ফুটবলে প্রথম নারী ম্যাচ কমিশনার সুবহা রহমান - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৯:২৭, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ফুটবলে প্রথম নারী ম্যাচ কমিশনার সুবহা রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৫ ৩:৫০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৫ ৩:৫০ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। এবার মাঠে নয়, ফুটবলের প্রশাসনিক মঞ্চে ইতিহাস গড়লেন এক তরুণী—সুবহা রহমান, যিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী AFC (এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন) ম্যাচ কমিশনার হয়েছেন। এ অর্জনের মধ্য দিয়ে শুধু নিজের নয়, দেশের নারীদের জন্যও খুলে দিয়েছেন নতুন দিগন্তের দরজা।

যাত্রা শুরু
গল্পটা শুরু হয়েছিল বাস্কেটবলের কোর্টে। ছোটবেলায় সুবহা রহমান এর পায়ে ড্রিবল করা, বল ছুড়ে স্কোর করা ছিল তার নেশা। স্কুল জীবনে বাস্কেটবলেই কাটতো দিন। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেননি তিনি; বরং পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন, স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। ইংল্যান্ডে মাস্টার্স করতে গিয়ে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবুও দৃঢ় মনোভাব আর অধ্যবসায়ে এগিয়ে গেছেন। বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ থাকলেও সুবহা বেছে নিয়েছিলেন অন্য পথ—দেশে ফিরে নিজের মাটিতে কাজ করার স্বপ্ন।

ফুটবলের প্রশাসনে প্রথম পদক্ষেপ

মাস্টার্স শেষ করে পাঁচ বছর আগে তিনি যোগ দেন দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশন (সাফ)-এ। প্রথমে কাজটি ছিল নিছক একটি চাকরি, কিন্তু ধীরে ধীরে ফুটবলের জগৎ তাঁকে মুগ্ধ করে। খেলোয়াড়দের প্রাণবন্ত মাঠ, দর্শকের চিৎকার, খেলার উত্তেজনা সবকিছুতেই খুঁজে পান নতুন অনুপ্রেরণা। এখন তিনি সাফের হেড অব হিউম্যান রিসোর্স, প্ল্যানিং অ্যান্ড ম্যানেজার (কম্পিটিশন) পদে দায়িত্ব পালন করছেন। চার বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি অংশ নিয়েছেন বয়সভিত্তিক সাফ টুর্নামেন্ট থেকে শুরু করে সিনিয়র সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ পর্যন্ত। ২০২২ সালে নেপালে এবং ২০২৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বিশেষ করে বাংলাদেশের শিরোপা জয় তাঁর জীবনের গর্বের মুহূর্ত হয়ে আছে।

পরিবারের সমর্থন

বাবা মশিউর রহমান ও মা জিন্নাত রহমানের তিন কন্যার মধ্যে সুবহা বড়। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেয়েটির সাফল্যের পেছনে ছিল পরিবারে অকৃত্রিম সমর্থন।“পরিবার না থাকলে এতদূর আসা সম্ভব হতো না,” বলেন সুবহা। “যখন মনে হতো হয়তো পারব না, তখন বাবা-মায়ের কথা আমাকে নতুন করে শক্তি দিত।”দুই ছোট বোনের জন্যও তিনি এক অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন মেয়েরা চাইলে কেবল খেলায় নয়, খেলার প্রশাসন ও নেতৃত্বের জায়গাতেও জায়গা করে নিতে পারে।

কুয়ালালামপুরের কঠিন পরীক্ষায় বাজিমাত

এএফসির ম্যাচ কমিশনার হতে হলে বয়স হতে হয় ন্যূনতম ৩০ বছর, কারণ এটি শুধু জ্ঞান নয় বরং পরিপক্বতা ও দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা। সুবহার বয়স যখন ৩০, তখনই প্রথমবার আবেদন করেন এবং প্রথম চেষ্টাতেই সফল হন।

গত আগস্টে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হয় এই কঠিন পরীক্ষা। জাপান, কোরিয়া, ইরান, চীনসহ এশিয়ার ৩০টিরও বেশি দেশের প্রার্থীরা অংশ নেন। লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা, কেস স্টাডি সবকিছু মিলে ছিল পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া। “পরীক্ষার সময় খুব নার্ভাস লাগছিল,” স্বীকার করেন সুবহা। “কিন্তু মনে হচ্ছিল, আমি যথেষ্ট প্রস্তুত। অভিজ্ঞতা হয়তো কম, কিন্তু নিষ্ঠা ও মনোযোগ কোনো অংশে কম নয়।”ফলাফল প্রমাণ করেছে তাঁর কথাই সত্যি। অভিজ্ঞ প্রার্থীদের পেছনে ফেলে বাংলাদেশি এই তরুণী অর্জন করেছেন AFC ম্যাচ কমিশনারের ব্যাজ।

বাংলাদেশে নারী ফুটবলের নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশে নারীদের ফুটবল অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে মাঠের সাফল্য দিয়ে। মারিয়া মান্ডা, সাবিনা খাতুনরা সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেখিয়েছেন মেয়েরা ট্রফি তুলতে পারে। আবার জয়া চাকমা ফিফা রেফারি হয়ে মাঠ শাসন করছেন। কিন্তু এতদিন ফুটবলের নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক জায়গায় নারীদের উপস্থিতি ছিল খুব সীমিত। সেখানে সুবহা রহমানের এই অর্জন ভাঙল সেই সীমা। সাবেক ফিফা রেফারি আজাদ রহমান বলেছেন, “বাংলাদেশের কোনো নারী আগে ম্যাচ কমিশনার হননি। সুবহা রহমান স্মার্ট, দক্ষ ও সাহসী। এটি সত্যিই একটি ঐতিহাসিক অর্জন।”

অর্জনের গুরুত্ব ও অনুপ্রেরণা
সুবহার এই সাফল্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সামাজিক বার্তা। নারীরা যে কোনো ক্ষেত্রেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন, খেলাধুলার মঞ্চে নারী শুধু খেলোয়াড় নয়, বরং সংগঠক, পরিকল্পনাকারী, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীও হতে পারে। এএফসির ম্যাচ কমিশনার হিসেবে এখন তিনি এশিয়ার বড় বড় টুর্নামেন্টে দায়িত্ব পালন করবেন, মাঠের প্রতিটি সিদ্ধান্তের অংশ হবেন। বাংলাদেশের পতাকা হাতে বসবেন সেই টেবিলে, যেখানে খেলার নিয়ম, শৃঙ্খলা ও ভাগ্য নির্ধারিত হয়।

বাস্কেটবল কোর্ট থেকে ফুটবলের নীতি নির্ধারণের কেন্দ্র পর্যন্ত সুবহা রহমানের যাত্রা এক অনুপ্রেরণার গল্প। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—পরিশ্রম, সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকলে মেয়েরা যে কোনো অচেনা ক্ষেত্র জয় করতে পারে। আজ সুবহা শুধু একজন ম্যাচ কমিশনার নন, তিনি বাংলাদেশি নারীর আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব ও সাফল্যের প্রতীক। তাঁর অর্জন আগামী প্রজন্মের মেয়েদের বলবে—“স্বপ্ন দেখো, নিজের মাটিতে থেকেও বিশ্বজয় সম্ভব।”

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ