আমি কেন কালো? নিরুপমা রায় - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১০:৪৯, বুধবার, ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

আমি কেন কালো? নিরুপমা রায়

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, এপ্রিল ২৪, ২০২৬ ৬:০৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, এপ্রিল ২৪, ২০২৬ ৬:০৬ অপরাহ্ণ

 

বিনোদন ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
সৃষ্টিকর্তা তার নিপুণ হাতে প্রতিটি মানুষকে আলাদা করে গড়েছেন। কারও চোখের মণি নীল, কারও চুল কোঁকড়ানো, আর কারও গায়ের রং দুধে-আলতা বা ঘন কৃষ্ণবর্ণ। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় বর্ণ বা গায়ের রং কেবল একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের যোগ্যতা, সৌন্দর্য এবং সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি। ‘আমি কেন কালো?’ এ প্রশ্নটি যখন একজন মানুষের মনে উদয় হয়, তখন সেটি কেবল নিজের প্রতি কৌতূহল থাকে না, বরং সমাজের চাপিয়ে দেওয়া হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গায়ের রং কেবল মেলানিন নামক একটি রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতির তারতম্য মাত্র।

সামাজিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা
আমাদের সমাজে ‘ফর্সা’ হওয়াকে ঐতিহাসিকভাবেই আভিজাত্য এবং সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে শ্যামবর্ণ বা কৃষ্ণবর্ণের মানুষগুলোকে শৈশব থেকেই বিভিন্ন নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র–সর্বত্রই একটি অদৃশ্য বৈষম্য কাজ করে। বিশেষ করে বিয়ের বাজারে গায়ের রং এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রথম এবং প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এই নিরন্তর অবমূল্যায়ন একজন মানুষের আত্মবিশ্বাসকে ধূলিসাৎ করে দেয়, যার ফলে তিনি বিষণ্নতা এবং সামাজিক ভীতিতে ভুগতে শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন ও মিডিয়ার প্রভাব
টেলিভিশন বা ইন্টারনেটের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রসাধনী পণ্যের বিজ্ঞাপনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন গায়ের রং উজ্জ্বল হওয়াটাই সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি। ‘কালো থেকে ফর্সা হওয়ার’ ক্রিম বা ফেসওয়াশের প্রচারণায় বোঝানো হয় যে, কালো চামড়া মানেই অপরিচ্ছন্নতা বা অযোগ্যতা। মিডিয়ার এই একপক্ষীয় সৌন্দর্যবোধ সাধারণ মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি করে যে, সুন্দর মানেই ফর্সা। এর ফলে ডার্ক-স্কিনড মানুষেরা নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করেন এবং হীনম্মন্যতায় ভোগেন।

আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠন
এই মানসিক অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রথম ধাপ হলো নিজেকে ভালোবাসা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ত্বকের রঙের জন্য আফসোস না করে এর সতেজতা এবং স্বতন্ত্রতাকে গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের ব্যক্তিত্ব, মেধা এবং কর্মই তার আসল পরিচয়। পৃথিবীর সফলতম ব্যক্তিদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের গায়ের রং কখনোই তাদের শিখরে পৌঁছাতে বাধা হতে পারেনি। নিজের দক্ষতার ওপর মনোনিবেশ করলে গায়ের রঙের হীনম্মন্যতা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়।

পরিবেশ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
সমস্যার সমাধান কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি পরিবারে শিশুদের শেখাতে হবে যে, সৌন্দর্য ত্বকের রঙে নয়, বরং মানুষের আচরণে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আমরা যদি সমষ্টিগতভাবে এই চিন্তাধারা গড়ে তুলতে পারি যে, ‘কালো’ কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটি একটি বৈচিত্র্য–তবেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

মেলানিনের আশীর্বাদ
যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, কালো বা শ্যামলা ত্বকের অনেক প্রাকৃতিক সুবিধা রয়েছে। আমাদের ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ বেশি থাকার কারণে তা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে এবং ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। এটি প্রকৃতির একটি সুরক্ষা কবচ। তাই ‘আমি কেন কালো?’ এই প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত, ‘আমি কালো কারণ প্রকৃতি আমাকে প্রখর রোদ আর প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বাঁচার শক্তি দিয়ে তৈরি করেছে।’

শেষ কথা
সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে বন্দি নয়। অন্ধকার রাতে আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র যেমন সুন্দর, তেমনি মেঘাচ্ছন্ন আকাশও তার নিজের মহিমায় ভাস্বর। গায়ের রং বদলানোর চেষ্টা না করে আমাদের উচিত নিজের চিন্তাধারা এবং দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। যেদিন আমরা মানুষকে তার গায়ের রঙের ঊর্ধ্বে গিয়ে কেবল তার সত্তা দিয়ে বিচার করতে শিখব, সেদিনই ‘আমি কেন কালো?’ এই আক্ষেপভরা প্রশ্নের চিরতরে অবসান ঘটবে। আমাদের চামড়া যে রঙেরই হোক না কেন, ধমনিতে বয়ে চলা রক্ত এবং বুকের ভেতরের মানুষটি সবারই এক। সেই মনুষ্যত্বের জয়গান গাওয়াই হোক আমাদের জীবনের লক্ষ্য।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ