রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি হচ্ছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৫ ৯:০৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৫ ৯:০৬ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও পার্বত্য অঞ্চলের অশান্তি কেবল ধর্মীয় দ্বন্দ্বের কারণে নয়; এর পেছনে বড় কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। জমি দখল, নদী দখল, পাহাড়ের সম্পদ দখল এবং সামরিকীকরণকে টিকিয়ে রাখতেই এই অশান্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত “রামুসহ সারাদেশে বৌদ্ধ বিহারে হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের ১৩ বছর এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ” শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আলোচনা সভার সঞ্চালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু এবং সভাপতিত্ব করেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ২০১২ সালের রামু ঘটনার সময় যেমন সরকারের মন্ত্রী-বিষেশজ্ঞরা ‘বাহ্যিক ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব হাজির করেছিলেন, তেমনি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। অথচ পরবর্তীকালে অনুসন্ধানে প্রমাণ হয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাই এতে জড়িত ছিলেন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। ভুয়া পোস্ট বা অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রামে গ্রামে হামলা চালানো হচ্ছে, আবার নারী বিদ্বেষী আক্রমণও একইভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এটা স্বতঃস্ফূর্ত নয়; পেছনে রয়েছে শক্তিশালী পরিকল্পিত চক্র।
তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের নামে যে রাজনীতি হয়, তা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উপকারে আসে না; বরং সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থই রক্ষা করে। বাঙালি বা মুসলমান পরিচয়ের আড়ালে শ্রেণিভিত্তিক লুটপাট ও দখল চলছে।
নারী ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গে আনু মোহাম্মদ উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা আছে কিনা সেটার বিচার তাদের নিজেদের বক্তব্য দিয়েই করতে হবে। নারীরা ভালো আছেন কিনা, সেটা পুরুষরা বলতে পারে না; নারীর অভিজ্ঞতাই আসল।
পরিবর্তনের উপায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরেও যে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি, তার কারণ সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তির সমাবেশ গড়ে না ওঠা। “শুধু আলোচনা নয়, সক্রিয়তার মাধ্যমেই বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, “গত এক বছরে নারীর উপর হামলা অনেকাংশেই বেড়েছে।যে জায়গাগুলোতে মন্দির-খানকা হামলা করা হয়েছে, সেগুলোতে রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক একটা প্রভাব রয়েছে।
সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ ক্বাফি রতন বলেন, আমরা রামুর ঘটনার ১৩ বছর পর, রামুর যে নৃশংসতা, সে নৃশংসতাকে স্মরণ করে এখানে সমবেত হয়েছি। যখন আমরা সমবেত হয়েছি ঠিক সেই সময় খাগড়াছড়ি জ্বলছে। খাগড়াছড়িতে যাদেরকে সেটেলার বলা হয়। তারা আজকে আক্রমণকারী হিসেবে যাদের উপর হামলা হচ্ছে, এটা একটা ন্যারেটিভ। ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে অন্যকিছু চলবে না, রামুতে যে ঘটনা ঘটেছিল, ফেইসবুকের স্ট্যাস্টাসকে কেন্দ্র করে পুরো পাড়া জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। এটা হচ্ছে একধরনের ফ্যাসিজম। এটি হচ্ছে ধর্মীয় ফ্যাসিজম।
হাইকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ২০১২ সালে ২৪ টি বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা হয়েছে। মাইকে ঘোষণা দিয়ে এই ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছে। কুমিল্লাতেও সেইম কাজটি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে বর্ণবাদ বেড়েছে। এটা শুধু গত ১ বছরের মধ্যে বাড়েনি। এটা আওয়ামী লীগের আমলে থেকেই বেড়েছে।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর যে পরিমাণ হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করা হয়েছে, সেখানে ২০ হাজারের অধিক মামলা হয়েছে। কিন্তু, এ রাষ্ট্র বিচার করতে পারেনি। পাহাড়ে নিয়মিতভাবে নারী-শিশু ধর্ষণ হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পরেও পাহাড়ী এবং বাঙালির মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। ৫ জন নিহত হয়েছে বলে বলা হয়েছে। কিন্তু, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা সিউর কতজন মারা গেছে, সেটা পেলাম না। সংখ্যা নিয়ে রাজনীতি চলছে।
“বিভিন্ন খানকায় যে হামলা করা হয়েছে, প্রকারান্তে সেখানেও সাম্প্রদায়িকতা রয়েছে।”
অর্থনীতিবিদ ও লেখক সুজিত চৌধুরী বলেন, “আমি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলাম। তবে, কোনোদিন ভাবিনি যে দেশে ফিরে আমাকে মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ নিয়ে কাজ করতে হবে। আমি আশা করছি, সামনের দিকে রামুর মতো অন্য কোনো মন্দিরকে আর ধ্বংস হতে দেখা যাবে না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু বলেন, “যে আকাঙ্খা নিয়ে আমরা গণঅভ্যুত্থান করেছিলাম, সেরকম আরেকটা গনঅভ্যুত্থান হয়তো আবারো প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, ১৩ বছর আগে রামুতে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচারটি হলে আজকে আর কোনো মন্দির ভাঙা হতো না। গত তিন-চারদিন ধরে খাগড়াছড়ি যেভাবে জ্বলছে, ঠিক ঐসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আদিবাসীদেরকে নিয়ে বিভিন্ন কথা ছড়ানো হচ্ছে।”
এসময় আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সদস্য ডা. জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য, শিল্পী গবেষক অরূপ রাহী, একটিভিস্ট ফেরদৌস আরা রুমি, সাংবাদিক তাহমিদাল জামি।
জনতার আওয়াজ/আ আ