর্বস্তরের ঐকমত্যের মাধ্যমেই এ পরিবর্তন সম্ভব। দলীয় বা সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আসার সময় এখনই। দেশের জনগণ যে স্বপ্ন ও লক্ষ্যে একটি নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে এগিয়ে চলেছে, তা যেন বর্তমান সরকারের হাত ধরেই বাস্তবায়িত হয়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
‘মোরা বন্ধন-হীন জন্ম-স্বাধীন, চিত্ত মুক্ত শতদল’—এই স্লোগান ধারণ করে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় দুই দিনব্যাপী জাঁকজমকপূর্ণ নজরুল জয়ন্তী উদযাপন।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় বিকেল ৪টায় নজরুল ভাস্কর্যে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে। এতে অংশগ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান।
পরে ‘গাহি সাম্যের গান’ মঞ্চে শুরু হয় মূল আলোচনা পর্ব। শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম। প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান, সিন্ডিকেট সদস্য এম জাকির হোসেন খান, নজরুল পদক মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ইয়াকুব আলী খান এবং অধ্যাপক ড. রশিদুন নবী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নজরুলের চিন্তাধারা কখনোই অবহেলার নয়। তিনি সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, দলাদলি ও অন্যায়ের শিকড় উপড়ে ফেলতে চেয়েছেন। তাঁর লেখনী, কবিতা ও সংগীতেই আমরা খুঁজে পাই সেই সংগ্রামী চেতনা, যে সাহস ছাড়া সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয়। তিনি যেমন প্রেমের কবি, তেমনি বিদ্রোহেরও প্রতীক। নজরুল তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন এই বাংলাদেশেই। তিনি বিশ্বাস করতেন—হিন্দু-মুসলিম বিরোধ নয়, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধনই মানবতার ভিত্তি। তাই তিনি বলেছিলেন, গালাগাল নয়—গলাগলি করেই এগিয়ে যাব।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, নজরুল জয়ন্তীর এই আয়োজনে অংশ নিতে পেরে আমি গভীর সম্মান ও কৃতজ্ঞতা অনুভব করছি। নজরুলকে বুঝতে হলে মানুষ হওয়াটাই যথেষ্ট—তিনি ব্যক্তি, জাতি ও মানবতার অবিরাম অনুপ্রেরণা। তাঁর সাহিত্য ও দর্শন আমাদের একতা, সহমর্মিতা ও প্রতিবাদের শক্তি জোগায়। দুই দিনব্যাপী এই সেমিনার, বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নজরুল পদক প্রদান নিঃসন্দেহে এক বড় দায়িত্ব পালনের প্রতিফলন। যাঁরা এ আয়োজনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন, তাঁদের প্রতি জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা।
তিনি আরও বলেন, আজকের দিনে বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে আমাদের দরকার নজরুলের শিক্ষালব্ধ ঐক্যের রাজনীতি। গবেষণার মান ও একাডেমিক অগ্রগতির জন্য আমাদের একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। আমি আশা করি, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্মিলিতভাবে এই উদ্যোগে অংশ নেবে এবং নজরুলচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
দিনব্যাপী আয়োজনে সকাল থেকে পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের তৃতীয় তলায় কনফারেন্স কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক নজরুল বক্তৃতামালা ২০২৫। বাংলাদেশ ও ভারতের শিক্ষক, গবেষক ও নজরুল অনুরাগীরা এদিন চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
দিনের শেষ পর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টায় ‘গাহি সাম্যের গান’ মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। আবৃত্তি, নৃত্য, সংগীত এবং নাটক ‘জিনের বাদশা’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দিনের আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
জনতার আওয়াজ/আ আ