আত্মগোপনে শামীম শিকদারের আশ্রয়ে ছিলেন তসলিমা নাসরিন
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, মার্চ ২২, ২০২৩ ৯:২১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, মার্চ ২২, ২০২৩ ৯:২১ অপরাহ্ণ

চারুকলা ইনস্টিটিউটের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক শামীম শিকদার গত ২১ মার্চ ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার স্মৃতিচারণ করেছেন সময়ের আলোচিত ও নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ১৯৯৪ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হলে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়। সেসময় আত্মগোপনের জন্য তাকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন শামীম শিকদার।
বুধবার (২২ মার্চ) তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে নিজ ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দেন তসলিমা নাসরিন। এতে তিনি লিখেছেন, ছবির এই ঘরটি ভাস্কর শামীম সিকদারের ঢাকার বাড়ির দোতলার একটি ঘর, যে ঘরটিতে আমি ১৯৯৪ সালের জুন জুলাই মাসের বেশির ভাগ সময় আত্মগোপন অবস্থায় ছিলাম। তখনকার সরকার আমার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ করে মামলা করেছিল, গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছিল। ওদিকে ধর্মান্ধ মৌলবাদিরা আমার ফাঁসির দাবিতে দেশ জুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। গ্রেফতার করলে, জেলে পাঠালে ধর্মান্ধ পুলিশ বা কয়েদি আমাকে খুন করতে পারে বেহেস্তের লোভে, এ কারণে প্রাণ বাঁচাতে আমাকে আত্মগোপন করতে হয়েছিল। নিজে তো গ্রেফতার হওয়ার জন্য তৈরি ছিলাম, কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শেই আত্মগোপন করেছিলাম।
এই ঘরটিতে যে এক জলজ্যন্ত প্রাণী বাস করছে, তা তাঁর বাড়ির আর কাউকে জানতে দেননি শামীম সিকদার। আমাকে তিনি ইজেল, ক্যানভাস আর রঙ তুলি দিয়েছিলেন ছবি আঁকতে। অনেকগুলো ছবি এঁকেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি কত বড় লেখক জানি না, তবে ছবি আঁকা চালিয়ে গেলে তুমি অনেক বড় শিল্পী হতে পারবে।’ না শিল্পী হওয়া আমার হয়নি। ছবি আঁকার কোনও প্রাথমিক জ্ঞান আমার ছিল না। তিনিও শেখাননি। বলেছিলেন, যা মন চায়, যেভাবে মন চায়, আঁকো। আমি তা-ই করেছিলাম। সবকটা ছবি এখনও হয়তো তাঁর সেই বাড়িতেই আছে।
আত্মগোপন অবস্থা থেকে বেরিয়ে জামিন নিয়েছিলাম হাইকোর্টে গিয়ে। তার কিছুদিনের মধ্যে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। শামীম সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি আর। তবে বহু বছর পর একবার ফোনে কথা হয়েছিল। বলেছিলেন তিনি লণ্ডনে চলে যাচ্ছেন, ওখানেই থাকবেন। ফেসবুকে প্রায়ই খুঁজতাম তাঁকে। পাইনি। সেইসব অন্ধকার নামে আমার আত্মজীবনীর চতুর্থ খণ্ডর অনেকটা জুড়ে আছে তাঁর বাড়িতে আমার আত্মগোপনের কাহিনী। বইটি শামীম সিকদারকে এবং আরও কজনকে উৎসর্গ করেছি, যাঁরা আমাকে দুঃসময়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে বইটিকে বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল।
আশা ছিল, কোনওদিন হয়তো তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হবে আবার, আবার হয়তো বন্ধুর মতো গল্প করবো, অন্তরীণে থাকার সময় যেমন প্রায়ই সারারাত গল্প করতাম। আমি কত বার যে ভেঙে পড়তাম, আর তিনি মনে সাহস রাখতে বলতেন।
নিচের ছবিটি সম্পর্কে বলি, এক রাতে আমার বাবা আর দাদা এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। হয়তো আমাকে শেষ দেখা দেখার জন্য এসেছিল। তখনও ভয়ঙ্কর রকম অনিশ্চিত জীবন আমার। পুলিশ আর মোল্লা- দুই গোষ্ঠী আমাকে হণ্যে হয়ে খুঁজছে। এক গোষ্ঠী চাইছে জেলে ভরতে, আরেক গোষ্ঠী চাইছে ফাঁসি দিতে। আমার বাবা আমাকে আমার প্রিয় ফল আম খাওয়াতে চাইছেন। বাবার পেছনে দেখা যাচ্ছে শামীম সিকদারের বানানো লম্বা জিভ বের হওয়া ‘রাজাকার’ নামের কাঠের ভাস্কর্য। আর পেইন্টিংস? সব আমার আঁকা। ইজেলে রাখা ক্যানভাসে তখনও শামীম সিকদারকে আঁকার কাজ চলছে। তার নিচে আরেকটি তেল রঙ ছবি, ছবিটির মাঝখানে আমি, আর অসংখ্য টুপি পরা মৌলবাদি আমাকে ছোবল দিতে চাইছে।
জনতার আওয়াজ/আ আ