অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা কেন এত দীর্ঘ - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ২:৫৩, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা কেন এত দীর্ঘ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, জুন ৫, ২০২৩ ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, জুন ৫, ২০২৩ ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

 

বাজেট বক্তৃতা ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনটি হয়ে যাচ্ছে বাজেট-জনসভার মতোই। তাতে বাজেট বোঝা কি সহজ হচ্ছে, নাকি আরও জটিল হয়ে পড়ছে। সংস্কার কি কেবল অর্থনীতিরই দরকার? নাকি বাজেট উপস্থাপনার ধরনও বদলানো দরকার। এসব নিয়েই মূল প্রতিবেদন।

ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের একটি রেকর্ড আছে। ২০২০ সালে তিনি ২ ঘণ্টা ৪২ মিনিট ধরে বাজেট বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই বক্তৃতা এতই দীর্ঘ ছিল যে শেষ দুই পৃষ্ঠা আর পড়তেই পারেননি, অসুস্থ হয়ে যান। বাজেটের মাঝেও তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং সেই বাজেট নিয়ে বলেছিলেন, বক্তৃতা এতটাই দীর্ঘ যে তা আত্মস্থই করাতে পারেননি।

কলকাতা চলচ্চিত্রের নায়িকা নুসরত জাহান তৃণমূলের একজন সংসদ সদস্য। তিনি সে সময় মন্তব্য করেছিলেন, এই বাজেট তো সিনেমাকেও হার মানাবে। কারণ, সিনেমাও এখন এত দীর্ঘ হয় না। নানা সমালোচনার কারণেই হয়তো নির্মলা সীতারমণ এরপর থেকে বাজেটের আকার অনেকটাই কমিয়েছেন। তাঁর এবারের বাজেট বক্তৃতার দৈর্ঘ্য ছিল ৮৭ মিনিট।

অন্যদিকে বাজেট বক্তৃতা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে বাংলাদেশে। এবারের বাজেট শুনতে সময় লেগেছে প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল নিজে পড়লে হয়তো সময় আরও বেশি লেগে যেত। তবে এবার যাঁরা বাজেট বক্তৃতা পুরোটা শুনেছেন, তাঁরা সিনেমার একটা আমেজ ঠিকই পাবেন। পুরো বাজেট বক্তৃতা আগে থেকে রেকর্ড করে অডিও-ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সিনেমার মতোই বিষয়বস্তু অনুযায়ী যন্ত্রসংগীত যুক্ত করা হয়েছে তাতে। সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী একজনকে দিয়ে পুরো বাজেট রেকর্ড করে দেখানো বা শোনানো সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র ঘটনা।

এখন কেউ বলতেই পারেন এটা ডিজিটাল বাংলাদেশ, আর সরকারের লক্ষ্য স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরি করা। সুতরাং বাজেট বক্তৃতা তো এ রকমই হবে। বিশ্বের একমাত্র ঘোষিত ‘স্মার্ট নেশন’ হচ্ছে সিঙ্গাপুর। তারা ২০১৪ সালে স্মার্ট নেশন হতে চাওয়ার ঘোষণা দেয় এবং সে অনুযায়ী কাজও করেছে।

ইউটিউবের কল্যাণে দেশটির অর্থমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের চলতি বছরের বাজেট বক্তৃতা যে কেউ দেখতে পারবেন। তিনি পুরো বক্তৃতা পড়েই শোনালেন। অনেক দেশের অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা এখন পুরোটাই ইউটিউবে পাওয়া যায়। এমনকি ঘানার অর্থমন্ত্রী কেন অফরি-আত্তাকেও দেখা গেল বাজেট বক্তৃতা পুরোটা পড়তে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এই একটা বিষয়ে বাংলাদেশ পথিকৃৎ। এটাই সম্ভবত স্মার্ট বাংলাদেশের যাত্রার প্রথম মাইলস্টোন।

বক্তৃতা কেন এত লম্বা

পৃষ্ঠার সংখ্যার দিক থেকেও এবারের বাজেট বক্তৃতাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা। মূল বক্তৃতা ১৯৮ পৃষ্ঠার, পরিশিষ্টসহ আছে ২৪৮ পৃষ্ঠা। এর আগের বক্তৃতাটি ছিল ২০৮ পৃষ্ঠার, আর ২০২১-২২ অর্থবছরেরটা ১৯২ পৃষ্ঠার। দেশে বাজেট বক্তৃতার দৈর্ঘ্য যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে হয়তো ওজন মাপার যন্ত্র নিয়েই বসতে হবে।

অথচ বাজেট বক্তৃতা কিন্তু আগে এত লম্বা ছিল না। দেশের প্রথম বাজেটটি দিয়েছিলেন প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। সেই বাজেটে ছিল মোট ৫৭টি অনুচ্ছেদ। অনুচ্ছেদের কোনোটাই তেমন লম্বা ছিল না। আর গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের যে বাজেট দিয়েছেন, তাতে অনুচ্ছেদ আছে ৩২০টি। এর কোনো অনুচ্ছেদই সংক্ষিপ্ত নয়। দেশের দ্বিতীয় বাজেট অবশ্য ছিল প্রথমটির তুলনায় আরেকটু লম্বা, অনুচ্ছেদের সংখ্যা ৭৬। তাজউদ্দীন আহমদের দেওয়া শেষ বাজেটের অনুচ্ছেদ ছিল ৭২টি। আর বাজেট বক্তৃতায় প্রথম পরিবর্তনটি আসে ১৯৭৭ সালে।

তখন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি বাজেট বক্তৃতাকে দুটি ভাগ করেছিলেন। প্রথম পর্বে ছিল বাজেট কার্যক্রম, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সরকার কী কী করছে, কেন করছে তার বিবরণ। দ্বিতীয় পর্বে রাজস্ব কার্যক্রম। দুই ভাগে তৈরি বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপনের এই ধারা চলেছে ২০০৪-০৫ অর্থবছর পর্যন্ত।

এম সাইফুর রহমান ৯ জুন ২০০৫-০৬ অর্থবছরের যে বাজেট বক্তৃতা দেন, সেটি দুই পর্বে বিভক্ত ছিল না। এর আগপর্যন্ত প্রথম পর্ব উপস্থাপনের পর বিরতি দেওয়া হতো। বিরতির পর শুরু হতো রাজস্ব কার্যক্রম উপস্থাপন। ততক্ষণে ব্যাংক বন্ধ হয়ে যেত। বাজেটে যেসব শুল্ক পরিবর্তনের কথা থাকবে, তার অপব্যবহার যাতে কেউ না করতে পারে, এ জন্যই লেনদেন বন্ধের পরেই বাজেটের রাজস্ব কার্যক্রম উপস্থাপন করা হতো। তবে আবার বাজেট বক্তৃতা এক পর্বে চলে এলেও এর আকার দীর্ঘ ছিল না। ছোট ছোট অনুচ্ছেদের ৮৭টি অনুচ্ছেদ ছিল সেই বাজেটে।

বাজেট বক্তৃতা লম্বা হতে শুরু করে মূলত ২০০৯ সালে। শুরুটা তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের হাত ধরে। এরপর থেকে বাজেট বক্তৃতা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে লম্বা বাজেট বক্তৃতা আসলে কতটা পাঠযোগ্য। সবচেয়ে বড় কথা, সরকারের প্রকৃত অগ্রাধিকার কী, মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা নিয়ে অর্থমন্ত্রী কী করছেন, করের যে প্রস্তাব তা কতটা সহজবোধ্য, এর প্রভাব কী—এগুলোই আসল কথা। আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে সরকার আসলে কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেছে এবং সাধারণ মানুষ তা কতটা বুঝতেও পারছে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ