কোন পথে জুলাই সনদ সংলাপেই আসুক সমাধান
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, মার্চ ১৭, ২০২৬ ৭:৪৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, মার্চ ১৭, ২০২৬ ৮:১২ পূর্বাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জুলাই সনদ’ কেবল একটি দালিলিক রূপরেখা নয়, বরং এটি ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র সংস্কারের একটি নৈতিক অঙ্গীকার। যদিও সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে যে নানামুখী বিতর্ক ও আইনি ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে, তা জনমনে কৌতূহল ও কিছুটা সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং এর অধিবেশন আহ্বান নিয়ে যে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে, তা নিরসনে দূরদর্শী ও গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
আমাদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতভেদ থাকাটা স্বাভাবিক, তবে সেই মতভেদ যেন জাতীয় গন্তব্যকে অনিশ্চিত করে না তোলে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার জুলাই সনদের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা ইতিবাচক। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো এই সনদের দ্রুত বাস্তবায়ন ও আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ে সোচ্চার। এ দুই অবস্থানের মধ্যবর্তী যে সাংবিধানিক শূন্যতা বা ব্যাখ্যার জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার মেলবন্ধন ঘটানো জরুরি বলেই মনে করি আমরা।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য বিধান করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু বিষয়টি বর্তমানে উচ্চ আদালতের আওতাধীন, তাই আইনি সুরাহার জন্য ধৈর্য ধারণ করা প্রয়োজন। তবে কেবল আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর না করে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসাবে জাতীয় সংসদেই এ বিতর্কের অবসান ঘটানো সম্ভব। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ সব অংশীজনই যেহেতু জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে, সেহেতু একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত করা যেতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাষ্ট্র আবেগ নয় বরং আইন ও সংবিধান অনুযায়ী চলে। এই অবস্থান অত্যন্ত যৌক্তিক। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোও নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব। জুলাই সনদে বর্ণিত প্রশাসনিক পুনর্গঠন, বিচার বিভাগীয় সংস্কার এবং পুলিশি সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে গড়িমসি করলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই সরকারের উচিত হবে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে সংস্কার প্রস্তাবগুলো পর্যায়ক্রমে সংসদে উত্থাপন করা।
মনে রাখা দরকার, জুলাই সনদ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, এটি একটি নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার। এই সনদ বাস্তবায়নের পথে যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। তবে তাই বলে রাজপথের আন্দোলন বা সংসদের ওয়াকআউট সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং আলোচনার টেবিলে বসে সাংবিধানিক জটিলতা নিরসনই হবে প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচায়ক। সরকার ও বিরোধী দল যদি পারস্পরিক অভিযোগের তীর ছোড়াছুড়ি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবেই জুলাই সনদের গন্তব্য হবে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত এ সংসদ ইতিহাসের দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হবে না-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
জনতার আওয়াজ/আ আ