১১ দলীয় জোটের আসন বণ্টন বিএনপি জোটের আদলে কিছু আসন ‘ওপেন’ থাকছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৮, ২০২৬ ৫:৪০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৮, ২০২৬ ৫:৪০ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি মাত্র ৩৫ দিন। কিন্তু ১১-দলীয় জোটের প্রধান দুই পরাশক্তি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে এখন জটিলতা কাটছে না। কিছু আসনে শরিক দলগুলোর কঠিন দরকষাকষির জন্যই ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দলগুলো। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে কৌশলের অংশ হিসেবে কিছু আসন ‘ওপেন’ (উন্মুক্ত) রাখা হতে পারে। এসব আসনে জোটের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেবেন। জোটের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, ১১-দলীয় জোটে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কয়েকটি আসন নিয়ে দরকষাকষি চলছে। তিন দলই বলছে, কিছু আসনে তাদের প্রার্থী জনপ্রিয়, শক্তিশালী ও জয়ের সম্ভাবনা বেশি। প্রার্থীরা নির্বাচনি মাঠেও গণসংযোগ চালাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত যদি আসন সমঝোতা না হয়, তাহলে কিছু আসনে নির্বাচনি কৌশলের অংশ হিসেবে জোটের প্রার্থীরা উন্মুক্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। এ ছাড়া আরও তিনটি কারণে জোটের আসন সমঝোতা ঝুলে আছে।
জানা গেছে, বিএনপির দুই যুগের মিত্র ছিল জামায়াতে ইসলামী। ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নিয়েছিল জামায়াত। তিনটি নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে আসন সমঝোতার পাশাপাশি একাধিক আসনে উন্মুক্ত প্রার্থী রেখেছিল দুই দলই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত ৩৩টি আসনে জোটের মনোনয়ন পেয়েছিল। ওই নির্বাচনে পাঁচটি আসনে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেরই প্রার্থী ছিল। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় ২২টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল জামায়াত। এ ছাড়া আরও চার-পাঁচটি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের বিপরীতে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা। তাই আসন্ন নির্বাচনে বিগত নির্বাচনগুলোর কৌশলের আদলে ১১ দলীয় জোটেও কিছু আসনে ‘ওপেন’ নীতি অনুসরণের সম্ভাবনা রয়েছে।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গতকাল বলেছেন, ১১ দলের নির্বাচনি আসন নিয়ে সমঝোতা শিগগির হবে। তিনি বলেন, এনসিপিকে ১০ আসন দেওয়ার দাবি ‘কাল্পনিক’।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘১১-দলীয় জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। জোটের আসন বণ্টন নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। যে আসনে যে দলের প্রার্থীর জয়লাভের বেশি সম্ভাবনা থাকবে তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে।’
জোটের একাধিক সূত্র জানায়, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চললেও তা এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। ৩০০ আসনের মধ্যে জামায়াত ১৮০ থেকে ১৯০টি আসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। আর জোটের শরিকদের ১১০ থেকে ১২০টি আসন দিতে চায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন পাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন। তাদের ৪০টির মতো আসন দেওয়ার কথাবার্তা চলছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ২৫-৩০টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৪টি আসনে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন একাই ৭০-৮০টি আসনের দাবি তুলেছে। তবে এনসিপিকে ১০টি আসন ছাড় দেওয়া হচ্ছে এমন দাবিকে ভিত্তিহীন বলছে জোট শরিকরা।
এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বেশি আসনের দাবিতে শক্ত অবস্থানে অনড় থাকায় একক প্রার্থী নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দুটিসহ কয়েকটি দলের অটল অবস্থানের কারণে আসন সমঝোতা নিয়ে আবারও পৃথকভাবে আলোচনা শুরু করেছে জামায়াত। গতকাল বুধবার রাতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বৈঠক করেছে। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে জোটের আসন সমঝোতার ঘোষণায় আরও কিছুদিন সময় লাগবে। তবে জোট থেকেও কোনো দলই বেরিয়ে যাচ্ছে না বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ওই সূত্র জানায়, যেসব আসনে শরিক দলগুলোর একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে এবং কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়, সেসব আসন ‘ওপেন’ রাখা হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ১৫ থেকে ২০টি আসন উন্মুক্ত থাকতে পারে। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত জোটের লিয়াজোঁ কমিটি এসব আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিতের চেষ্টা চালাবে। যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে ভোটারদের ওপরই চূড়ান্ত রায় ছেড়ে দেবে জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব। শরিক নেতাদের মতে, কৌশলগত কারণেই কিছু আসনে এই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ হতে পারে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে প্রতিটি দলের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা চলছে। যেসব আসনে জোটের একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী রয়েছে সেগুলো নিয়ে দরকষাকষি চলছে। আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে আরও সময় লাগবে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আসনগুলোতে সমঝোতা না হলে কিছু আসন উন্মুক্ত রাখা হতে পারে।’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘আসন নিয়ে যা শোনা যাচ্ছে তা সঠিক নয়। আমাদের আসন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, চূড়ান্ত হলে জানিয়ে দেওয়া হবে। বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য এসব অপতথ্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়ানো হচ্ছে।’
জোটের আসন সমঝোতায় এত বিলম্ব হচ্ছে কেন–এমন প্রশ্নের উত্তরে জোটের একাধিক নেতা খবরের কাগজকে বলেন, প্রথমত–কিছু আসনে ১১-দলীয় জোটের হেভিওয়েট নেতাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র ফিরে পেতে আপিল করেছেন। ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিলের শুনানি চলবে। দ্বিতীয়ত–আপিলের পরও যেসব আসনে প্রার্থিতা ফিরে পাবেন না সেই সব আসনের কী হবে? তৃতীয়ত–প্রার্থিতা ফিরে না পেলে বা অন্য প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিলে তখন কী হবে? এসব আসনে কি জোটের একাধিক প্রার্থী রাখা হবে? মূলত এসব কারণেই ১১ দলীয় জোটের আসন বণ্টনে বিলম্ব হচ্ছে।
তাদের মতে, একাধিক প্রার্থী দিলেও অসুবিধা নেই। যে আসনে জামায়াত মনোনয়ন পাবে, সেখানে অন্য দলের প্রার্থী থাকবে না। যে আসন ইসলামী আন্দোলন পাবে, সেখানে অন্যরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবেন। আশা করি, ২০ জানুয়ারি মধ্যে জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান খবরের কাগজকে বলেন, ১১-দলীয় জোটে কোনো সংকট নেই। জোট থেকে কোনো দলও বেরিয়ে যাচ্ছে না। এনসিপিসহ তিনটি দল নতুন যুক্ত হওয়ায় জোটের আসন বণ্টনে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক আসনে জোটের প্রার্থীদেরও মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের অন্য দল হলো– ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি-এবি পার্টি।
জনতার আওয়াজ/আ আ