বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনাতেই নিহিত রয়েছে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের আকাঙ্খা
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, নভেম্বর ৭, ২০২৩ ১:৩১ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, নভেম্বর ৭, ২০২৩ ১:৩১ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। স্বাধীনতার চার বছর অতিক্রান্ত হলেও জাতীয় জীবনে তখনো বিরাজ করছিলো এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তা।
সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশের উপর বয়ে যাওয়া গত চার বছরের দুঃশাসন, ক্ষমতা কুক্ষীগতকরণ এবং বিশৃঙ্খল শাসনকাঠামো মহাদুর্যোগের আকার ধারণ করেছিলো। এরই মাঝে পনেরই আগস্টের অভ্যত্থান এবং সামরিক বাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় পুরো দেশ যেন একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছিল। জাতীয় জীবনের অমন ঘোর ক্রান্তিলগ্নে সমগ্র জাতি একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের অপেক্ষায় ছিলো।
৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে জনগণের সেই অপেক্ষা ফুরোলো; দূর হলো সব উৎকণ্ঠা। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ভরাট কণ্ঠে ‘প্রিয় দেশবাসী’ সম্বোধনটি উচ্চারিত হবার সাথে সাথে মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারলো। স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে ঘনীভূত হওয়া সকল আশঙ্কার মেঘ এক পলকে সরে গিয়ে উদিত হলো নতুন দিনের নতুন সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের মানুষের সংকটকালে জিয়ার সাহসী উচ্চারণ সেবারই প্রথম নয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে জাতি যখন অভিভাবকশুন্য হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তিনিই প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন। জীবনের পরোয়া না করে ‘উই রিভোল্ট’ বলে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। পরদিন ২৬শে মার্চ জিয়ার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। দিশাহীন ও বিভ্রান্ত জাতির জন্য সেদিন আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে উঠেছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। তার ঘোষণায় মুক্তিকামী জনতা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তারই ফলাফল আমাদের এই মহান স্বাধীনতা।
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর জিয়া তার পাঁচ মিনিটের ভাষণে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বীয় অবস্থান থেকে সুশৃঙ্খলভাবে দায়িত্ব পালনের উদাত্ত আহবান জানান। জাতীয় সংকটকালীন মূহুর্তে মানুষ যেমন সাহসী উচ্চারণ শুনতে চায়, জিয়া সেই প্রত্যাশাই পূরণ করলেন। জিয়ার ৭ নভেম্বরের ভাষণ জাতিকে সকল আধিপত্যবাদি শক্তি ও তাদের দোসরদের ষড়যন্ত্রের কবল থেকে বেরিয়ে আসার পথ বাতলে দিয়েছিল। জিয়ার কণ্ঠে উচ্চারিত সেই আহবান থেকে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে একটি গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের সঙ্গী হতে অনুপ্রেরণা পেয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়া ঘটনা। এর মাধ্যমে আধিপত্যবাদি ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সূচনা হয়। একই সাথে বাংলাদেশে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তির পথচলা সুগম হয়। স্বাধী্নতা লাভের পর উল্টো রথে ঘুরপাক খেতে থাকা বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে একটি স্থিতাবস্থার উন্মেষ ঘটে। জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশের মানুষ তাদের ছিনতাই হয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ফিরে পায়। সমতাভিত্তিক এবং মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের নীতিতে একটি রাষ্ট্রতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
জিয়া বাংলাদেশের মানুষের রক্তার্জিত প্রত্যাশা তথা বহুত্ববাদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকরণের মাধ্যমে একটি আধুনিক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা করেন। এজন্য তাকে অনেক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে হয়েছে; অনেক রাজনৈতিক সমীকরণ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনা।
৩রা নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটার পর সেনাবাহিনীতে অস্থিরতার সূচনা হয়। ঐ সময়টাতে জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে রাখা হয়। দেশ ছিল তখন কার্যত অভিভাবকহীন। সেনাবাহিনীর মাঝে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছিল। বিস্ফোরোণ্মুখ পরিস্থিতিতে জাসদ ও তার বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে প্রয়াস পায়। তারা ১২ দফা দাবী সংবলিত প্রচারপত্র সাধারণ সেপাইদের মাঝে বিলি করে তাদেরকে উত্তেজিত করে তোলে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা সাধারণ সৈনিকদের মাঝে ‘সিপাই সিপাই ভাই ভাই; অফিসারদের রক্ত চাই’- স্লোগান ছড়িয়ে দেয়।
মূলতঃ বন্দী জিয়াউর রহমানকে ব্যবহার করে তারা ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছিলো। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারির একদল সৈনিক মেজর মুহিউদ্দিনের নেতৃত্বে বন্দী জিয়াকে মুক্ত করে আনে। দূরদর্শী জিয়া পরিস্থিতি অনুধাবন করে কর্ণেল তাহের ও জাসদের পাতা ফাঁদে পা বাড়ান নি। তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পুনঃগ্রহণ করে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনায় মনযোগ দেন। একই সাথে মুখ থুবড়ে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে হাত দেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সাহসী, দেশপ্রেমিক ও কর্মবীর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান তার ক্ষুদ্র শাসনামলে বাংলাদেশকে সেই অবস্থা থেকে উদ্ধার করে একটি শক্ত ভীতের উপর দাঁড় করিয়ে যেতে পেরেছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইমেজ সংকটে ভুগতে থাকা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে মর্যাদার স্তরে নিয়ে যেতে সমর্থ হন। বস্তুত বাংলাদেশের বর্তমান সময়ে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছে, তা জিয়ার প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা ভিত্তির উপরই দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জিয়া বাংলাদেশকে যে সম্ভাবনার পথে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয় নি। জিয়ার প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রকে বারবার বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে। জিয়া পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উত্তরণে কখনো সামরিক স্বৈরাচার, কখনো গণতন্ত্রের মুখোশ পরিহিত ভোটবিহীন ফ্যাসিবাদি সরকার বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একটি কৃত্রিম সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করে দেশকে একদলীয় কর্তৃত্ববাদি ব্যাবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জবরদস্তিমূলক ও নৈশকালীন ভোটের আয়োজনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনি সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছে।
এককথায় একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের পথে প্রথম পদক্ষেপ তথা জনগণের ভোটাধিকার ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার হরণের মাধ্যমে একটি একদলীয় বৃত্ত কায়েম করা হয়েছে, যেখানে জবাবদিহিতার ন্যুনতম বালাই নেই। ফলে রাষ্ট্রজুড়ে জনগণের মতামতের কোনো মূল্য থাকছে না। আর এর চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে একটি সর্বব্যাপী লুটতন্ত্র কায়েম করে দেশকে তথা দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে একটি গভীর সংকটে পতিত করা হয়েছে। প্রশাসনে দলীয়করণ এবং প্রশাসনিকভাবে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিসমূহের ন্যয়সঙ্গত দাবিদাওয়াকে কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে।
গুম, খুন, মামলা, হামলার মাধ্যমে দেশের সর্বত্র একধরণের ভীতাবস্থা জারি রাখা হয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময়কালের সাথে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুজিব শাসনামলের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। সেই সময়েও জনগণের রাজনৈতিক অধিকারকে সংকুচিত করার মাধ্যমে একটি জবাবদিহিতাবিহীন রাষ্ট্রকাঠামোর উত্থান ঘটেছিল। ফলে রাষ্ট্র জুড়ে বিরাজ করছিলো চরম নৈরাজ্য। আর তারই পথ ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। সেই সময়ে জনগণের সমর্থন নিয়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র মেরামতের কাজে এগিয়ে এসেছিলেন। জনগণই তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে এসে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে।
বর্তমান বাংলাদেশের এই চরম ক্রান্তিকালেও জনগণ পুনরায় জিয়ার উত্তরসূরী দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তি ও এর নেতৃত্বের প্রতি সেই আস্থা রেখে সম্ভাবনার বীজ বুনছে। আশা করা যায়, সিপাহী জনতার বিপ্লবের সেই ঐতিহাসিক চেতনা ও তাৎপর্য্য ধারণ করে পুনরায় জাতীয়তাবাদী শক্তি জনগণের মাঝে থেকে জনগণকে সাথে নিয়েই পুনর্বার রাষ্ট্র মেরামতের কাজে আত্মনিয়োগ করবে।
লেখকঃ অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান
সহ-প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি); মহাসচিব, ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব); সদস্য, বিএনপি মিডিয়া সেল।
জনতার আওয়াজ/আ আ