মায়ের জানাজায় সন্তানের হাতে শিকল, পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি এ কোন দেশ? - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:৩৬, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

মায়ের জানাজায় সন্তানের হাতে শিকল, পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি এ কোন দেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০২২ ৯:৪৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০২২ ৯:৪৩ অপরাহ্ণ

 

আমিরুল ইসলাম কাগজী
এক।
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২০, ২০২২, বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত খবর ছিলো গাজীপুরে হাতকড়া এবং পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরা বিএনপি নেতা আলী আজমের মায়ের জানাজায় শরিক হওয়া। খবরটা দেখে বিএনপি ছাড়াও সরকারি মহলেও দু’একজন বলতে চেয়েছেন যে কাজটা ভালো হয়নি। জেল কর্তৃপক্ষ বলেছে, কয়েকদিন আগে দুই জঙ্গী ছিনতাই হওয়ার কারণে তারা এ ব্যবস্থা নিয়েছে। একেবার অকাট্য যুক্তি। আমি আজ লিখতে চাই,কতোটা এগিয়েছি আমরা তাই নিয়ে। ফ্রান্সের কিংবদন্তি লেখক ভিক্টর হুগোর সেরা উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’ পড়েননি শিক্ষিত মহলে এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তারপরও সেখান থেকে একটু তুলে ধরতে চাই ডাণ্ডাবেড়ি ও শিকল পরা কাহিনির তুলনা করার জন্য। হুগোর উপন্যাসের নায়ক জা ভালজা ফ্রান্সের এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করেন। ভগ্নিপতির আকস্মিক মৃত্যুতে বোনটা ৭ সন্তান নিয়ে দিশেহারা। এসময় বোন ও ভাগ্নেভাগ্নিদের পাশে এসে দাঁড়ান জা ভালজা। গায়ে – গতরে খেটে কোনোমতে ৮ জনের সংসারকে চালিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি। কখনো আধপেটা কখনও উপোস। এক সময় তার কাজও প্রায় বন্ধ। ছোট ছোট ভাগ্নেভাগ্নিদের মুখে আর খাবার তুলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তাদের চলার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে। তারা বিছানায় গড়াগড়ি ছাড়া আর কিছু করতে পারছে না। এসব দেখে ভগ্ন শরীর নিয়ে গভীর রাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন জা ভালজা। অন্ধকারে কিছুদূর যাওয়ার পরে একটা বেকারির সামনে এসে তার চোখ আটকে যায়। এদিক ওদিক একটু তাকিয়ে কাউকে না দেখে বেকারির গ্লাস ভেঙে চার টুকরো পাউরুটি ব্যাগে ভরে দেন দৌড়। কিন্তু দোকানদার টের পেয়ে তাকে ধাওয়া করে হৈচৈ বাঁধিয়ে দেন। এতে করে আরও লোকজন এসে ভালজাকে ধরে বেদম চড়, কিল, ঘুষি মেরে আধমরা করে আদালতে হাজির করে। আদালত চুরির দায়ে ভালজাকে ৫ বছরের জেল দেন। এটা ১৭৯৫ সালের কথা,সে সময় ফ্রান্সে জেল মানে জাহাজে দাঁড় টানা। কারণ তখনও জাহাজের ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়নি। এই জাহাজের নিয়ম ছিল কয়েদিরা যাতে পালাতে না পারে সেজন্য তাদের পায়ে শেকল পরিয়ে রাখা। আর খেতে দেওয়া হতো পোড়া রুটি। এই কঠিন জীবন ৪ বছর পার করার পর ভালজা পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার কপাল খারাপ, পালানোর দুদিন পরই তিনি আবার ধরা পড়েন। জেল পালানোর দায়ে আদালত তাকে ৩ বছরের জেল দেন। এতে তার ৫ বছরের জেল গিয়ে ঠেকলো ৮ বছরে। কিছুদিন পর ভালজা আবার পালিয়ে যায় কিন্তু ১২ ঘন্টার মধ্যে তিনি ধরা পড়ে যান। আদালত এবার তাকে ৫ বছরের জেল দেন। হলো ১৩ বছর।কয়েক বছর পর আবার পালিয়ে যান ভালজা।তাতে আরো ৩ বছর দণ্ড বেড়ে দাড়ায় ১৬ বছরে। কিছুদিন পর আবারও পালালে কয়েক ঘন্টার মধ্যে ধরা পড়ে যান তিনি। এবার তার ৩ বছরের দণ্ড বৃদ্ধির সঙ্গে অতিরিক্ত দণ্ড হিসেবে গলায় বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়। চার টুকরো রুটি চুরির দায়ে ভালজারের দণ্ড হলো ১৯ বছরের জেল এবং পায়ে শিকল ও গলায় বেড়ি।
দুই।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলী আজম মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে মঙ্গলবার সকালে জেলা কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে নিজ বাড়ি কালিয়াকৈরের পাবরিয়াচালা এলাকায় জানাজায় উপস্থিত হন। আলী আজমের মা সাহেরা বেগম বার্ধক্যের কারণে গত রোববার বিকেলে মারা যান। শেষবার মাকে দেখতে ও মায়ের জানাজা নিজে পড়াতে আইনজীবীর মাধ্যমে সোমবার বিকেলে জেলা প্রশাসক বরাবর প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেন আলী আজম। কিন্তু ওই দিন দাপ্তরিক কাজ শেষ না হওয়ায় মঙ্গলবার তিন ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি মেলে বিএনপির এই নেতার। প্যারোলে মুক্তি পেয়ে সকাল ১০টার দিকে নিজ বাড়ির পাশে মায়ের জানাজাস্থলে উপস্থিত হন আলী আজম। বেলা ১১টায় হয় জানাজা। মায়ের দাফন শেষে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। পুরোটা সময় হাতকড়া ও ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় ছিলেন আলী আজম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী সাইয়েদুল আলম, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পারভেজ আহমেদসহ উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীরা।
তিন।
বিএনপি নেতা আলী আজমের গলায় বেড়ি ছিলো না। বেড়ি ছিলো পায়ে আর হাতে ছিলো শিকল। জেল কোড অনুযায়ী পায়ে বেড়ি পরানো হয় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের। ছিনতাইকৃত দুই জঙ্গী সাজাপ্রাপ্ত, তাদের পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি না পরানো জেলকোডের বরখেলাপ। আইনজ্ঞরা বলেছেন, এই জঙ্গীদের পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি না পরিয়ে প্রকান্তরে তাদের পালিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করে দেওয়া হয়েছে। তাদের উদাহরণ টেনে মিথ্যা গায়েবি মামলায় আটক আলী আজমকে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো জায়েজ করা হচ্ছে যা সম্পূর্ণ আইনের লঙ্ঘন। আরেকটি কথা জরুরি, আলী আজমের বিরুদ্ধে যে মামলায় আটক করা হয়েছে তার বাদি নিজেই বলেছেন, তিনি এই মামলা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাছাড়া এ মামলার বিচার এখনও হয়নি এবং আলী আজম দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও নন। তার ব্যাপারে কাশিমপুর জেল কর্তৃপক্ষ যে আচরণ করেছে তা ২০০ বছর আগে জা ভালজার সঙ্গে করা আচরণকেও হার মানিয়েছে। সেদিক থেকে আমরা এগিয়ে গেলাম নাকি ২০০ বছর পিছিয়ে গেলাম?

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ