সমুদ্রে মরণযাত্রার দায় কার
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, এপ্রিল ১০, ২০২৩ ১০:১২ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, এপ্রিল ১০, ২০২৩ ১০:১২ পূর্বাহ্ণ

এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পরিবারের অভাব ঘোচাতে ধারদেনা করে দুবাই যান হবিগঞ্জের বানিয়াচং দক্ষিণ নন্দীপাড়ার মৃত তাজ উল্লার পুত্র আবিদ হোসেন (২০)। দুই বছর আগে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে ভিজিট ভিসায় সেখানে গিয়ে কর্মী ভিসা পান তিনি। কিন্তু প্রত্যাশামতো সুবিধাজনক কাজ পাননি এখনো। একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মে শ্রমিকের কাজ মিললেও ছয় মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না।
বাড়িতে টাকা পাঠানো দূরের কথা; অভাব অনটনে ধারদেনা করে খেয়ে না খেয়ে তার দিন কাটছে দুবাইয়ের আলকুচ এলাকার মেসে। রোজার মাসে সেহেরি ও ইফতার করতে হচ্ছে বিভিন্ন মসজিদে। ছয় ভাই দুই বোনের সংসারে সবার ছোট আবিদ যে স্বপ্ন নিয়ে দুবাই যান- এখন সেই স্বপ্ন তার কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দুবাইয়ের আলকুচ শহর থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভাগ্যবিড়ম্বনার এমন করুণ কাহিনী জানিয়েছেন আবিদ। শুধু আবিদ নয়; এমন অনেক তরুণের দুর্বিষহ জীবন কাটছে দুবাইয়ের আনাচে কানাচে, মেসে। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অনেকে মানবপাচার চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার আশায় সাগর পথে মরণযাত্রার ঝুঁকি নিচ্ছে। অনেককে আবার লিবিয়ায় আটকে রেখে দেশের স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে লাখ টাকা।
দুবাইয়ে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ থাকলেও দুই বছরে আড়াই লাখের অধিক লোক সেখানে গেছে ভিজিট ভিসায়। এক থেকে তিন মাস মেয়াদি এই ভিসায় সেখানে গিয়ে কতজন লোক দেশে ফিরেছে তার সঠিক হিসাব নেই কারো কাছে। কাজ দেয়ার কথা বলে ‘ভিজিট ভিসায়’ তাদের দুবাই নেয়া হলেও সেখানে গিয়ে মিলছে না কোনো কাজ। এ অবস্থায় নিরুপায় হয়ে তারা প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে ইউরোপে পাড়ি দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মরণযাত্রা করছেন। অনেকে যাচ্ছেন ভিন্ন কোনো দেশে। যার পুরোটাই হচ্ছে অবৈধ প্রক্রিয়ায়। অবৈধ পথে ইউরোপে পাড়ি জমাতে দুই লাখের বেশি বাংলাদেশি দুবাইয়ে ঢুকেছে। করোনার আগে ও পরে এসব বাংলাদেশি ভিজিট ভিসায় সেখানে পৌঁছে। আর দুবাইকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে তারা অবৈধভাবে পাড়ি দিচ্ছে ইতালি, স্পেন, গ্রিস, ফ্রান্স, তুরস্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ভিজিট ভিসার মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে দুবাই থেকে লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো ও অন্যান্য আফ্রিকান দেশে যেতে বাধ্য হচ্ছে তারা! দুবাইয়ের দেইরা এলাকার অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেখানে যেন ছোট্ট এক টুকরো বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। সেখানে বার ও ড্যান্স ক্লাবে গেলেই দেখা মেলে অনেক বাংলাদেশি তরুণীর। ওই এলাকা ঘুরলে বাংলাদেশিদের প্রতারিত হওয়া ও মানবপাচারের শত শত করুণ গল্প কানে ভেসে আসে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক মো. শহীদুল আলম বলেছেন, যে যায় দায় তারই। সে জেনেবুঝে টাকা দিয়ে ভিজিট ভিসা নেয়। কাজ দেয়ার কথা বলেই তাদের দুবাই নেয়া হয়। এরপর কাজ না পেলে তারা যে পথে পা বাড়ায়, তার দায় তাদেরই।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম জানান, ২০১৯ সালে ৭২টি মানবপাচার মামলার তদন্তভার পেয়েছি আমরা। এর মধ্যে ৬৭টির তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। ২০২০ সালে আমাদের কাছে এসেছে ৬৩টি মামলা আর প্রতিবেদন দিয়েছি ৫১টির। ২০২১ সালে তদন্তভার পেয়েছি ৫১টি মামলার, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি ৬০টির। আর ২০২২ সালে তদন্তভার পেয়েছি ৩০টির এবং তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছি ৪৫টি মামলার।
জনতার আওয়াজ/আ আ