নড়িয়ায় অস্তিত্বহীন মাদরাসার নামে চলছে অর্ধকোটি টাকা আত্নসাতের পায়তারা - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:৫৫, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

নড়িয়ায় অস্তিত্বহীন মাদরাসার নামে চলছে অর্ধকোটি টাকা আত্নসাতের পায়তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৩ ১:৪০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৩ ১:৪০ অপরাহ্ণ

 

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
নড়িয়ার নশাসন ইউনিয়নের মাঝিরহাট এলাকায় শরীয়তপুর ঢাকা মহাসড়কের পাশে মাদরাসা ভবনের কোনো অস্তিত্ব নেই । আদৌ এখানে মাদরাসা ছিল কি না তাও সঠিকভাবে বলতে পারছেন না স্থানীয়রা। এরপরও একটি গুদামঘর ও একটি ক্লাব ঘরকে মাদরাসার ভবন দেখিয়ে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ প্রকল্পের ৪৬ লাখ ৭৫ হাজার ৭৫৮ টাকা আত্মসাতের চেষ্টায় মরিয়া প্রভাবশালী একটি চক্র।ইতোমধ্যে চক্রটির হাতে পৌঁছেছে অধিগ্রহণের নোটিশ। এখন টাকা পাওয়ার পালা। কীভাবে এটা সম্ভব হলো তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে অনিয়মের চিত্র বের হয়ে আসবে বলে মনে করছে সচেতন মহল। মাঝিরহাটে নশাসন ইবতেদায়ি স্বতন্ত্র মাদরাসা নামে কোনো মাদরাসার অস্তিত্ব¡ না থাকলেও ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি গোলাম মোস্তফা মাঝি দাবি করে একজন বলছেন মাদরাসার স্থাপনা রয়েছে। একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক চুন্নু মাঝি বলছেন এখানে মাদরাসার ভবন বহু বছর আগে ছিল। এখন কোনো ভবন নেই। জমি অধিগ্রহণে মাদরাসার নামে আসা ৭ ও ৮ ধারার কোনো নোটিশ তিনি পাননি। সভাপতি গোলাম মোস্তফা মাঝি এ বিষয়ে তাকে কিছু জানাননি বলে দাবি করেছেন সাধারণ সম্পাদক চুন্নু মাঝি ।
জেলা প্রশাসন ও সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীয়তপুর ঢাকা মহাসড়কের জাজিরা নাওডোবা থেকে জেলা শহর পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার এলাকায় ১ হাজার ৬৮২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০৫ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে শরীয়তপুর-জাজিরা ও নাওডোবা পদ্মা সেতু অ্যাপ্রোচ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের জন্য সড়ক বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী জমি ও স্থাপনা অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন, গণপূর্ত বিভাগ এবং বন বিভাগ যৌথ তদন্ত শেষ করে ৭ ধারার নোটিশ দিয়েছে জমি ও স্থাপনার মালিকদের। সম্প্রতি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নশাসন গাগ্রীজোড়া ও ডগ্রী এলাকাসহ কয়েকটি এলাকায় ৮ ধারার নোটিশ দেয় শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের এল এ শাখা থেকে। প্রকল্প স্থাবর ভূমি অধিগ্রহণের আওতাভুক্ত নড়িয়া উপজেলার নশাসন ইউনিয়নের মাঝির হাট এলাকায় বিআরএস ২৩ নম্বর নশাসন মৌজার ৬ নম্বর খতিয়ানের ৩৩০৩, ৩৩০৪ ও ৩৩০৫ নম্বর দাগে ৩৪ শতাংশ জমি অস্তিত্বহীন ওই মাদরাসার নামে বিআরএস রেকর্ড রয়েছে। এ রেকর্ডীয় জমি কীভাবে মাদরাসার নামে বিআরএস রেকর্ডভুক্ত হয়েছে তার কোনো দলিলাদি খুঁজে পাওয়া যায়নি। মাদরাসার ওই রেকর্ডীয় সম্পত্তির ৩৩০৫ নম্বর দাগসহ আরও কয়েকটি দাগের সম্পত্তি এসএ রেকর্ড অনুযায়ী পৈত্রিক মালিকানা দাবি করে ২০১৯ সালে আব্দুল খালেক বেপারী নিজে জেলা প্রশাসক ও অস্তিত্বহীন মাদরাসাসহ ৫জনকে বিবাদী করে আদালতে মামলা করেছেন। জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৮ ধারার নোটিশ দেওয়ার পর মামলার বাদী আব্দুল খালেক বেপারীর স্ত্রী নিলুফা বেগম ৩১ আগস্ট ৩৩০৫ দাগসহ মামলার আরজি অনুযায়ী আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ওই মামলার বিবাদীদেরকে ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। ৮ধারার নোটিশে ৩৩০৫ নম্বর দাগের একটি ক্লাব ঘরকে মাদরাসার নামে স্থাপনা হিসেবে দেখানো হয়েছে । ঐ ক্লাব ঘরটির নিজস্ব মালিকানা দলিল থাকলেও ক্লাব কর্তৃপক্ষ ৮ ধারার নোটিশ পায়নি। ক্লাব ঘরের দক্ষিণ পাশে রয়েছে আব্দুল খালেক বেপারীর একটি বাগান। তিনি ও ৮ ধারার নোটিশ পাননি। বাগানের পাশেই বাজারের মধ্যে জলিল মাঝির একটি গুদামঘর। ওই গুদামঘরটিও মাদরাসার নামে আসা ৮ ধারার নোটিশে দেখানো হয়েছে। আব্দুল জলিল মাঝির মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারী স্ত্রী ফেরদৌস জাহান, মেয়ে লায়লা জিয়াসমিন ও বোন জাহানারা বেগম ৮ ধারার কোনো নোটিশ পায়নি।স্থানীয়দের অভিযোগ নশাসন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল আহসান মাঝি ও অস্তিত্বহীন মাদরাসার সভাপতি গোলাম মোস্তফা মাঝি গুদামঘরসহ ঐ ক্লাব ঘরের ভবন দুটি মাদরাসার ভবন হিসেবে দেখিয়ে সরকারি অর্থ আতœসাতের পায়তারা করছে। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে দুর্নীতি ও অনিয়ম বের হয়ে আসবে।
স্থানীয় মোহাম্মদ সরদার বলেন, ৫০ বছর আগে কয়েকজন বাঁচ্চাকে মক্তবে পড়তে দেখেছিলাম। কিন্তু কোনো মাদরাসা এখানে ছিল না। এ জায়গাটার মালক মৃত আঃ খালেক বেপারীর।
স্থানীয় মোসলেম ঢালী বলেন, আমার জীবদ্দশায় এখানে কোনো মাদরাসা দেখিনি। এখানে মাদরাসার নামে ঘরের বরাদ্দ কিভাবে হলো বিষয়টির সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তারাই ভালো জানেন। এখানে অতীত-বর্তমান কোনো কালেই মাদরাসা ছিল না।
স্থানীয় জলিল মাঝির মেয়ে লায়লা জিয়াসমিন বলেন, নশাসন মাঝিরহাট বাজারের ওই গুদামঘরটির মালিক আমরা। গ্রামে না থাকার কারণে এই ঘরটি মাদরাসার নামে দেখানো হয়েছে। কিভাবে কে এটা করেছে তা আমরা জানি না।
মামলার বাদী মৃত খালেক বেপারীর স্ত্রী নিলুফা বেগম বলেন, ৩৩০৫ নম্বর দাগের জমিতে নশাসন ইবতেদায়ি মাদরাসা নামে মাদরাসার কোনো ঘর নেই। তদন্ত করা হলে ঘরের কোনো অস্তিত্ব ও খুঁজে পাবে না। ওই দাগের জায়গাটি আমার স্বামী খালেক বেপারীর নামে। এ জায়গা নিয়ে এখনো আদালতে মামলা চলমান। যা আমি তার পক্ষে পরিচালনা করছি।
নশাসন ইবতেদায়ি স্বতন্ত্র মাদরাসা কমিটির সাধারণ সম্পাদক চুন্নু মাঝি বলেন, ৮ ধারার নোটিশ পাওয়ার বিষয়ে কিছুই জানেন না। তিনি একটি মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক। গোলাম মোস্তফা মাঝি তাকে ইবতেদায়ি স্বতন্ত্র মাদরাসা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করেছেন বলে জানান। এি কমিটির সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদক আমরা দুজন। এছাড়া এ কমিটির অন্য কোনো সদস্য আছে বলে আমার জানা নেই।
মাদরাসা কমিটির সভাপতি গোলাম মোস্তফা মাঝি বলেন, আমরা মাদরাসা ভবনের ভূমি অধিগ্রহণের ৮ ধারার নোটিশ পেয়েছি। ৩৩০৩, ৩৩০৪ ও ৩৩০৫ এ তিনটি দাগের ভূমি আমাদের মাদরাসার নামে। এ জায়গায় একটি পাকাঘর আছে। সেটিই মাদরাসা। ছাত্রছাত্রীরা এখন পড়তে আসে না বলে আমরা ওই পাকা ঘরটি ভাড়া দিয়েছি।
নশাসন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল আহসান মাঝি বলেন, ক্লাবঘর ও গুদামঘর ভবনের ৮ধারার নোটিশ মাদরাসার নামে হয়েছে। কিভাবে হয়েছে তা মাদরাসার সভাপতি ভালো বলতে পারবে ।গালাম মোস্তফা মাঝির সঙ্গে মিলে মাদরাসার নামে বরাদ্দের টাকা বা অধিগ্রহণের সঙ্গে জড়িত কোনো বিষয়ের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে আমি জড়িত নই। স্থানীয়দের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও সম্পূর্ণ মিথ্যা।
শরীয়তপুর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিবুর রহমান (পিইঞ্জ) বলেন, জমির মালিকানা বা মূল্য নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখা। গণপূর্তকে জেলা প্রশাসন থেকে স্থাপনার বর্ণনা দেওয়া হয়। বর্ণনা অনুযায়ী আমরা মূল্য নির্ধারণ করি।৯০-৯৫ শতাংশ স্থাপনার সরেজমিনে তদন্ত করা হয়। প্রত্যেকটি স্থাপনার সরেজমিনে তদন্ত করা সম্ভব হয় না। জেলা প্রশাসন থেকে যদি কোনো স্থাপনার পুনঃ তদন্তের জন্য বলা হয় তাহলে আমরা করবো।
এ বিষয়ে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, নশাসন ইবতেদায়ি স্বতন্ত্র মাদরাসার যদি কোনো অস্তিত্ব না থাকে, তবে বিল পাবে না। তিনি বলেন, রেকর্ড গ্রহণযোগ্য দলিল। মাদরাসার জমি নিয়ে আদালতে বিরোধপূর্ণ মামলা থাকলে তা নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রকৃত মালিককে স্থাপনা ও জমির ন্যায্যমূল্য দেওয়া হবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ