রিমান্ডে উপেক্ষিত সংবিধান গণগ্রেফতারের পর নির্যাতন : মানা হচ্ছে না ১৫ নির্দেশনা! - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:৫৮, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

রিমান্ডে উপেক্ষিত সংবিধান গণগ্রেফতারের পর নির্যাতন : মানা হচ্ছে না ১৫ নির্দেশনা!

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জুলাই ২৮, ২০২৪ ৩:২০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জুলাই ২৮, ২০২৪ ৩:২০ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
অন্ততঃ দুই দশক আগে (২০০৩ সালে) উচ্চ আদালত রিমান্ডের বিষয়ে একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনায় কোনো মামলায় আসামি গ্রেফতার এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ এবং রিমান্ডে নেয়ার বিষয়ে ১৬৭ ধারা সংশোধনের নির্দেশ দেয়া হয়। এরই মধ্যে রিমান্ড ইস্যুতে বহু ঘটনার জন্ম দিলেও সংশোধিত হয়নি ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা দু’টি। যদিও সংবিধান অনুসারে সর্বোচ্চ আদালতের রায় বা নির্দেশনা প্রতিপালন সরকার কিংবা ব্যক্তি মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক।
‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র ব্যানারে স্তিমিত কোটা সংস্কার আন্দোলনের জেরে গণগ্রেফতার চলছে। ২৬ জুলাই পুলিশের দাবি অনুযায়ী, কোটা আন্দোলনের জেরে সহিংসতার মামলায় দেশে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু রাজধানীতেই মামলা হয়েছে ২৩৪টি। এসব মামলায় ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ করা হয়েছে কয়েক লাখ ছাত্র-শিক্ষার্থী, শ্রেণিপেশার মানুষ এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীকে। রাজধানীর কদমতলী, যাত্রাবাড়ি ও শনি আখড়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে ১ হাজারের বেশি মানুষ। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশই গ্রেফতার করেছে ২২শ’ ৯ জনকে।
গতকাল (শনিবার)ও অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, গাজীপুর, রংপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, সিলেটসহ অন্যান্য শহরগুলোতেও চলছে গণগ্রেফতার। গ্রেফতারের পরপরই তাদের বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে করা হচ্ছে শারীরিক-মানসিকসহ বহুমাত্রিক নির্যাতন। নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হচ্ছে। সহিংসতার, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের হুকুমদাতা, অর্থদাতা, মদতদাতা, কে কে জড়িত- ইত্যাদির স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে। যা মামলার বিচারকালে কথিত স্বীকারোক্তি প্রদানকারীর বিরুদ্ধে ‘সাক্ষ্য’ হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নির্যাতনের মাধ্যমে আদায়কৃত স্বীকারোক্তি সাক্ষ্য হিসেবে অপপ্রয়োগের বহু নজির রয়েছে। চলমান গণগ্রেফতারেও স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে-মর্মে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট (জেপি) ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপি নেতা শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন, আবেদন রেজাসহ অনেককেই কোটা আন্দোলনে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকার মামলায় গ্রেফতার করা হয়। তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তাদেরকেও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। রিমান্ডের নামে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন সংবিধান, আইন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা পরিপন্থি। জাতিসংঘ স্বীকৃত মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
রিমান্ডে নির্যাতন ইস্যুতে উচ্চ আদালতেরও রয়েছে একাধিক নির্দেশনা। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন ইস্যুতে বছর দুই আগেও হাইকোর্ট উষ্মা প্রকাশ করেন। মাদক মামলায় চিত্র নায়িকা পরীমণিকে পরপর ৩ বার রিমান্ডে নেয়ার ঘটনায় রিট হয়। শুনানিকালে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ বলেছেন, রিমান্ডের অপব্যবহার হচ্ছে। এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে না ! আইনজ্ঞরাও বলছেন, গণগ্রেফতারের পর রিমান্ডের অপব্যবহার হচ্ছে। উচ্চ আদালত ইচ্ছে করলেই রিমান্ড বন্ধ করতে পারেন বলে অভিমত তাদের।
আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘রিমান্ড’ শব্দটি ফৌজদারি মামলায় আসামির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ২টি ধারায় ‘রিমান্ড’ শব্দের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কার্যবিধির কোথাও ‘রিমান্ড’ শব্দটির সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ধারা দু’টি হচ্ছে: ১৬৭ ও ৩৪৪। ১৬৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কার্য সমাপ্ত না হলে এবং ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বস্তুনিষ্ঠ বিবেচিত হলে তদন্তকরী কর্মকর্তা নিকটবর্তী আদালতের ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রিমান্ড চাইতে পারেন। এ রিমান্ড একসঙ্গে ১৫ দিনের বেশি হবে না।
ধারার ৩৪৪ নম্বরে বলা হয়েছে, আসামির অপরাধ সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য পাওয়ার পর যদি প্রতীয়মান হয় রিমান্ডের মাধ্যমে অধিকতর সাক্ষ্যপ্রাপ্তি সম্ভব, সেক্ষেত্রে একটি মামলার তদন্ত বা বিচার চলাকালীন আদালত একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারেন।
১৬৭ ধারার অধীন রিমান্ডের ক্ষেত্রে পুলিশি হেফাজত থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপন করে রিমান্ড চাওয়া হয়। ৩৪৪ ধারার রিমান্ডের ক্ষেত্রে একজন আসামি বিচারিক হেফাজতে থাকাকালীন আদালতের কাছে রিমান্ড চাওয়া হয়। একজন আসামির আদালতের নির্দেশনায় কারাগারে অবস্থানকে বিচারিক হেফাজত বলা হয়। ৩৪৪ ধারায় আদালত বলতে ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা আদালতগুলোকে বোঝানো হয়েছে।
তবে রিমান্ডের বিষয়ে সাম্প্রতিক বাস্তবতা ভিন্ন। রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় এবং সেই জবানবন্দি মামলার বিচারে আসামির বিরুদ্ধেই ব্যবহার, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, নারী আসামিদের ধর্ষণ এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে গত কয়েক দশক ধরে ‘রিমান্ড’ একটি বিতর্কিত বিষয়। উচ্চ আদালতে এটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ হয়েছে বহুবার। আদালত থেকে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও কমেনি রিমান্ডের অপব্যবহার।
আইনজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিকের মতে, রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও স্বীকারোক্তি আদায় করা সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা মানা উচিত। যদি পালন করা না হয়, সেটি অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। এজন্য সংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তার মতে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকেই আইন ও সুপ্রিম কোর্টের আদেশ প্রতিপালনের বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল নন। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।
একই বিষয়ে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পীস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)’র প্রেসিডেন্ট এডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, মামলায় বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে রিমান্ড দরকার হতে পারে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ৯৫ ভাগ মামলার ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী আসামির রিমান্ড চাইছে। আমরা জানিনা রিমান্ডে আসামির সঙ্গে কি ব্যবহার করা হয়। তবে ধারণা করা যায়, রিমান্ডে নিলে তদন্ত কর্মকর্তার জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা মেলে। অনেক সময় ‘উপরের নির্দেশে’ও রিমান্ড হয়। এটি এখন একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রিমান্ডের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশনা আজকের রিমান্ড সেটির ধারেকাছেও নেই। এখন সুপ্রিম কোর্ট যদি মনে করে এভাবে আর রিমান্ড নিতে দেয়া যাবে না-তাহলে আদালতই পারে এই প্রবণতা রোধ করতে। আদালত শক্ত অবস্থান নিলেই কেবল এটি বন্ধ হতে পারে। সূত্রঃইনকিলাব

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ