কুষ্টিয়া-১ আসন: দৌলতপুরে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২৫ ৪:৩৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২৫ ৪:৩৮ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
সীমান্তবর্তী উপজেলা দৌলতপুর নিয়ে জাতীয় সংসদের কুষ্টিয়া-১ আসন। আয়তনের দিক থেকে কুষ্টিয়া জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা এটি। ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে এটি গঠিত। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম দৌলতপুর উপজেলার সর্বত্র। কে হবেন এবারের সংসদ সদস্য তা নিয়ে চায়ের কাপে যেন এক ধরনের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪ হাজার ৪৭১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ১ হাজার ৩ জন। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ৪৬৭ জন।
এবারের ভোটের মাঠে সবচেয়ে বড় শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়াতাবাদী দল বিএনপি। এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং মনোনয়নসংক্রান্ত বিরোধের কারণে দলের ভেতরে দেখা দিয়েছে বিভক্তি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত এই আসনের দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী।
দলীয়ভাবে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিনি সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত আহসানুল হক পচা মোল্লার ছেলে।
রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লার মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই তা বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি চালিয়ে আসছেন দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফ উদ্দিন জুয়েলের কর্মী-সমর্থকরা। প্রতিদিনই তারা মিছিল, সমাবেশ, গণসংযোগ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন। সমর্থকদের দাবি, গত ১৬ বছর দলের দুঃসময়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে জুয়েলের নামে ৩১৭টি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে। দৌলতপুর উপজেলাকে সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জুয়েলের বিকল্প নেই।
বর্তমানে দৌলতপুর উপজেলায় বিএনপি কয়েকটি ধারায় বিভক্ত। উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা একটি ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই বলয়ের বেশ কিছু নেতা-কর্মী, বাচ্চু মোল্লার ভাই ও ছেলে শিশির মোল্লার বিরুদ্ধে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে চাঁদাবাজিসহ পদ্মার চর এবং সীমান্ত এলাকায় নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে।
দ্বিতীয় ধারাটির নেতৃত্বে আছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লা। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ অবৈধ সিগারেট তৈরিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ভারতে নিখোঁজ আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আনারের প্রাডো গাড়িটি যে চক্র কুষ্টিয়ায় এনেছিল, সেই চক্রের অন্যতম সদস্য বিএনপির এই নেতা।
আরেকটি ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম সরকার মঙ্গল। এ ধারার সঙ্গে উপজেলা বিএনপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা আছেন।
আরেকটি ধারার নেতৃত্বে আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফ উদ্দিন জুয়েল। ইমেজ ভালো থাকা এবং বয়সে যুবক হওয়ায় এলাকায় বেশ জনপ্রিয়তা আছে তার।
গত বছরের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতনের পর কিছু বিএনপি নেতা-কর্মীর অপকর্মে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। অপকর্ম বন্ধ করতে না পারলে একসময়ের বিএনপির ঘাঁটি জামায়াতের দুর্গে পরিণত হতে পারে। সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, দলের মধ্যে থাকা বিভেদ নিরসন করতে না পারলে বিএনপিকে এর খেসারত দিতে হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজা আহাম্মেদ বাচ্চু মোল্লা সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপি হলো বাংলাদেশের সব চেয়ে জনপ্রিয় দল। এই দলে মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকবে। দল যাকে যোগ্য মনে করেছে তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। সময় হলে সবাই মান অভিমান ভুলে একসঙ্গে কাজ করবে।’
এই আসনে জামায়াত মনোনয়ন দিয়েছে উপজেলা শাখার উপাধ্যক্ষ মাওলানা বেলাল উদ্দিনকে। দলের মধ্যে কোনো ধরনের বিরোধ না থাকায় অনেকটাই ফুরফুরে মেজাজেই তারা তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইসলামী আন্দোলন এই আসনে দলের উপজেলা শাখার সভাপতি মুফতি আমিনুল ইসলামকে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থীর নাম মাওলানা শরীফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আসাদুজ্জামান। এখান থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী নুসরাত তাবাসসুম। তিনিও বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে তার অবস্থান জানান দিচ্ছেন। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে আসনটিতে এখন পর্যন্ত ৫ বার বিএনপি, ২ বার আওয়ামী লীগ, একবার জাতীয় পার্টি এবং দুইবার আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আহসানুল হক (পচা মোল্লা) ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টি (এরশাদ) প্রার্থী সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কোরবান আলী। এরপর থেকেই আসনটি বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে, ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য হন আহসানুল হক (পচা মোল্লা)। তার মৃত্যুর পর ২০০৪ সালের উপনির্বাচনে তার ছেলে রেজা আহাম্মেদ বাচ্চু মোল্লা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলতাব হোসেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আফাজ উদ্দিন আহামেদ নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়ন পান। তবে ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও, আফাজউদ্দিনকে পরাজিত করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রেজাউল হক চৌধুরী বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ ক ম সারোয়ার জাহান বাদশা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন রেজা আহাম্মেদ বাচ্চু মোল্লা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ ক ম সারোয়ার জাহান বাদশাকে পরাজিত করেন রেজাউল হক চৌধুরী।
জনতার আওয়াজ/আ আ