উথাল-পাথাল রাজনীতিতে নতুন দল-প্ল্যাটফর্মের হিড়িক - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ১:১১, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

উথাল-পাথাল রাজনীতিতে নতুন দল-প্ল্যাটফর্মের হিড়িক

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১, ২০২৬ ৫:৪৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১, ২০২৬ ৫:৪৪ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে দেশজুড়ে উথাল-পাথাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দল ও প্ল্যাটফর্ম গঠনের হিড়িক দেখা দেয়। গত দেড় বছরে অন্তত ৩০টি নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে। এ সময়ে প্রায় ১০টি নতুন রাজনৈতিক সংগঠন বা প্ল্যাটফর্ম জনসমক্ষে এসেছে। তবে সব দল নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায়নি। অনেক দল আবার সরাসরি নির্বাচনে অংশও নিচ্ছে না।

আকস্মিকভাবে নতুন দল ও প্ল্যাটফর্মে গড়ে তোলার হিড়িক দেশজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। নিউক্লিয়াস পার্টি অব বাংলাদেশ, জনপ্রিয় পার্টি, জাগ্রত পার্টি, আমজনতার দল, আ-আম জনতা পার্টিসহ একাধিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অধিকাংশ নতুন দলের নাম, ঠিকানা ও কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছিল বছরজুড়ে। বেশির ভাগ দলের নাম অনেকেই ভালোভাবে জানে না। দলগুলোর ঠিকানাও ভুলে ভরা। লেখা ঠিকানায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কারও বাসভবন বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর আত্মপ্রকাশ করা নতুন দল ও প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য ভোট ও ক্ষমতা। অনেক দলের কার্যক্রমে ব্যক্তিস্বার্থের ছাপ স্পষ্ট। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দলগুলোর কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং কোনো কোনো দলের এক নেতাই ক্ষমতার স্বাদ ও নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের একাংশ পরবর্তী সময়ে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই শিক্ষার্থীদের উদ্যোগেই পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় এনসিপি। শুরুর দিকে দলটির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে। এনসিপি দল হিসেবে ইসিতে নিবন্ধনও পেয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতারা শুরু থেকে বলে আসছিলেন তারা ৩০০ আসনে একক প্রার্থী দেবেন। সেই লক্ষ্যে প্রায় ১৫ শ মনোনয়নপত্র বিক্রি করে এনসিপি। এর মধ্যে ১২৫টি আসনে দলীয় প্রার্থীও ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে রাজনৈতিক নানা সমীকরণে এনসিপিও জোটবদ্ধ হয়েছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপি আসন সমঝোতা করেছে। এ নিয়ে দলের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে দলের একাধিক প্রার্থী ও নেতা-নেত্রী পদত্যাগ করেছেন। এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের ৩০টি নির্বাচনি আসন সমঝোতার কথা জানা গেছে।

নতুন দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘অপরাজেয় বাংলা’। গত ২২ ডিসেম্বর একুশে পদকপ্রাপ্ত আহমেদ ইকবাল হায়দারকে চেয়ারম্যান করে দলটি বিভিন্ন ধর্ম, পেশা ও ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের চেতনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। দলটিতে ১১ সদস্যের ভাইস চেয়ারম্যান, ২৪ সদস্যের স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং ৭১ সদস্যবিশিষ্ট সেন্ট্রাল এক্সিকিউটিভ কমিটি রয়েছে। তবে সারা দেশে উল্লেখযোগ্য শাখা কমিটি নেই দলটির।

‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ নামে আরেকটি নতুন দল নিয়ে বছর রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল আলোচনা। দলের স্লোগান ‘গড়বো মোরা ইনসাফের দেশ’। এই দলের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এবং মহাসচিব সাংবাদিক শওকত মাহমুদ।

১৭ এপ্রিল আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি। যার প্রধান ডেসটিনির মোহাম্মদ রফিকুল আমীন। ১২ বছর কারাভোগের পর গত ১৫ জানুয়ারি জেল থেকে বের হওয়ার তিন মাসের মাথায় নতুন এই দল নিয়ে হাজির হন তিনি। কিন্তু ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত রফিকুল আমীনের হঠাৎ রাজনীতিতে নাম লেখানোর কারণ কী? তা নিয়ে তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা ছিল।

অন্য নতুন দলগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি, নিউক্লিয়াস পার্টি অব বাংলাদেশ (এনপিবি), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক পার্টি, ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি, সমতা পার্টি, বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি, সার্বভৌমত্ব আন্দোলন, বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি, বাংলাদেশ মুক্তির ডাক ৭১, বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি (বিজিপি), জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ, দেশ জনতা পার্টি, আমজনতার দল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শক্তি, বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএসডিপি), বাংলাদেশ জন-অধিকার পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি, জনতার বাংলাদেশ পার্টি, জনতার দল, গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি ও অন্যরা।

তবে সব দলের পক্ষে নিবন্ধন অর্জন সম্ভব হয়নি। নতুন দল হিসেবে নিবন্ধন পেয়েছে– বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), ‘জনতার দল’ ও ‘আমজনতার দল’। দলটির সদস্যসচিব তারেক রহমান গত নভেম্বরে নিবন্ধন না পেয়ে ইসির সামনে ১৩৪ ঘণ্টা অনশন করেছিলেন।

এদিকে সরকার পতনের পর ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এবং ‘জাতীয় নাগরিক কমিটির’ একাংশের নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে নতুন ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) আত্মপ্রকাশ করে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত সংগঠনটির উল্লেখযোগ্য সফলতা আসেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংগঠনের প্যানেলের ভরাডুবি হয়। এ নিয়ে সংগঠনের নেতাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা গেছে। এসব কারণে বাগছাস তৈরির আট মাসের মাথায় ২৮ অক্টোবর সংগঠন নাম পাল্টে হয়ে যায় ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’। এই জাতীয় ছাত্রশক্তিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন হিসেবে দেখা হয়।

এ ছাড়া এনসিপির দল থেকে বেরিয়ে আসা ‘ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ’ (আপ বাংলাদেশ) এখন পর্যন্ত সংগঠন হিসেবেই রয়েছে। অন্যদিকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক মুনতাসির মাহমুদকে দল থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পরে ডিসেম্বরে ‘তৃণমূল এনসিপি’ নামে অন্য একটি সংগঠন তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এই নেতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন দল ও প্ল্যাটফর্মের হিড়িককে আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে এর অধিকাংশই স্বার্থ, ক্ষমতা এবং ভোটের প্রভাব প্রয়োগের প্রতিফলন। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় জোট রাজনীতি এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব নতুন রাজনৈতিক দলের বাস্তবসম্মত কোনো প্রভাব নেই। তার মতে, এসব দল এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দলের পেছনে একজন ব্যক্তিরই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে নীতিহীন চর্চা এমনিতেই বিদ্যমান। এই ধরনের দলগুলো সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। এসব দলে আদর্শ বা সংগঠনের শক্ত ভিত্তির চেয়ে ব্যক্তির পরিচিতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রবণতাই বেশি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু রাজনীতিতে এর কোনো দৃশ্যমান ‘ইমপ্যাক্ট’ তৈরি হয় না।

ক্ষমতার স্বাদ পেতে এভাবে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‌‘দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো সময় নতুন দল আত্মপ্রকাশ করতে পারে এবং যেকোনো ব্যক্তি বা নেতার রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরও দেশে এ ধরনের রাজনৈতিক দল গঠনের প্রবণতা দেখা গেছে। একইভাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সময়েও নতুন রাজনৈতিক দলের উত্থান লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময়েও একইভাবে রাজনৈতিক দল গঠনের ধারা অব্যাহত রয়েছে।’

অধ্যাপক মামুন বলেন, ‘অতীতেও দেখা গেছে– এসব নতুন দল বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা করেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই দলগুলো আসলে জনগণের অধিকার রক্ষায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে এবং তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম কতটুকু সফল হবে?’খবরের কাগজ

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ