অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, জানুয়ারি ২৬, ২০২৬ ৯:৩১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, জানুয়ারি ২৬, ২০২৬ ৯:৩১ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সংবেদনশীল সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সেনাসদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় দেওয়া বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।
বক্তব্যের শুরুতে ড. ইউনূস মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সঙ্গে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আরও বলেন, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত একটি জাতি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের দায়িত্ব নিজের হাতে নেওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, এই নির্বাচন সেই আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
ড. ইউনূস বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে নিজেদের মতামত প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবে। এ কারণে এই নির্বাচনের গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে তরুণদের একটি বড় অংশ প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। পাশাপাশি এমন অনেক নাগরিক রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এই বাস্তবতায় ভোটারদের জন্য শঙ্কামুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সবার দায়িত্ব। দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সশস্ত্র বাহিনী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলে তিনি মনে করেন।
প্রধান উপদেষ্টা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সক্ষম, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এই গুরুদায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে সর্বোচ্চ সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন কোনো ভয়ভীতি বা প্রভাব ছাড়াই নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচন পরিচালনা প্রসঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, মাঠপর্যায়ের সব সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল। কোনো সামান্য বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, তরুণ ও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত নাগরিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণে এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ভয়মুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একই সঙ্গে ড. ইউনূস একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
বক্তব্যের আরেক অংশে তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই অবস্থার পরিবর্তনের সূচনা করেছে। সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় বাহিনীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে জানান তিনি।
ড. ইউনূস বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে নেদারল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া ইতালি, জাপান ও থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে অনুরূপ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব সমঝোতা স্মারক সম্পন্ন হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নেওয়া এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও অব্যাহত রাখবে বলে তিনি আশাবাদী।
এর আগে সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার স্থানে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস এম কামরুল হাসান।
মতবিনিময় সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
জনতার আওয়াজ/আ আ