উখিয়া-টেকনাফে ভোটের লড়াই জমজমাট, কড়া নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬ ১১:২৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬ ১১:২৪ অপরাহ্ণ

টেকনাফ প্রতিনিধি
ছবি : সংগৃহীত
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) সংসদীয় আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমানতালে ভোটের লড়াই চলছে। নির্বাচনি মাঠে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও ইয়াবা কারবারিদের প্রকাশ্য তৎপরতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, উখিয়া ও টেকনাফে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়ছে না।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭১ হাজার ৮২৫ জন। এর মধ্যে টেকনাফ উপজেলায় ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৬৫৫ জন এবং উখিয়া উপজেলায় ১ লাখ ৭১ হাজার ১৭০ জন। টেকনাফে মোট ৬১টি এবং উখিয়ায় ৫৪টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে।
এ আসনে শুরুতে ছয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। পরে একজন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করায় বর্তমানে চারজন প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন। তারা হলেন বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতের নুর আহমদ আনোয়ারী (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলনের নুরুল হক (হাতপাখা) এবং এনডিএমের সাইফুদ্দিন খালেদ (সিংহ)। এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের ঘিরেই মূল রাজনৈতিক আলোচনা কেন্দ্রীভূত। স্থানীয়ভাবে এই দুই প্রার্থীকে সমান শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে টেকনাফ উপজেলায় প্রশাসন ভোট কেন্দ্র গুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত না করলেও অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ১৯টি কেন্দ্রকে চিহ্নিত করেছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ পৌরসভা, সাবরাং, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও সদর ইউনিয়নের অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন, নজরদারি বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।

প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও পুলিশের সমন্বয়ে প্রায় ৬০০ জন সদস্য নিয়ে যৌথ বাহিনী মাঠে কাজ করছে।
যৌথ বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করছেন এবং নির্বাচনি এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যে নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এই সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার রাখা হবে বলে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের প্রকাশ্য তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশেষ করে টেকনাফ উপজেলার টেকনাফ পৌরসভা, সদর, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও সাবরাং ইউনিয়নে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব এলাকার একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিকে বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। তারা মিছিল, সভা ও নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও তাদের প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টির ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
এই পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় সাধারণ মানুষ গভীর হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের এমন প্রকাশ্য সম্পৃক্ততা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। একই সঙ্গে এতে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার ঝুঁকিও বাড়ছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৯ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্যাম্পের বাইরে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ সময় রাজনৈতিক সভা, মিছিল বা নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিলে নিবন্ধিত কার্ড বাতিলসহ কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের যোগসাজশে কিছু ভোটকেন্দ্র এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও আলোচিত-সমালোচিত আবদুর রহমান বদির পরিবারের সদস্য এবং তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের কারাগার থেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অপরদিকে, টেকনাফ উপজেলায় আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। মামলা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে তারা আপাতত নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছেন। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অধিকাংশ নেতাকর্মীরা বর্তমানে এলাকার বাইরে অবস্থান করছেন।
কক্সবাজার-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, সারা দেশের মানুষ বিএনপির ওপর ভরসা রাখে। উখিয়া-টেকনাফের মানুষ নাফ নদী ও পাহাড়ে যেতে পারছে না। এসব সমস্যার সমাধান বিএনপি ছাড়া আর কেউ করতে পারবে বলে জনগণ মনে করে না। যোগ্যতার কারণে মানুষ বিএনপি ও ধানের শীষকে বেছে নিয়েছে। আমি দেখছি, ভোটাররা অঙ্গীকারবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। উখিয়া-টেকনাফে বিএনপির বড় সংগঠন রয়েছে। আমার নেতাকর্মীরাই আমার জন্য ভোট করবে। ভোট কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। কেউ কারচুপির চেষ্টা করলে পরিস্থিতি রক্তক্ষয়ী হতে পারে।
শাহজাহান চৌধুরী বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলেই আমি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যেন বিশ্ব দেখতে পায় বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আমি ভোট ডাকাতি করে এমপি হইনি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র তেমন দেখছি না। তবে টাকার বিনিময়ে ভোট দেওয়া একটি অপরাধ, সেটিও বন্ধ হওয়া উচিত।

অন্যদিকে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত জামায়াতের প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনের জন্য আমরা প্রার্থী ও কর্মীরা আমাদের মতো প্রস্তুতি নিয়েছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের মতো প্রস্তুত। তবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হবে কিনা এবং শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু ভোট হবে কিনা, তা নিয়ে আমাদের পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কিছু কেন্দ্রের তথ্য আমরা সরকারকে দিয়েছি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এমন তথ্য দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিক হলে সুষ্ঠু ভোট আশা করা যায়। তবে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দূর করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা উল্লেখ করে নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, এখানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ আছে। খুন, গুমসহ নানা অপরাধ ঘটছে। যেকোনো সময় আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে। তাই সরকার ও প্রশাসন যেন উখিয়া-টেকনাফে বিশেষ নজর দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা নেয়।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান জানান, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সব ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী ও উলুচামরি এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে আনোয়ার প্রকাশ লেড়ায়া ডাকাতের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী একাধিক ফাঁকা গুলি ছুড়ে। পরে নৌবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
জনতার আওয়াজ/আ আ