হালখাতা: একালের রূপ বদল, সেকালের টান অটুট - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:০৯, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

হালখাতা: একালের রূপ বদল, সেকালের টান অটুট

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬ ১:১৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬ ১:১৬ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
বাংলা নববর্ষ এলেই পুরান ঢাকার অলিগলিতে ভেসে ওঠে এক পরিচিত সুর, হালখাতার ডাক। পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খোলার এই রীতি কেবল বাণিজ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সম্পর্কের নবায়নও। সময় বদলেছে, বদলেছে আয়োজনের ধরন; তবু ঐতিহ্যের সুতো ছিঁড়ে যায়নি।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাঁখারী বাজার ঘুরে দেখা যায় সেই চিরচেনা উৎসবমুখরতা। দোকানজুড়ে রঙিন ব্যানার, ফুল আর আলোকসজ্জা- বর্ষবরণে পুরান ঢাকার প্রাণবন্ত আবহে ভাটা পড়েনি। বাংলা বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব-নিকাশ বন্ধ করে নতুন খাতা উদ্বোধন করেন, যা একদিকে যেমন বাণিজ্যের সূচনা করে, অন্যদিকে তেমনি সম্পর্কেরও নতুন অধ্যায় খুলে দেয়।

পুরান ঢাকার বনেদি ব্যবসায়ীরা এখনো এই রীতি ধরে রেখেছেন। স্থানীয়দের মতে, শাঁখারী বাজারে হালখাতা শুধু বাণিজ্যের অংশ নয়, এটি পুরান ঢাকার সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আধুনিকতার প্রভাবে অনেক কিছু বদলালেও এই ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক ব্যবসায়ী এখন ডিজিটাল হালখাতার দিকেও ঝুঁকছেন। মোবাইল অ্যাপ বা কম্পিউটারভিত্তিক হিসাব রাখার প্রবণতা বাড়ছে। তবু কাগজের খাতার সেই আলাদা আবেগ এখনো অমলিন।

শাঁখারী বাজারের বড় দোকানগুলোর একটি ‘আশীর্বাদ’-এর বিক্রেতা রুবী সাহা বলছিলেন, হালখাতা শুধু হিসাবের খাতা খোলা নয়। এটি ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক নবায়নের একটি উপলক্ষ। তিনি বলেন, ‘পুরোনো দেনা পরিশোধ করে নতুনভাবে লেনদেন শুরু করার রীতি বহু দিনের। আমরা নিয়মিত ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানাই, মিষ্টি-শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করি।’

তিনি আরও জানান, যারা সারা বছর বেশি কেনাকাটা করেন, তাদের জন্য আলাদা আয়োজন থাকে–কখনো দোকানে, কখনো বাড়িতে।
একই কথা বলেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী আবদুল কাদের। তার ভাষায়, ‘হালখাতা আমাদের জন্য বিশেষ কিছু। পুরোনো হিসাব মিটিয়ে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ পাই। এতে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।’

ক্রেতারাও এই আয়োজনকে নিজেদের উৎসব হিসেবেই নেন। অনেকে পরিবার নিয়ে বাজারে আসেন, কেনাকাটার পাশাপাশি উপভোগ করেন উৎসবের আবহ। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের টানেই তারা শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, নতুন বছরের জন্য মঙ্গল কামনা করেন।

তবে সব জায়গার চিত্র এক নয়। রাজধানীর আরেক ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যকেন্দ্র ইসলামপুরে হালখাতার সেই পুরোনো জৌলুশ অনেকটাই ফিকে। ‘মোহনা বিতান’-এর মালিক আনারুল ইসলাম জানান, স্থানীয় ক্রেতা কমে গেছে। সারা দেশ থেকে মানুষ আসেন কিন্তু বাকিতে বেচাকেনা প্রায় বন্ধ। তাই হালখাতার প্রচলনও কমে গেছে।

সব মিলিয়ে হালখাতা আজও বাঙালির জীবনে এক অনন্য সেতুবন্ধ– যেখানে মেলে ধরে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সহাবস্থান, বাণিজ্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সম্পর্কের উষ্ণতা।

খুলনা প্রতিনিধি জানান, ডিজিটাল লেনদেন ও ইংরেজি ক্যালেন্ডারের আধিপত্যের যুগেও খুলনার ব্যবসায়ীরা আগলে রেখেছেন পহেলা বৈশাখের এই অনন্য সংস্কৃতি।

একসময় খুলনার বড় বাজারের কালিবাড়ী রোড, ভৈরব স্ট্যান্ড রোড কিংবা দৌলতপুরের চাল-ডাল-তেলের আড়তগুলোতে যে জাঁকজমক দেখা যেত, তা এখন অনেকটা কমে এসেছে। তবে জৌলুস কমলেও জুয়েলারি পট্টিসহ গ্রামগঞ্জের ছোট-বড় দোকানে আজও অমলিন এই উৎসব।

খুলনার বড় বাজারের ব্যবসায়ী মনির আহমেদ বলেন, ‘হিন্দু ব্যবসায়ীরা পূজা-অর্চনা আর মুসলিম ব্যবসায়ীরা দোয়ার মাধ্যমে নতুন খাতা খোলেন। এটি কেবল ব্যবসায়িক লেনদেন নয়, বরং বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যকার এক আত্মিক সম্পর্কের মিলনমেলা।’

একসময় হালখাতার দাওয়াত কার্ড পৌঁছাতে হতো সশরীরে। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ফোন কল কিংবা খুদে বার্তা (এসএমএস)। আপ্যায়নেও এসেছে আধুনিকতা। আগে যেখানে গরম মিষ্টি, ক্ষীর কিংবা পান-সুপারিই ছিল প্রধান আকর্ষণ, এখন বড় ব্যবসায়ীরা হোটেল বুকিং দিয়ে ভূরিভোজের আয়োজন করেন। মিষ্টির পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে রঙিন কাগজে মোড়ানো দামি উপহারসামগ্রী।

খুলনার হেলাতলা রোড, ক্লে রোড ও নিউ মার্কেট এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, হালখাতা উপলক্ষে বিপণিবিতানগুলো সাজানো হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা, ফুল ও কাগজের ঝালর দিয়ে। অনেক প্রতিষ্ঠানে লাউড স্পিকারে বৈশাখের গান বাজানোর ব্যবস্থা হয়েছে।

আধুনিক ব্যাংকিংব্যবস্থা ও ক্রেডিট কার্ডের যুগে বাকিতে কেনাবেচার হার আগের চেয়ে কমেছে। ফলে হালখাতার সেই আগের প্রয়োজনীয়তা বা জৌলুশও কিছুটা ম্লান। পুষ্প জুয়েলার্সের মালিক শংকর কর্মকার বলেন, ‘আগের মতো ধুমধাম করে মেলা বসে না। বড় বাজারে আগে মাটির খেলনা, ডুগডুগি ও কাগজের ফুলের মেলা বসত। এখন ইংরেজি মাসের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বলে পহেলা বৈশাখের এই আয়োজন অনেকটা নিয়ম রক্ষায় পরিণত হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, আগে ক্রেতাদের ওপর যে অগাধ আস্থা ছিল, এখন তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। অনেকে টাকা খরচ করে অনুষ্ঠান করলেও বকেয়া পাওনা সময়মতো ফেরত না পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন, যা ব্যবসায়ীদের এই উৎসবের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

তবুও নদীর জোয়ারের সঙ্গে সময় মিলিয়ে খাতার প্রথম পাতায় ‘এলাহি ভরসা’ কিংবা ‘বিসমিল্লাহ’ লিখে নতুন বছরের যাত্রা শুরু করেন অনেক ব্যবসায়ী। শত প্রতিকূলতার মাঝেও বাঙালির এই লোকজ সংস্কৃতি টিকে থাকুক–এমনটাই প্রত্যাশা খুলনার ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ