কক্সবাজারের নাজিরারটেক ডুবন্ত ট্রলারে পাওয়া ১০ লাশ নিয়ে রহস্য - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৯:৫০, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

কক্সবাজারের নাজিরারটেক ডুবন্ত ট্রলারে পাওয়া ১০ লাশ নিয়ে রহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৩ ২:২২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৩ ২:২২ অপরাহ্ণ

 

কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক উপকূলে ভেসে আসা একটি ট্রলার থেকে ১০ জনের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। নিহতরা জেলে নাকি ডাকাত, তা নিয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। প্রাথমিকভাবে পুলিশের দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। নিহতদের পরিচয় প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছে সিআইডি। তবে ডিএনএ পরীক্ষার পর তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটি।

সিআইডি কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. শাহেদ মিয়া বলেন, এরই মধ্যে নিহতদের প্রাথমিক পরিচয়ও শনাক্ত হয়েছে। তবে মুখ ও শরীরের অবয়ব বিকৃত হওয়ায় কোনটি কার লাশ তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তাই নিহতদের ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল এলে বোঝা যাবে কোনটি কার লাশ। এরপর আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।


এর আগে গত রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে মাছ ধরার ট্রলারের কোল্ডস্টোর থেকে লাশগুলো উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সদস্যরা। নিহতদের সবাই মহেশখালী ও চকরিয়া উপজেলার বাসিন্দা। নিহতদের মধ্যে ট্রলারের মালিক সামশুল আলমও রয়েছেন। বাকিরা হলেন শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে সাইফুল ইসলাম, জাফর আলমের ছেলে শওকত উল্লাহ, মুসা আলীর ছেলে ওসমান গনি, চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের কবির হোসাইনের ছেলে সাইফুল ইসলাম, শাহ আলমের ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহান, চকরিয়া পৌরসভার চিরিঙ্গা এলাকার জসিম উদ্দীনের ছেলে তারেক জিয়া, সাহাব মিয়ার ছেলে সাইফুল্লাহ, মোহাম্মদ আলীর ছেলে পারভেজ মোশাররফ ও মোহাম্মদ হোসাইনের ছেলে নুরুল কবির।

এদিকে মহেশখালীতে নিহতদের পরিবার এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, চিহ্নিত জলদস্যু নুরুল কবির, নজরুল, মাহবুব এবং কালা জাহাঙ্গীর মিলে ঈদের আগে কয়েকবার সাগরে ডাকাতি করেছেন। তারা সবাই চিহ্নিত জলদস্যু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণকারী ছিলেন।

তথ্য বলছে, গেল ৭ এপ্রিল সাগরে মাছ ধরতে যায় হোয়ানকের ছনখোলা পাড়া এলাকার শামসু বহদ্দারের ফিশিং ট্রলারটি। কিন্তু এর ২-৩ দিন পরও তাদের খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার। কয়েকদিন পর এলাকায় প্রচার হয়,

সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে একটি ট্রলার ডাকাতের কবলে পড়েছে। মাঝিমাল্লার হাত-পা বেঁধে মারধর করে বোটটি ডুবিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

খবরটি জানাজানি হলে মাছ ধরতে যাওয়া ওই ফিশিং বোটের ১৯ জন জেলে নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি করে তাদের পরিবার। পরে ১৬ এপ্রিল তাদের মধ্যে নজরুল ও মাহবুবসহ ৮ জন এলাকায় ফিরে আসেন। এর দুদিন আগে সাগর থেকে মাছ নিয়ে ফেরেন কালামরছাড়ার চিহ্নিত জলদস্যু কালা জাহাঙ্গীর। তবে তাদের সহযোগী নুরুল কবির ফিরে আসেননি। গত রোববার ১০ জনের সঙ্গে তার মরদেহও ছিল। অথচ নজরুল এবং মাহবুব আলমের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে তাদের পরিবার পত্রিকায় নিখোঁজের সংবাদ প্রচার করেন। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে।

এ ঘটনায় জিজ্ঞাসবাদের জন্য আগে ফেরা ছয়জন ও মাতারবাড়ী এলাকার বাইট্টা কামাল ও নুর হোসাইনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনরা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো সংস্থা বিষয়টি স্বীকার করেনি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। হয়তো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনেককে আটক করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আমার কাছে তথ্য নেই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা। তাদের শনাক্ত করা গেলে দ্রুত সময় আমরা ক্লু-বের করতে পারব। তবে বিভিন্ন দিক থেকে আসা তথ্যগুলো আমরা পর্যালোচনা করছি। আর যেসব তথ্য গুরুত্ব দেওয়ার সেগুলো গুরুত্ব দিচ্ছি।

নিহত ওসমানের বাবা মুসা আলী বলেন, শামলাপুরের নুরুল কবির আমার ছেলেসহ ৫ যুবককে ট্রলারে মাছ ধরার কথা বলে সাগরে নিয়ে যায়। আমরা জানতাম না। নুরুল কবির এলাকায় একজন চিহ্নিত জলদস্যু।

ওসমানের চাচা মোস্তফার দাবি, নিখোঁজের পরে আমরা মহেশখালী থানায় অভিযোগ করতে যাই। কিন্তু থানা অভিযোগ আমলে নেয়নি।

সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের দেওয়া তথ্যের বরাতে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাগরে ডাকাতির খবর শুনে ডাকাত দলকে ধাওয়া করতে যাওয়া ট্রলারের মধ্যে রয়েছে মাতারবাড়ীর বাইট্টা কামাল, নুর হোসাইন বহদ্দার, আবছার মাঝি এবং মাতারবাড়ীর বাবুল মাঝির মালিকানাধীন ট্রলার।

কোনাখালীর নিখোঁজদের স্বজন আবুল হোছেন ও হারুন জানান, নিখোঁজের ঘটনা প্রচার হওয়ার পর নিহত সাইফুলের ফোনে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় অন্যপ্রান্ত থেকে তার স্ত্রীকে বলা হয়, সাইফুলের ফাতিহা দিয়ে ফেলেন এবং আপনি অন্য একজনকে বিয়ে করে সংসার করেন। এর পর থেকে কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় চকরিয়া থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয় বলে দাবি করেছেন তারা।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. মাহফুজুল ইসলাম জানান, মহেশখালী ও চকরিয়া থেকে নিখোঁজদের পরিবারের আত্মীয়-স্বজনরা কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে এসে ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত করেছেন। তবে ডিএনএ পরীক্ষার পর নিজ নিজ পরিচয় শনাক্ত হলে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।

পুলিশ সুপার বলেন, ১০ লাশ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬ জনের মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। চারজনের মরদেহ মর্গে রয়েছে।

জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, নিহত ১০ জন জেলে ছিলেন। তবে প্রাথমিক তদন্তে তাদের নানা অপরাধেও সম্পৃক্ত থাকার তথ্য মিলেছে। তারা পাচারের শিকার হয়ে খুন হন বা পাচার করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হতে পারেন। এর বাইরেও অন্য কারণ থাকতে পারে। সব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত চলছে।

এদিকে সোমবার দুপুরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে এসে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন ও সিআইডির ডিআইজি হাবিবুর রহমান। এ সময় আনোয়ার হোসেন বলেন, দশ লাশের মধ্যে চারজনকে তাদের আত্মীয় শনাক্ত করতে পেরেছে। লাশগুলো ডিকম্পোসড হয়ে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারেনি। আমরা চেষ্টা করছি সেগুলো শনাক্ত করতে। ডিএনএ সাপোর্ট দিয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলিয়ে লাশগুলো শনাক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, এখনো পর্যন্ত আমরা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না কীভাবে এ ঘটনাটি ঘটেছে বা করা ঘটিয়েছে। আমাদের তদন্ত টিম কাজ করছে। ঢাকা থেকে সিআইডি এবং পিবিআইর স্পেশাল টিম এসেছে। তারাও কাজ করছে। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাগরে যারা জলদস্যুতার সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনারও চেষ্টা করা হচ্ছে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার কালবেলাকে জানান, ঘটনাটি গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই ছায়াতদন্ত করছে। ঢাকা থেকে তাদের একজন ডিআইজির নেতৃত্বে তদন্তকারী দল কক্সবাজার অবস্থান করছেন।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ