এগারো বছর ধরে অন্যরকম এক লড়াই করছেন তাহসিনা রুশদীর লুনা - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ২:১৬, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

এগারো বছর ধরে অন্যরকম এক লড়াই করছেন তাহসিনা রুশদীর লুনা

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, জুলাই ২১, ২০২৩ ১২:১২ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, জুলাই ২১, ২০২৩ ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

 

নিউজ ডেস্ক

এগারো বছর ধরে অন্যরকম এক লড়াই করছেন তাহসিনা রুশদীর লুনা। রাজনীতিক স্বামী এম. ইলিয়াস আলী ‘গুম’ হন ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল। শুরুতে নিখোঁজ স্বামীর সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন বিভিন্ন স্থানে। ছোট তিন সন্তানকে মানুষ করার কঠিন এক চ্যালেঞ্জ আসে সামনে। বাধ্য হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রারের চাকরি ছেড়ে দিতে হয় তাকে। যে রাজনীতির ঘৃণ্য ছোবলে তছনছ হয় তার সাজানো সংসার সেই রাজনীতিকেই এখন প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। তিন সন্তানকে মানুষ করার পুরো দায়িত্ব পালন করার পাশপাশি তিনি পুরো দস্তুর একজন রাজনীতিবিদ। ইলিয়াস আলীর নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের অভিভাবক হয়ে কাজ করছেন। দায়িত্ব পালন করছেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে। মানবজমিন-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের নানামুখী সংগ্রামের কথা জানিয়েছেন তিনি।

লুনা বলেন, সবার দৃষ্টিতে আমরা এখন ভিন্ন।

আমাদের পরিচয় গুম পরিবারের সদস্য। সন্তানদের সবাই জিজ্ঞেস করে- তাদের বাবা কোথায়? তারা তখন ভাষা হারিয়ে ফেলে। তার কোনো খবর পেয়েছি কিনা?
লুনা জানান, তার দুই পুত্র প্রবাসে। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে দিন কাটছে। বাবাকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না সন্তানদেরও। দীর্ঘ ১১ বছরে শুকিয়ে গেছে তার চোখের পানি। কাঁদতেও ভুলে গেছেন তিনি। সেই সঙ্গে শরীরে বাসা বাঁধছে নানাবিধ রোগ।

লুনা বলেন, কষ্ট হয় কিন্তু সন্তানদের সামনে কাঁদতে পারি না। এতোটি বছর যেভাবে কাটার কথা সেভাবে নিঃসন্দেহে কাটছে না। একটা পরিবারের কর্তা, সন্তানদের বাবা-অভিভাবক, উপাজর্নক্ষম ব্যক্তি যদি না থাকে তাহলে সেই সংসারে সমস্যা ছাড়া কিছুই থাকে না। সবচেয়ে বড় কথা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা, তারপর আর্থিক সমস্যা তো থাকেই। আমার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পরে আমরা তার ব্যাংক বা কোনোকিছু ব্যবহার করতে পারি না। আগে আমি চাকরিতে ছিলাম সেখান থেকে কিছু টাকা আয় হতো। কিন্তু সেই চাকরিও গত জাতীয় নির্বাচনের সময় আমি ছেড়ে দিয়েছি। বিভিন্ন্ আত্মীয়-স্বজন ও অন্যদের সহযোগিতায় সন্তানদের বড় করেছি। তবে তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে বড় করতে পারিনি। খানিকটা কষ্টের মধ্যে বড় করতে হয়েছে। এমন সময় পার করেছি যেখানে আর্থিক সমস্যা, নিরাপত্তাজনিত সমস্যা এবং সামাজিক সমস্যা তো রয়েছেই।

তিনি বলেন, আমার ছেলে-মেয়ে স্কুল বা বাইরে কোথাও গেলে মানুষের বিভিন্ন প্রশ্ন তাদের বিব্রত করে। কোনো পাবলিক প্লেসে গেলে মানুষ অনেক কিছু বলে। আবার কারও কারও তাকানোটাই অন্যরকম। মানুষ বলে এইতো অমুকের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে। এই ব্যাপারটি আসলে অন্যরকম। আমাদের পরিচয়টি আসলে এমন হয়েছে যে, আমরা একটি গুম পরিবারের সদস্য। এখন তো সন্তানরা বড় হয়ে গেছে।

মানুষ বলে কোনো খবর পেয়েছি কিনা? কি বলবো আমি? সরকারের উপর মহল পর্যন্ত যোগাযোগ করেছিলাম আসলে কোনো ফলাফল পাইনি। এবং সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের রেসপন্স পাইনি। এই পর্যন্ত দেখিনি তারা নিঁখোজের বিষয়টি নিয়ে কোনো তদন্ত করছে বা কাউকে এরেস্ট করা হয়েছে। না কাউকে ধরে নিয়ে জেরা করা হয়েছে। তাকে পাওয়ার আশায় দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গিয়েছি আমরা। বিভিন্ন জন বিভিন্ন সময় ফোন করে বলেছে এখানে পাওয়া গেছে, সেখানে পাওয়া গেছে। যখন এটা নিয়ে আগানোর চেষ্টা করেছি তখন দেখা গেছে সেগুলো কিছুই না, মিথ্যা। তাকে খুঁজে বের করবেন এবং চেষ্টা করবেন এতোটুকু বলে প্রধানমন্ত্রী আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন।

লুনা বলেন, এই সরকারই গুম শব্দটির সঙ্গে মানুষকে পরিচিত করেছে। এই আমল থেকেই আমরা জানি গুম আসলে কি। গুম শব্দটি নিয়ে মানুষের মাঝে এতো বেশি ক্লিয়ার ধারণা ছিল না। আগে যেটি হয়েছে সেটি আসলে সন্ত্রাসী কর্তৃক হয়েছে। কিন্তু এতো বড় একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা যে একজন সংসদ সদস্য বা এতো বড় একজন নেতা তার মতো একজন লোককে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে- এটি আসলে অস্বাভাবিক। সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত। মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? গুম বিষয়টি তো সরকার স্বীকারই করতে চায় না। তারা সমস্ত দিবস পালন করে কিন্তু এই গুম দিবস পালন করতে তারা রাজি না। এটি দ্বারা বোঝা যায় এর সঙ্গে তারা জড়িত।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো গুমের বিষয়টি তদন্ত করছে না। শুধু মুখে বলছে। ওই সময় আমরা একটা রিট করেছিলাম হাইকোর্টে। তার আগে থানায় জিডি করেছিলাম। সেখান থেকে অর্ডার দিয়েছিল থানাকে ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করে দিতে। দুই-তিন মাস পরে বলে আমরা খুঁজছি এটা সেটা। এখন একেবারে এই বিষয়টি চাপা পড়ে আছে। তারা কোনো ধরনের রিপোর্ট ও কিছু বলেও না।

লুনা বলেন, গুম হওয়ার ৫ থেকে ৭ বছর ধরে বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বেশ নজরদারিতে রেখেছে আমাদের। বাসার নিচে সবসময় দেখা যেতো। কোনো তথ্য নিয়ে আমি কোথাও যাচ্ছি না যাচ্ছি সেটি ফলো করে। এয়ারপোর্টে গেলেও সেটি ছিল। এয়ারপোর্টে আটকে দিয়েছিল দুইবার। এরপর বিভিন্ন সাইড থেকে বলা আছে আমি যেন কথা না বলি। কোথাও কোনো বক্তব্য না দেই। আগে পুলিশ এসে বাসার নিচে সবসময় বলতেন গেট খোলেন সার্চ করবো, এটা সেটা আরও কত কি। এই ঘটনায় তদন্তে আমরা আসলে পুলিশের কোনো সাহায্যে পাইনি।

লুনা বলেন, তার (ইলিয়াস আলী) সন্ধান পাওয়া এখন আর সরকারের আশ্বাস নয়, নিজের মনের বিশ্বাস নিয়ে আছি। তার কোনো নেগেটিভ বা পজিটিভ কোনো খবরই পাইনি। সেই জায়গা থেকে আশায় আছি। সরকার পরিবর্তন হলে হয়তো তাকে ফিরে পাবো।
লুনা বলেন, বড় ছেলে আবরার ইলিয়াস অর্ণব লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেছে। মাঝে মাঝে তার বাবার নির্বাচনী এলাকা সিলেটের বিশ্বনাথে যায়। ছোট ছেলে সায়ার লাবিব উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে আছে। একমাত্র মেয়ে সায়ারা নাওয়াল এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। আমি নিজে রাজনীতিতে সক্রিয় আছি। এই বিষয়ে বড় ছেলে আমাকে সাপোর্ট করে। সুযোগ এলে সেও রাজনীতিতে যাবে। যেহেতু তার বাবা রাজনীতি করতেন সেহেতু তারও চিন্তা হতে পারে। আমার শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিস, কিডনিতে সমস্যাসহ নানা সমস্যায় ভুগছি।

তিনি বলেন, সন্তানদের কিছুতো আসলে বলার নেই। বাবাকে নিয়ে কষ্ট পেলেও আমার সামনে কিছু বলতে চায় না। তারা জানে আমি কষ্ট পাবো। এখন যে কেউ এটি বললে আমার প্রচণ্ড কষ্ট লাগে। আমি সবসময় চাই এর বাইরে থাকতে। এখন মন কাঁদলেও চোখে পানি আসে না। এ ঘটনাটি নিয়ে আমি কোনোভাবে স্বাভাবিক হতে পারি না। মনে পড়লে সারা রাত ঘুম হয় না।
তিনি বলেন, তার স্বাভাবিক মৃত্যু হলে মনকে বোঝাতে পারতাম। কিন্তু আমার তো জানতে হবে এই মানুষটির কি হয়েছে? কোথায় আছে? নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।
সূত্রঃ মানবজমিন

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ