একাদশ সংসদে আইন প্রণয়নে সময় কম, প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা ও অন্য দলের সমালোচনায় অধিক সময় - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ২:৩৬, রবিবার, ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

একাদশ সংসদে আইন প্রণয়নে সময় কম, প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা ও অন্য দলের সমালোচনায় অধিক সময়

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, অক্টোবর ২, ২০২৩ ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, অক্টোবর ২, ২০২৩ ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

 

নিউজ ডেস্ক

জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নে সংসদীয় কার্যক্রমের মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সময় ব্যয় করেছে। অন্যদিকে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রশংসায় ব্যয় করেছে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ সময়। এ ছাড়া অন্য দলের সমালোচনায় ব্যয় করেছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ সময়। গতকাল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। টিআইবি ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম থেকে ২২তম অধিবেশন নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এই সময়কালে সংসদের কার্যক্রমের মোট ৭৪৪ ঘণ্টা ১৩ মিনিট সময় ব্যয় হয়। এ বিষয়ে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পেরেছে এমন বলার সুযোগ নেই। বিরোধী দল পরিচয়ধারী যে দলটি এখন আছে, তারা আগের তুলনায় কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা সার্বিকভাবে আত্মপরিচয়ের সংকটে ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় ব্যয় প্রায় ১৯.৮ শতাংশ সময়: টিআইবি’র হিসাবে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ সময় ব্যয় করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রশংসায়। ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ সময় ব্যয় করেছেন সরকারের অর্জন নিয়ে কথা বলে।

এ ছাড়া বর্তমান সরকারের বিভিন্ন অর্জন এবং প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসায় ব্যয় হয়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ সময়।
অন্য দলের সমালোচনায় ব্যয় প্রায় ১৮ শতাংশ সময়: সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ সময়। অন্যদিকে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় করেছেন অন্য দলের সমালোচনায়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু ও মুজিববর্ষ নিয়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, স্বাধীনতা ও অর্ধশত বার্ষিকীর জন্য শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং ধন্যবাদ ও প্রারম্ভিক বক্তব্যের জন্য ব্যয় করেছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সময়।

আইন প্রণয়নে সময় ব্যয় মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ: জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নে সংসদীয় কার্যক্রমের মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সময় ব্যয় করেছে। টিআইবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯-২০ সালে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট আইন প্রণয়নে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ সময় ব্যয় করেছে এবং ২০১৮-১৯ সালে ভারতের সপ্তদশ লোকসভায় এটি ছিল ৪৫ শতাংশ।

কোরাম সংকটে ব্যয় ৮৯.২৮ কোটি টাকা: একাদশ সংসদ কোরাম সংকটে মোট ৫৪ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। যা প্রতি কার্যদিবস অনুযায়ী গড় প্রতি ১৪ মিনিট ৮ সেকেন্ড। অধিবেশন শুরুর তুলনায় বিরতি পরবর্তী সময়ে কোরাম সংকটের আধিক্য লক্ষণীয় ছিল। ৮৪ শতাংশ কার্যদিবসে নির্ধারিত সময় হতে বিলম্বে শুরু হয়। কোরাম সংকটে মিনিট প্রতি ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। আর কোরাম সংকটে ব্যয়িত সময়ের প্রাক্কলিত অর্থমূল্য প্রায় ৮৯ কোটি ২৮ লাখ ৮ হাজার ৭৭৯ টাকা। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের মোট সদস্য ৩৫০ জন। ন্যূনতম ৬০ সদস্যের উপস্থিতিতে সংসদের কোরাম পূর্ণ হয়। কোরাম পূর্ণ না হলে সংসদের বৈঠক চালানো যায় না।

রাষ্ট্রপতির ভাষণে বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় ব্যয়: বছরের প্রারম্ভিক ৫টি অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ পাঠে ব্যয় ৪ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট, যা সংসদ কার্যক্রমের মোট ব্যয়িত সময়ের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ভাষণে সরকারের অর্জন বিষয়ক আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছে। সরকারের অর্জন নিয়ে ব্যয়িত সময়ের পরিমাণ ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ। শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ও প্রারম্ভিক বক্তব্যের জন্য ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, বঙ্গবন্ধু ও মুজিববর্ষ নিয়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দিক নির্দেশনা নিয়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

বিধি অনুযায়ী হয়নি স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম: বিধি অনুযায়ী প্রতিটি (৫০টি) কমিটির প্রতিমাসে ন্যূনতম ১টি করে সভা করার নিয়ম থাকলেও কোনো কমিটিই প্রতিমাসে ন্যূনতম ১টি করে সভা করার নিয়ম পালন করেনি। ন্যূনতম নির্ধারিত সভা সংখ্যার ৬৬.১% সভাই অনুষ্ঠিত হয়নি। এ ছাড়া সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দল হতে সভাপতি রয়েছেন ৪টি কমিটিতে। ১৭টি কমিটিতে বিরোধীদলীয় কোনো সদস্য নাই। দশম সংসদের কয়েকজন মন্ত্রীকে একাদশ সংসদে একই মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে সদস্য ও সভাপতি হিসেবে রাখা হয়েছে।

পিটিশন কমিটির মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ থাকলেও প্রচারণার ঘাটতির কারণে তা কার্যকর নয়। সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহি করা এবং সার্বিকভাবে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি করা প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর ছিল না।

জন গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে গৃহীত ও অগৃহীত নোটিশের ওপর আলোচনা: এই পর্বে মোট ব্যয়িত সময় ২১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট যা সংসদ কার্যক্রমের মোট ব্যয়িত সময়ের ২ দশমিক ৯ শতাংশ। নির্ধারিত কর্মসূচির ৮ দশমিক ১ শতাংশ কার্যদিবসে কার্যক্রম স্থগিত হয়েছে। ৭ম এবং ৯ম থেকে ২১তম অধিবেশনে অর্থাৎ, মোট ১৪টি অধিবেশনে এই পর্ব সরাসরি অনুষ্ঠিত হয়নি।

জনপ্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা: প্রধান বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য কর্তৃক সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা লক্ষণীয় হলেও বাকি সদস্যরা এক্ষেত্রে অনেকাংশে নীরব ভূমিকা পালন করেছে। বিরোধীদল সমূহের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন না থাকায় সরকারকে জবাবদিহি করার ক্ষেত্র আরও সীমিত হয়ে গেছে। ক্ষেত্র বিশেষে প্রধান বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যে অন্যান্য বিরোধী দলের পর্যালোচনা ও সমালোচনা প্রাধান্য পেয়েছে, যা প্রধান বিরোধী দলের দ্বৈত ভূমিকা ও পরিচয়কে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

সংসদীয় কার্যক্রমে সদস্যদের দায়িত্বশীলতা ও দক্ষতার ঘাটতি: সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্যদের প্রস্তুতির ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়, যেখানে প্রস্তুতি না থাকার কারণে প্রস্তাব উত্থাপন না করা, প্রশ্নোত্তর পর্বে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে তথ্য প্রদান করা ইত্যাদি লক্ষ্য করা গেছে। নোটিশ দিয়ে একাধিক কার্যদিবসে অনুপস্থিত থাকার কারণে নোটিশ বারবার স্থগিত হওয়া, সংশোধনী অনুত্থাপিত থাকা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে অন্য মন্ত্রীর দায়সারা উত্তর প্রদান, একজনের নোটিশ অন্যজন উপস্থাপন করতে গিয়ে জটিলতার সৃষ্টি ও সময়ক্ষেপণ করতেও দেখা গেছে। দুটি পর্বে কণ্ঠভোটের সময় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য নিজদলের বিপক্ষে ভোট প্রদানের পর স্পিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করায় দ্বিতীয় দফায় ভোটে নিজ দলের পক্ষে ভোট প্রদান করেন যা কার্যক্রমে অমনোযোগী থাকাকে নির্দেশ করে। বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্যদের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতিও লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে এক কার্যক্রমে অন্য কার্যক্রমের বিষয় উত্থাপন, প্রস্তাব উত্থাপনের ক্রম ভুল করা, বক্তব্য পেশ করতে না পারা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য উদ্যোগের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে সংসদ কর্তৃক আয়োজিত মোট ২৮টি প্রশিক্ষণের মধ্যে ২টি প্রশিক্ষণ ছিল সংসদ সদস্যদের জন্য।

বিধি বহির্ভূত আচরণ লক্ষ্য করা গেছে: সংসদ সদস্যদের একে অপরের প্রতি এবং সার্বিকভাবে সুশীল সমাজের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে বিধি বহির্ভূত আচরণ লক্ষ্য করা যায়। বিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কোনো কোনো নারী সদস্যদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক এবং আপত্তিকর শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। বিরোধী দলের তুলনায় সরকারি দলের সদস্যদের ক্ষেত্রে এই ব্যত্যয় অধিক মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়েছে।
বাজেট কার্যক্রমে ব্যয় ১৯ দশমিক ২ শতাংশ: বাজেট কার্যক্রমে ব্যয়িত সময় ১৪২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট, যা সংসদ কার্যক্রমের মোট ব্যয়িত সময়ের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ এবং নির্ধারিত বাজেট অধিবেশনের ব্যয়িত সময়ের ৬০ শতাংশ। বাজেট কার্যক্রমে ব্যয়িত সময়ের ৮০ দশমিক ১ শতাংশ সময় ব্যয় হয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায়, ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ সময় ব্যয় হয় মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় এবং ৪ দশমিক ১ শতাংশ সময় ব্যয় হয় বাজেট উপস্থাপনে। বাজেট আলোচনায় ব্যয়িত সময়ের ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ সময় ব্যয় হয় বাজেট সংক্রান্ত আলোচনায় এবং বাকি সময় ব্যয় হয় অন্যান্য আলোচনায়, দলের প্রশংসা এবং অন্য দলের সমালোচনায়। ‘অর্থবিল ২০১৯’ পাস হতে সময় লাগে ৪ ঘণ্টা ০৬ মিনিট এবং বাকি ৩টি অর্থবিল পাস হতে গড়ে ১ ঘণ্টা ২১ মিনিটের মতো সময় ব্যয় হয়। নির্দিষ্টকরণ বিলগুলো পাস হতে গড়ে ৫ মিনিটের মতো সময় ব্যয় হয়।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পেরেছে, এমন বলার সুযোগ নেই। সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও কার্যকর বিরোধী দলের অভাবের কারণে মূলত সংসদ প্রত্যাশিত মাত্রায় ভূমিকা রাখতে পারেনি। ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংসদের কার্যকর ভূমিকার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা। সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি বন্ধ হয়েছে। কিন্তু এজন্য অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। কারণ, এখন বাস্তব বিরোধী দলবিহীন সংসদ। বিরোধী দল পরিচয়ধারী যে দলটি এখন আছে, তারা আগের তুলনায় কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা সার্বিকভাবে আত্মপরিচয়ের সংকটে ছিল। ফলে বিরোধী দলের প্রত্যাশিত ভূমিকা দেখা যায়নি।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ