বিপ্লবের প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৫:০৬, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বিপ্লবের প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, নভেম্বর ২৮, ২০২২ ৮:২৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, নভেম্বর ২৮, ২০২২ ৮:২৪ অপরাহ্ণ

 

আমিরুল ইসলাম কাগজী
লুটপাট কাকে বলে, তা কত প্রকার ও কী কী? তা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান দখলদার কতৃর্পক্ষ। রাজশাহীর নাবিল গ্রুপকে মাত্র ১৭ দিনের ব্যবধানে ৭, ২৫০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে সর্বকালের সকল রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে ব্যাংকটি। শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, ফার্ষ্ট সিকিউরিটি ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একই পথ অনুসরণ করে ২, ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে এই গ্রুপকে। সব মিলিয়ে এই তিন ব্যাংক থেকে গ্রুপটি ঋণ নিয়েছে ৯ হাজার ৫ শ’ ৫০ কোটি টাকা যার সিংহভাগ নেওয়া হয়েছে চলতি নভেম্বর মাসের ১ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে। ঋণ নিতে পণ্য ক্রয়ের নথিপত্র থাকতে হয়। কিন্তু ব্যাংকগুলোর কাছে পণ্য ক্রয়ের কোনো প্রমাণপত্র নেই। অর্থাৎ এ টাকা আর কখনো ব্যাংকে ফেরত যাচ্ছে না। এ টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার শতভাগ সম্ভবনা রয়েছে। কারণ নানা কারসাজিতে এই ঋণের বড় অংশ চলে গেছে ব্যাংক মালিকদের পকেটে। হলমার্ক ফেল।
যে নাবিল গ্রুপকে এই ঋণ দেওয়া হয়েছে তার চেয়ারম্যান জাহান বক্স মণ্ডল, এমডি মো. আমিনুল ইসলাম এবং জাহান বক্সের স্ত্রী ইসরাত জাহান নাবিল ফিড মিলের চেয়ারম্যান। তাদের ওয়েবসাইটে স্বীকার করা হচ্ছে যে, ২০০৬ সালে রাজশাহীতে গড়ে ওঠে এই নাবিল গ্রুপ। অথচ ইসলামী ব্যাংক মিথ্যা তথ্য দিয়ে একটি ঢাউস মার্কা বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছে নাবিল গ্রুপ ১৮ বছর যাবৎ সুনামের সাথে ব্যবসা করে আসছে। ইসলামের নাম নিয়ে মিথ্যা বলা যায়েজ?
এই বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের কি বুঝ দেওয়া যাবে? যে আস্থা এবং বিশ্বাস নিয়ে তারা এই ব্যাংকে হিসাব খুলে টাকা রাখে ইসলামী ব্যাংক কি সেই আস্থার জায়গায় আছে? শোনা যাচ্ছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখা, ঢাকার গুলশান কর্পোরেট এবং পুরান ঢাকার শাখা থেকে নামে বেনামে এবং কর্মচারীদের নামে তথাকথিত ঋণের নামে ইসলামী ব্যাংক ফোকলা করে ফেলা হয়েছে। ব্যাংকটির যেসব কর্মকর্তা এতে সহায়তা দেন, তাঁদের দ্রুত পদোন্নতি হয়েছে। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঋণসংক্রান্ত বিভাগগুলোতে। এর মাধ্যমে বের করা হচ্ছে ভুয়া ঋণ। এসব ঋণের মেয়াদ দেওয়া হচ্ছে বেশি, যাতে সহজেই খেলাপি না হয়। ধারণা করা হয় এই ধরনের ভুয়া ঋণের পরিমান ৩০ হাজার কোটি টাকার কম নয়।
এই ব্যাংকের আমানতকারীর সংখ্যা এক কোটির ওপরে। বিশ্বাসের জায়গাটি এমন ছিলো যে, এই ব্যাংকে হিসাব খোলা মানে টাকাটা শতভাগ হালাল হয়ে যাওয়া। কারণ এই ব্যাংক সুদমুক্ত, মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যাংকটি পরিচালিত হয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মনে করেন এখানে টাকা রাখা নিরাপদ, শুধু মুসলমান বলছি কেন অন্য ধর্মের লোকেরাও ইসলামী ব্যাংককে নিরাপদ মনে করে। কিন্তু এস আলম গ্রুপ এর মালিকানা কব্জা করার পর থেকেই এর লুটপাট প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতসব লুটপাট দেখেও যখন বাংলাদেশ ব্যাংক নিষ্ক্রিয় থাকে, তখন ইসলামী ব্যাংকের মতো ভালো ব্যাংকগুলো শেষ হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। সরকারও প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, এমনকি এসব কাজে সরকারের সরাসরি মদদ আছে বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। তা নাহলে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের এত সাহস হয় কিভাবে।
২. ব্যাংকিং খাতের লুটপাট শুরু হয় ২০১১ সালে হলমার্ক কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (হোটেল শেরাটন) শাখা থেকে ঋণের নামে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। হলমার্ক যখন বিভিন্ন কোম্পানির নামে বেনামে সোনালী ব্যাংক থেকে এই বিপুল পরিমান টাকা লুটে নিয়েছিল তখন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত বলেছিলেন, এই কয়টা টাকা নিয়ে মাতামাতি করার কিছু নেই। এমন লুটপাট হতেই পারে। সে সময় এই লুটপাটের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হলেও অর্থ উদ্ধার হয়নি এবং নেপথ্যের রাঘববোয়ালরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝখান দিয়ে ফেসে যায় হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ, হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক (জিএম) তুষার আহমেদ, সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখার ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমান, সোনালী ব্যাংকের জিএম মীর মহিদুর রহমান ও দুই ডিজিএম শেখ আলতাফ হোসেন ও সফিজউদ্দিন আহমেদ।
এই অর্থ লুটপাটে সহায়তা করার জন্য একজন উপদেষ্টা ও একজন সাংবাদিকের নাম সেসময় জোরে সোরে আলোচনায় আসে। কিন্তু কাগজে কলমে তাদের প্রমাণ না থাকায় তারা দুদকের জালের বাইরে চলে যায়।
হলমার্ক গ্রুপকে যখন এই অর্থ সরবরাহ করা হয় তখন সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সদস্য ছিলেন দৈনিক সংবাদের নির্বাহি সম্পাদক কাশেম হুমায়ুন এবং আওয়ামীলীগ নেতা ও রাজনৈতিক সমালোচক সুভাষ সিংহ রায়।
৩. ক্রিসেন্ট লেদার জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ বের করে নিয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
৪. অ্যাননটেক্স গ্রুপ ২০১৪-১৫ সালে ঋণ গ্রহণের নামে জনতা ব্যাংক থেকে বের করে নেয় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। এ জন্য ২২টি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে গ্রুপটি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বের হয়, মাত্র চারটি কোম্পানি পূর্ণাঙ্গ। অনেকগুলোই কাগুজে। আর এসব কোম্পানির মালিক বানানো হয় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এসব ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপি। ফলে জনতা ব্যাংক এখন ঋণখেলাপিতে শীর্ষ।
৫. ফার্মাস ব্যাংকের নাম কি আপনারা ভুলে গেছেন? ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চের হোতা বহুল আলোচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মখা আলমগীর আস্ত ব্যাংটাই গিলে খেয়েছেন। সরকার পরিবেশ উন্নয়নের নামে তাকে ৫ শ’ কোটি দিলেও ব্যাংকটি আর বাঁচানো যায় নি।
৬. গত বছর সেপ্টেম্বর মাসের কথা, বেসরকারি খাতের ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্ট থেকে উধাও হয়ে যায় ১৯ কোটি টাকা। বিষয়টি তদন্তে নেমে কেন্দ্রিয় ব্যাংকের টিম দেখতে পায় লুটপাটের পাহাড় জমেছে ব্যাংকে। শুধু ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে কোম্পানি খুলে ঋণের বড় অংশই বের করে নেয় প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান। আবার অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সও ছিল না। কাগুজে এসব কোম্পানিকে দেওয়া ঋণের বেশির ভাগেরই খোঁজ মিলছে না এখন। ফলে এসব ঋণ আদায়ও হচ্ছে না। ইউনিয়ন ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ১৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা পুরোটাই রাঘববোয়ালদের পকেটে অর্থাৎ খেলাপি অর্থাৎ বিদেশে পাচার।
৭..সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাটের জন্য দেশের আর্থিক খাতে আলোচিত নাম প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। তিনি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। আবার দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ দখলদার ও খেলাপিদের একজন। এমন চরিত্রের আর একজনকেও এ দেশে পাওয়া যায়নি। তিনি ভারতে আটক আছেন, দেশে ফিরে তিনি তার সহযোগীদের নাম বলতে চান। কিন্তু তাকে আনতে দেওয়া হচ্ছে না। তাকে দেশে ফেরৎ আনলে জানা যেত আর কোন কোন হালদার যুক্ত আছে তার লুটপাটের সঙ্গে।
৮. বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে। সেই রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। ঘটনার পরপরই সরিয়ে দেওয়া হয় ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানকে। কিন্তু আইটি শাখার নিয়ন্ত্রনে যিনি ছিলেন তাকে রাখা হলো বহাল তবিয়তে। আলোচিত এই চুরির ঘটনার ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার পরও সেই অর্থ ফেরৎ আনার কোনো উদ্যোগ নেই।
গত ১৪ বছর যাবৎ এমনিভাবে লুটপাটের মাধ্যমে দেশ থেকে প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে এখন যেমন দেশ ডলার সংকটে ভুগছে আগামি কিছুদিনের মধ্যে দেখা যাবে দেশের মানুষ টাকার সংকটে ভুগছে। কারণ এইভাবে অবাধে ব্যাংকের টাকা লুটপাট হতে থাকলে টাকা চলে যাবে মুষ্টিমেয় অভিজাত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে। সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্য কেনার মতো টাকাও পাবে না। এমনটি হয়েছিল ফ্রান্সে ষোড়শ শতকে। সেদেশের অর্থ- সম্পদের ৯৫ ভাগই চলে গিয়ছিলো মাত্র ৫ ভাগ মানুষের হাতে। অবশেষে বঞ্চিত নিপীড়িত ৯৫ ভাগ মানুষের আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে ফরাসী সম্রাটের।এমনই এক বিপ্লবের প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ