যুগপৎ আন্দোলনে যেমন ছিল বিএনপির তিন দিনের অবরোধ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, নভেম্বর ৩, ২০২৩ ২:৩৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, নভেম্বর ৩, ২০২৩ ২:৩৮ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
যুগপৎ আন্দোলনে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবিতে তিন দিনের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি শেষে আবারো ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ ডেকেছে বিএনপি। তাদের ডাকা এই অবরোধে কতটা সফলতা পেয়েছে বা কতটা সফল হতে পারবে। যেমন ছিল বিএনপির ডাকা এই তিন দিনের অবরোধ।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর তিনদিনের টানা অবরোধে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষিপ্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন পরিবহনে আগুন, ভাঙচুর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেও ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা। এসব সংঘর্ষে পিকেটিংয়ে জড়িত তিনজন নিহত ও উভয়পক্ষে কয়েকশ’ আহত হয়েছে।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর অবরোধের প্রথম দিন:
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ডাকা টানা তিন দিনের অবরোধের প্রথম দিন মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকার রাস্তায় প্রায় সব ধরনের গাড়ির সংখ্যা কম লক্ষ্য করা গেছে। ছিল না যানজটও। দূরপাল্লার কোন বাস ছেড়ে যায়নি গাবতলী, যাত্রাবাড়ি, সায়েদাবাদ, মহাখালী থেকে। তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে রিকশা, সিএনজি এবং সীমিত আকারে ব্যক্তিগত গাড়ি চলতে দেখা গেছে। খুব দরকার না হলে সাধারণ জনগণও বের হতে দেখা যায়নি।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা গেছে, গণপরিবহনের খুবই সীমিত শাহবাগ থেকে মিরপুর সড়ক হয়ে ধানমন্ডি প্রবেশের সড়ক একেবারেই ফাঁকা তবে শাহবাগ অভিমুখের সড়কে বিভিন্ন অফিসের স্টাফ বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, রিকশা এবং সিএনজির পরিমাণ চলতে দেখা গেছে। অনেকক্ষণ পরপর বিভিন্ন রুটের বাস আসছে। গুলিস্থান থেকে মহাখালী-বাড্ডা হয়ে উত্তরার সড়কও ছিল ফাঁকা, হাতে গোনা কয়েকটা বাস চলতে দেখা গেছে তবে বাসের ভিতরে যাত্রী সংখ্যাও ছিল কম। তবে রিকশা, সিএনজি চলতে দেখা গেছে। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও অন্যান্য দিনের তুলনায় যাত্রীসংখ্যা অনেকটাই কম ছিল।
তুলনামূলকভাবে যেসব এলাকায় তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে, সেসব এলাকায় রাস্তায় মানুষজন এবং যানবাহনের সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। তবে শহরজুড়েই ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও ছিল অনেক কম। যদিও রাস্তায় রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ছিল স্বাভাবিক দিনের মতোই। রাজধানীর বিভিন্ন দোকানও বন্ধ দেখা গেছে বন্ধ দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানও।
এদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ হয়েছে। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জে বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং বগুড়ায় পুলিশের সাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
রাজধানী যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা, শাহবাগ, রমনা, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ ধানমন্ডি, কলাবাগান, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, ওয়ারী, বংশাল, চকবাজার, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর থানাসহ রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলো বিক্ষোভ মিছিল করতে দেখা গেছে।
অবরোধের সমর্থনে ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় মিছিল বের করে বিএনপি। বেলা ১২টার দিকের ওই মিছিল থেকে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর অবরোধের ২য় দিন:
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ডাকা টানা তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে (বুধবার) প্রথম দিনের মতো অবরোধের দ্বিতীয় দিনেও ঢাকার রাস্তায় প্রায় সব ধরনের গাড়ির সংখ্যা কম দেখা গেছে। ফলে যানজটও ছিল না। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কিছুটা বাড়তে দেখা গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও রিকশার আধিক্য থাকায় সকাল থেকেই ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের।
এছাড়া গাবতলী ও সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকেও দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যেতে দেখা যায়নি। তবে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রি ছিল কম।
এদিন রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও ছিল কম। মহাসড়কের ফুটপাতের বেশিরভাগ দোকানগুলো ছিল বন্ধ। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে তুলনামূলকভাবে যাত্রী কম দেখা গেছে। যার কারণে অনেক লঞ্চও ঘাট থেকে ছেড়ে যায়নি। প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনও রাজধানীতে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বিক্ষোভ মিছিল করতে দেখা গেছে।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর অবরোধের ৩য় দিন:
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর অবরোধের প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের মতো তৃতীয় দিনেও সড়ক-মহাসড়কে গণপরিবহন সংকট থাকায় ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে অফিসগামী যাত্রীদের। সকাল থেকে রাজধানীতে বাস কম চলতে দেখা গেছে তবে রিকশা ও সিএনজি চলেছে সাধারণ দিনের মতো। তবে দুপুরের পর থেকে কিছু কিছু বাস চলতে থাকে এবং সন্ধ্যার দিকে রাস্তায় জ্যামও দেখা গেছে।
এদিকে গেল দুইদিনের মতো তৃতীয় দিনেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম ছিল। আগের দু’দিনের মতো দোকানগুলোতেও ক্রেতা কম থাকায় কেনাবেচা ভালো হয়নি। বিনোদনকেন্দ্রগুলো ছিল ফাঁকা। অবরোধে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে তুলনামূলক যাত্রী কম দেখা গেছে।
গত দু’দিনের মতো এদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সর্তক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো তাদের উপস্থিতি দেখা গেছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবরোধের সমর্থনে বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের ও সমমনা দলগুলোর বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল ও পিকেটিং করতে দেখা গেছে।
গত তিন দিন রাজধানীর সড়কগুলোতে রিকশা-সিএনজি বেশি থাকলেও তাদের ভাষ্য যাত্রী ছিল খুবই কম। সকালে যাত্রী পেলেও সারাদিন বসে দিন কেটেছে। রাজধানীর দয়াগঞ্জ মোড়ে রিকশাচালক রফিক মিয়া ব্রেকিংনিউজকে বলেন, অন্য দিনের মতো গত তিন দিন যাত্রী পাই নাই। অবরোধের কারণে মানুষ বাসা থেকে বের হয় নাই। সারাদিন বসে বসে দিন কেটেছে।
আর এক রিকশাচালক সফিকুল ইসলাম মোড়েই রিকশা নিয়ে বসে আছেন কথা হয় তার সাথে তিনি বলেন, অবরোধে দিনে কোন কামাই নেই। অবরোধে বাস কম চলে যাত্রী বেশি পাওয়ার কথা ইনকাম কম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকালে কিছু যাত্রী পাওয়া যায় তবে সারাদিন বসে থাকতে হয়েছে।
জুরাইনে সারি সারি সিএনজি নিয়ে বসে আছে সিএনজি চালকরা। তারা জানান, গত তিনদিনে আমরা যাত্রী পেয়েছি অনেক কম। অন্যান্য দিন যেখানে দুই থেকে তিন হাজার টাকা ইনকাম করতে পারি সেখানে গত তিন দিনে গড়ে এক হাজার টাকা করে ইনকাম করতে পারেনি। তার মধ্যে সিএনজি মালিকদের দিতে হয় সারাদিন খাওয়া-দাওয়া করতে হয়।
সিএনজি চালক আব্দুল হাই বলেন, আজ সকালে শুধু একটি টিপ পেয়েছি। তাছাড়া সারাদিনই বসে আছি। গত পরশুদিন তিনটা টিপ পেয়েছিলাম গতকাল দুটি টিপ পেয়েছি। অবরোধ কেমন হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষজন রাস্তায় কম বের হয়েছে। তবে এই এলাকায় বিএনপি বা জামায়াতের কোন মিছিল করতে দেখিনি।
এদিকে বিএনপির নেতারা প্রথম দফায় তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচি নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। কারণ তারা মনে করছেন ইউনিয়ন থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত নেতা ও সংগঠকদের ব্যাপক ধরপাকড় সত্ত্বেও সড়ক-মহাসড়ক কার্যত অচল ছিল, এমনকি রাজধানী ঢাকাতেও রাস্তাঘাটে লোক চলাচল ছিল তুলনামূলক অনেক কম।
তারা মনে করেন সারাদেশে সাঁড়াশি আক্রমণ চলছে। এর মধ্যেও মানুষ খুব প্রয়োজন ছাড়া এই তিনদিন বের হয়নি। এর মানেই হলো মানুষ অবরোধকে সমর্থন দিয়েছে। এটিই আমাদের অর্জন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দলের নেতাকর্মী এবং জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দেশব্যাপী তিনদিনের অবরোধ কর্মসূচি সফল করার জন্য দেশের জনগনকে ধন্যবাদ, এবং কর্মসূচি চলাকালে যেসব নেতাকর্মী নিহত ও আহত হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, তার জন্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
গত তিন দিনের দুর্ঘটনা নিয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের সিনিয়র স্টেশন অফিসার তালহা বিন জসীম জানান, ৩১ অক্টোবর (মঙ্গলবার) সকাল ৬টা থেকে ২ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) রাত ৬টা (৩ দিন) পর্যন্ত ৩৪টি আগুন দেওয়ার সংবাদ পায় ফায়ার সার্ভিস। এরমধ্যে রাজধানীতে ১২টি, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে সাতটি, সীতাকুণ্ড, কর্ণফুলি, রাঙ্গুনিয়া, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায় আটটি, বগুড়া ও রায়গঞ্জে চারটি, রংপুর বিভাগের পার্বতীপুরে একটি, বরিশালের চরফ্যাশনে একটি, ময়মনসিংহের কেন্দুয়ায় একটি আগুনের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৮টি বাস, চারটি কাভার্ড ভ্যান, পাঁচটি ট্রাক, একটি প্রাইভেটকার, তিনটি মোটরসাইকেল, দুটি বাণিজ্যিক পণ্যের শো-রুম, একটি পুলিশ বক্স পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিস আরও জানায়, দিনের চেয়ে রাতেই বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এই তিন দিনে ৩৪টি আগুনের ঘটনার মধ্যে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ১৯টি এবং বাকি ১৫টি দিনের অন্যান্য সময় সংঘটিত হয়েছে। দিনের বেলায় সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে বেশি আগুন দেওয়া হয়েছে। ২৮ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত (৫ দিন) ৮২টি স্থানে আগুন দেয়। এরমধ্যে ২৮ অক্টোবর ২৯টি, ২৯ অক্টোবর ১৯টি, ৩০ অক্টোবর একটি, ৩১ অক্টোবর ১১টি, ১ নভেম্বর ১৪টি ও ২ নভেম্বর আটটি আগুনের ঘটনা ঘটে।
বিএনপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবরের পর থেকে (বৃহস্পতিবার) ২ নভেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সাত হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। মামলা দিয়েছে ৪৮৯টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৪০ জনকে। বিভিন্ন ঘটনায় তাদের নেতাকর্মী আহত হয়েছেন ৫৭৬৯ জন।
বিএনপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ সদর দফতর থেকে কোনও হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। কত গ্রেফতার ও মামলা হয়েছে সেই তথ্যও তারা দিতে পারেনি।
তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় রাজধানী থেকে দুই হাজার ১১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ কয়দিনে সহিংসতার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয় ৬৬টি। গ্রেফতার কৃতদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা রয়েছেন।
জনতার আওয়াজ/আ আ