লক্ষ্মীপুরে তফসিল ঘোষণার পর লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনি উত্তাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫ ৩:৫৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫ ৩:৫৪ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
শাহাদাত হোসেন সেলিম, অ্যাডভোকেট নাজমুল ইসলাম, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, রুহুল আমিন ভূইয়া, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ড. রেজাউল করিম, তানিয়া রব, আশরাফ উদ্দিন নিজাম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনি উত্তাপ আরও বেড়ে গেছে। ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থী ও তাদের দলীয় নেতা-কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, দিচ্ছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে প্রার্থীদের তৎপরতা তত বাড়ছে। বিএনপির ঘোষিত প্রার্থীদের নিয়ে দলটির মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় অস্থিরতা থাকলেও জামায়াত এ ক্ষেত্রে নির্ভার রয়েছে। তারা এক বছরের বেশি সময় ধরে পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোটের মাঠ গুছিয়েছে। দুর্যোগ-দুর্ভোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে তারা ভোটব্যাংক তৈরির দিকে নজর দিয়েছে। দুর্নীতি-দখলবাজদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি এ সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচন অফিসসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ৪৪০ দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জেলা লক্ষ্মীপুর। ছয়টি থানা, পাঁচটি উপজেলা, চারটি পৌরসভা ও ৫৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ১৬ লাখ ২২ হাজার ৮৬৬ জন, যার প্রায় অর্ধেকই নারী। পুরো জেলায় রয়েছেন চার তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার।
জানা গেছে, পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত লক্ষ্মীপুরের সংসদীয় আসনগুলোতে বিএনপি তাদের আধিপত্য ধরে রাখে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি নির্বাচন বাদ দিলে ১৯৯১ থেকে এই জেলার সংসদীয় আসনগুলো বিএনপির দখলে ছিল।
অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে। এ দুটি নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে জামায়াত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বিরত থাকে। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপি পৃথকভাবে নির্বাচন করছে। সে অনুযায়ী বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুরের আসনগুলো নিজেদের দখলে
নিতে জামায়াত সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
দল বিলুপ্ত করেও বিতর্কে শাহাদাত হোসেন সেলিম
বিএনপির পক্ষ থেকে শরিক দল বিএলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমকে আসনটি (লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ) ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি আসনটিতে দলীয় প্রার্থীর বাইরে কাউকে মেনে নিতে রাজি হয়নি। সম্প্রতি শাহাদাত হোসেন সেলিম তার দল বিএলডিপিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপি থেকে তার মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। কিন্তু এরপরও বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে তাকে নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি।
অন্যদিকে আসনটিতে জামায়াতে ইসলামী তাদের উপজেলা আমির, ছাত্রশিবিরের সাবেক জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল হাসানকে প্রার্থী ঘোষণা করে। দলীয় প্রচারের মাধ্যমে দলটি এখানে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। ফলে এ আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ইমেজসংকটে বিএনপি, হবে তুমুল ভোটযুদ্ধ
রায়পুর উপজেলা ও লক্ষ্মীপুর সদরের সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-২ আসনে এবারও বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল খায়ের ভূঁইয়া। তিনি এই আসনে ২০০১ ও ২০০৮ সালে নির্বাচন করে এমপি হয়েছিলেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি দিন-রাত এক করে নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এলাকায় তাকে নিয়ে দলের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। তবে চর-মাছঘাট দখল, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব নিয়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসনটিতে বিএনপির কিছুটা ইমেজসংকট রয়েছে।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে জামায়াত। দলটি থেকে জেলা জামায়াতের আমির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাস্টার রুহুল আমিন ভূঁইয়াকে প্রার্থী করা হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামি আট দলীয় জোটের সমর্থনের কারণে তিনি মোটামুটি ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন। এই আসনেও বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে তুমুল ভোটযুদ্ধ হবে।
প্রচারে এগিয়ে জামায়াত
সর্বশেষ তিনটি সংসদ নির্বাচন ছাড়া আগের পাঁচটি নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে (সদর) বিএনপির প্রার্থীরা টানা পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফলে আসনটিকে বিএনপির দুর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আগে জোটবদ্ধ নির্বাচন করায় জামায়াত আসনটিকে দুবার বিএনপিকে ছেড়ে দেয়। তবে এবারের নির্বাচনে দুই দলই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে লড়াই করছে।
এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। অন্যদিকে জামায়াত থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজাউল করিমকে।
দুই দলের প্রার্থীরা ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা, মিছিল-সমাবেশের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রচারে বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে জামায়াতের প্রার্থী কিছুটা এগিয়ে আছেন। বিশেষ করে জামায়াতের নারী কর্মীরা প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ভোটারদের দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিতে উৎসাহিত করছেন। দিচ্ছেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।
কোন্দলে আসন হারাতে পারে বিএনপি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে (রামগতি ও কমলনগর) বিএনপির শরিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রবকে মনোনয়ন দেওয়ার আলোচনা হয়। কিন্তু আসনটি থেকে এর আগে নির্বাচিত হওয়া বিএনপির শিল্প-বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজামও মনোনয়নপ্রত্যাশী। ইতোমধ্যে রব-নিজাম সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলি ও একাধিক মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। তবে তানিয়া রবের পক্ষে বিএনপির একটি গ্রুপের জোরালো সমর্থন রয়েছে বলেও জানা গেছে। অন্যদিকে আশরাফ উদ্দিন নিজাম মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে জামায়াতের প্রার্থী এ আর হাফিজ উল্লাহ নির্বিঘ্নে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। আসনটিতে জামায়াতের শক্তিশালী ভোটব্যাংক রয়েছে। তবে ইসলামি সমমনা ৮ দলের মধ্যে আসন বণ্টন হলে আসনটি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী খালেদ সাইফুল্লাহকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনতার আওয়াজ/আ আ