অগ্রহণযোগ্য, প্রশ্নবিদ্ধ’ নির্বাচনকে ইস্যু বানাতে চায় বিএনপি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২৪ ৩:৪৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২৪ ৩:৪৯ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
দেশে-বিদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ‘গ্রহণযোগ্যতা’ বাড়াতে নবগঠিত সরকারের প্রচেষ্টাকে মোকাবিলা করাই ভোট বর্জনকারী বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে এবারের ভোটকে প্রধান বিরোধী দলবিহীন ‘একতরফা’ ও ‘ডামি নির্বাচন’ আখ্যায়িত করে বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ রাখতে জোর তৎপরতা চালাবে দলটি। সরকারবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ‘চাপে’ সরকার যাতে নির্বিঘ্নে আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করতে না পারে– সে লক্ষ্যকেই প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি।
একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে কম ভোটার উপস্থিতিকে নিজেদের দাবির পক্ষে জনগণের ‘বার্তা’ বলে মনে করছে দলটি। এই বার্তাকে কাজে লাগানোও বিএনপির জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন দলের শীর্ষ নেতারা। অবিলম্বে ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচনটি বাতিল করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখবে বিরোধী দলটি। লক্ষ্য অর্জনে আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, দলকে আরও সুসংহত করতে সরকারবিরোধী সমমনা সব ডান, বাম ও ইসলামী দলকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে হাইকমান্ড।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিএনপিতে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দ্রুত যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্বের মাধ্যমে দল পুনর্গঠন করা জরুরি। বিশেষ করে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নিষ্ক্রিয়দের বাদ দিয়ে সিনিয়র যোগ্যদের নেতৃত্বে এনে চমক আনতে পারে। কাউকে ছোট চোখে না দেখে সমমনাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে সব বিরোধী দলের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা দূর করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উইংকেও আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা প্রয়োজন। ভোট বর্জনের মাধ্যমে সরকারের প্রতি জনগণের এত ‘বড় অনাস্থা’ এবং তৃণমূলের ত্যাগকেও কাজে লাগাতে পারেনি বিএনপি।
একই সঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন বড় আন্দোলন না হলেও সরকারের যে কোনো ভুলের ফলে একসময়ে বিরাট গণআন্দোলন হয়ে যেতেও পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই আকস্মিক আন্দোলনে ‘কর্তৃত্ববাদী’ সরকারকে বিদায় নিতে হয়। বিএনপিকে সাধারণ ভোটারদের ‘বার্তা’ বুঝে এবং মাথায় রেখেই সামনের দিনগুলোতে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। গণতন্ত্রের পক্ষে মানুষ ঐক্যবদ্ধ আছে। ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে জনগণ বিএনপিকে সেই বার্তাই দিয়েছে। মানুষের এই বার্তা বিএনপি না বুঝলে তা তাদের ব্যর্থতা। আর সরকার না বুঝলে তাদেরও বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান গতকাল শুক্রবার বলেছেন, বিএনপি দেশের জনগণের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ফলে বিএনপির পিছু হটার সুযোগ নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি জনগণের ওপর আস্থা স্থাপন করেছে। উল্টো দিকে এটাও স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের জনগণও বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে। এই পারস্পরিক বিশ্বস্ততার ফলে বিএনপির গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। সেই বাস্তবতায় বিএনপি মনে করে, জনগণের সার্বিক ভোট বর্জনের মাধ্যমে আন্দোলনে তাদের প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় জনগণের ভোটের অধিকার তথা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনকে তারা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার শুক্রবার বলেন, মামলা-হামলা, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা নিরসন করে ঘুরে দাঁড়ানো বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ। এ মুহূর্তে দল পুনর্গঠন করে যোগ্য ও মেধাবীদের নেতৃত্বে আনা প্রয়োজন। দরকার গণতান্ত্রিক চর্চা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হওয়া। দলটির ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তবে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার এবং সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কর্মসূচিভিত্তিক সম্পর্ক আরও বাড়াতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি চলে যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে। এখানে রাজনৈতিক দল, জনগণ এবং সুশীল সমাজের ভূমিকা গৌণ হয়ে যাচ্ছে– এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশ ও জনগণের ভবিষ্যৎ প্রভাবশালী বিদেশিরা নির্ধারণ করে দেবে– এটা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনগণের প্রতি চরম অবমাননাকর। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ কী জানতে চাইলে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। শুধু বললেন, এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু করার নেই। সবকিছুই বিদেশিরা নির্ধারণ করে দেবে।
বিএনপির সূত্র জানায়, নেতারা এ মুহূর্তে গণতন্ত্রকামী বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদিন সরাসরি আলোচনায় ব্যস্ত রয়েছেন। তারা আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করছেন যাতে সব বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে সরকারকে বিদায় জানানো যায়। বিএনপি এই মুহূর্তে দলীয় শক্তিকে সুসংহত করবে। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আইনি সহায়তার মাধ্যমে মুক্ত করে আনবে। পাশাপাশি রাজপথে তাদের অবস্থানকে দৃশ্যমান এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখবে।
দলটির নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে এরই মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে দুটি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যা আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে যায়নি এবং তা বিএনপি আন্দোলনের সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করবে। প্রথমত, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সতর্কবাণী যাতে জ্বালানি সংকটসহ পাঁচটি ঝুঁকির কথা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন। দলটি মনে করে, যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পৃথক বিবৃতিতে বাংলাদেশের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দিয়েছে, তা বিএনপির মূল দাবি বা বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়ায় আগামী দিনের আন্দোলনে সহায়ক হবে বলে তাদের বিশ্বাস।
বিএনপি নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে বিজয়ী হয়ে গেল আর বিএনপি আন্দোলনে ব্যর্থ হলো– তা বলা যাবে না। ভোটের দিন জনগণ কেন্দ্রে না গিয়ে বিএনপির নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির প্রতি নীরব সমর্থন দিয়েছে। বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী বলেই নির্বাচন প্রতিহত করার কর্মসূচি দেয়নি।
দলটির নেতারা বলছেন, অনেকে মনে করতে পারেন যে বিএনপি ভোটকেন্দ্রে বাধা দিতে পারেনি, তাদের সেই সক্ষমতা নেই। তাদের বক্তব্য সত্য ধরলেও বিএনপির বাধা ছাড়াই ৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি– এটাই হলো বাস্তবতা। মানুষের ভোটের প্রতি আস্থা নেই। ভোট ছাড়াই সরকার গঠন আওয়ামী লীগের বড় ব্যর্থতা। পৃথিবীর অনেক দেশে এভাবে সরকার গঠনের নজির থাকলেও তারা বেশি দিন টিকতেও পারেনি। যেমন– ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ নেতা খোন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সরকার গঠন হলেও তা টেকেনি।
বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, “হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে জনগণ বিএনপিকে ‘বার্তা’ দিয়েছে– তোমরা (বিএনপি) একতরফা ভোট প্রতিহতের কর্মসূচি না দিলেও বা আন্দোলনে ব্যর্থ হলেও আমরা গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ ঠিকই ভোটদানে বিরত থেকে তোমাদের দাবির প্রতি নীরব সমর্থন দিয়েছি।” তিনি বলেন, ঘন ঘন বৈঠক করে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আদর্শকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান গতকাল শুক্রবার বলেন, বিএনপির দাবির প্রতি দেশের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। একতরফা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে তারা তা প্রমাণ করেছেন। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে আপাতত দল ও নেতাকর্মীকে আরও বেশি সুসংহত করতে হবে। তিনি বলেন, দল ও জোটকে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া হবে। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা হবে। গণতন্ত্রের পক্ষে থাকা সব বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ করা হবে। ডান, বাম ও ইসলামী দল সবাইকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করেই গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে। অচিরেই গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হবে। সূত্রঃ সমকাল
জনতার আওয়াজ/আ আ