হরিজন কন্যা প্রীতির বিয়েতে জেলা প্রশাসক, মানবিক উদ্যোগে প্রশংসার জোয়ার
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, এপ্রিল ২২, ২০২৬ ৩:৪৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, এপ্রিল ২২, ২০২৬ ৩:৪৪ অপরাহ্ণ

গাজীপুর প্রতিনিধি
ছবি সংগৃহীত
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া হরিজন (সুইপার) সম্প্রদায়ের এক মা-হারা এতিম কনের বিয়েতে উপস্থিত হয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার এমন ব্যতিক্রমী ও উদার আচরণে মুগ্ধ হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলা প্রশাসকের অপ্রত্যাশিত উপস্থিতিতে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে নেমে আসে আনন্দের বন্যা। কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত কর্মকর্তাদের প্রণাম জানান।
হরিজন সম্প্রদায় দক্ষিণ এশিয়ার একটি অনগ্রসর ও দলিত জনগোষ্ঠী, যারা ঐতিহ্যগতভাবে পরিচ্ছন্নতা কর্মী বা সুইপার পেশার সঙ্গে যুক্ত। সমাজের মূলধারা থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন এই জনগোষ্ঠীর বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। তার এই উপস্থিতি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের এই মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে প্রশাসনের এমন অবস্থান সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হরিজন সম্প্রদায়ের বিয়েতে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতি সমাজের তথাকথিত উচ্চ-নিচু ভেদাভেদ দূর করে সব পেশার মানুষকে সমান মর্যাদা দেওয়ার বার্তা বহন করে। জনপ্রতিনিধি বা উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তার এমন আন্তরিক উপস্থিতি দেশে বিরল হলেও এটি মানবিক প্রশাসনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ছিলেন কনের পক্ষের আমন্ত্রিত অতিথি। কনে শ্রীমতী প্রীতি রানী বাসফোরের পিতা শ্রী রতন বাসফোর বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের গাজীপুর মহানগর শাখার একজন কর্মী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কনের মা স্বর্গীয়া সীমা রানী বাসফোরও গাজীপুরে অবস্থিত ডুয়েটে দীর্ঘদিন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তারা মেয়েকে শিক্ষিত করেছেন; বর্তমানে প্রীতি রানী বাসফোর একটি মহিলা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয়রা বলেন, সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি যখন সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তখন তা সমতা ও মানবিক মর্যাদার শক্তিশালী বার্তা দেয়।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘বাংলাদেশে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে রাষ্ট্র সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা দিয়েছে। আমরা সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একত্রে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। গাজীপুরকে সমতা ও ঐক্যের জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন আমাদের কর্তব্য। কোনো পেশাই অমর্যাদার নয়, অসম্মানের নয়, কম গুরুত্বপূর্ণ নয়- এই বিশ্বাস সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।’
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহরিয়ার নজির এবং সহকারী কমিশনার মো. মাশরাফিকুর রহমান আবরার। জেলা প্রশাসকের আগমনের খবর পেয়ে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন।
জানা গেছে, ওই এলাকায় প্রায় ৩০০টির বেশি হরিজন পরিবার বসবাস করে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলাতেও হরিজন সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন।
জেলা প্রশাসকের এই ব্যতিক্রমী উপস্থিতি শুধু একটি বিয়ের অনুষ্ঠানকে বিশেষ করে তোলেনি; বরং সামাজিক সমতা, মানবিকতা ও মর্যাদাবোধের এক শক্তিশালী বার্তা সমাজের সামনে তুলে ধরেছে।
জনতার আওয়াজ/আ আ