খালেদা জিয়ার বিপ্লবী জীবনের সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫ ৩:১০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫ ৩:১০ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
দেশের প্রভাবশালী রাজনীতিক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আজ মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে দীর্ঘ অসুস্থতার পর জীবনাবসান করেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজ প্রাণ হারায়ায় ৮০ বছর বয়েসে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) — মানব ইতিহাসের এক উজ্জ্বল রাজনৈতিক অধ্যায় আজ বন্ধ হয়ে গেল।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অসাধারণ নাম। স্বাধীনতার পর থেকে দেশীয় রাজনীতিতে তিনি নানা সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন — গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় আন্দোলন, স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক পরিচয় গঠনের সংগ্রামে তাঁর অবদান গভীরভাবে স্মরণীয়।
গণআন্দোলনে ভূমিকা
বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে মানুষের স্বার্থে স্বচ্ছ ও স্বাধীন রাজনীতির জন্য বহুবার রাস্তায় নেমেছেন। বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক সমর্থন ও নেতৃত্ব দিয়েছেন।
কারাগার জীবন ও সংগ্রাম
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে তিনি বহু বছর কারাগার জীবন কাটিয়েছেন। সেই কঠিন সময়েও দলের সদস্য ও নেতাকর্মীদের পাশে থেকে নিজের আদর্শের প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছেন।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব
দেশ ও দলের স্বার্থে তিনি সবসময় আপসহীন মনোভাব বজায় রেখেছেন— বহুবিধ রাজনৈতিক সংঘর্ষ, ব্যর্থতার মোকাবিলা এবং কঠিন সময়েও নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্ত করে রেখেছেন বহুতল রাজনীতিতে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও আইনি লড়াই
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের সাথে কঠিন সহানুভূতিহীন রাজনীতির মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং আইনি-রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতিও তিনি সরব ভূমিকা পালন করেছেন।
দেশের রাজনীতিতে ক্ষত
তার রাজনৈতিক জীবন ও নেতৃত্ব শুধু বিএনপি বা বিরোধী দল নয়; সমগ্র বাংলাদেশে এটি একটি বদল আনতে চাওয়া রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক ছিল। আজকের তার প্রয়াণ দেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোও তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছে; নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ, ছাত্র–যুব সমাজ—সবার হৃদয়ে আজ শূন্যতার অনুভূতি বিরাজ করছে।
জন্ম ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
বেগম খালেদা জিয়া ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি সৈনিক ও রাজনৈতিক নেতা জিয়াউর রহমান-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বেগম জিয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দমন নীতির ফলে কয়েক মাস ধরে ঘরবন্দি ছিলেন।
রাজনীতিতে পদার্পণ— এক গৃহবধূর রাজনৈতিক স্বপ্ন
জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে নিহতের পর খানিকটা সময় বিরক্ত ও আমূল বদলে যাওয়া পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বেগম জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (BNP) সাধারণ সদস্য হন এবং দ্রুত দলের উচ্চ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৪ সালে তিনি BNP-এর চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন — দেশবাসী চোখে তিনি তখনকার রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপসহীন এক নেত্রীর চিত্র তৈরি করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উত্থান
১৯৯১ সালের নির্বাচনে BNP-led জোটের নেতৃত্বে জয়লাভের পর খালেদা জিয়া বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন, এবং একইসাথে এই পদে আসা দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে আবদ্ধ হন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম মেয়াদে তিনি অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি নারীর সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ নেন, যদিও তার সময়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক অবিচ্ছিন্ন সংকটও দেশের সামনে আসে।
১৯৯৬ সালে আবার নির্বাচনে জয়ী হলেও বিরোধীদের বয়কটের কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ২০০১ সালে আবারো ক্ষমতা ফিরে পান এবং দায়িত্ব পালন করেন ২০০৬ সালের শেষ পর্যন্ত।
নিয়মিত রাজনৈতিক টানাপোড়েন
খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সাথে জুড়ে ছিল,মামলা, কারাগারের দিনও। ২০০৭ সালে সেনাবাহিনিবাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তিনি কারাগারে যান জিডি গ্রুপ ও অনুদান আত্মসাৎ মামলায়।
পরের বছরের পর আবার বিশাল পুলিশি-আদালতি ব্যবস্থায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তাঁকে আদালতের মাধ্যমে অভিযুক্ত করে।
রাজনীতিতে প্রভাব ও বিরোধী সম্পর্ক:খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক ছিলো শেখ হাসিনা-র সঙ্গে দীর্ঘ ও তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুই নেত্রী প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ রাজনীতিকে আধিপত্য করার জন্য একে অপরের সাথে জটিল প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে ছিলেন।এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া সবসময় ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিক।খালেদা জিয়া যেসব সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন, সেই সময়ের সরকারের প্রচেষ্টায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন।
বাংলাদেশ রাজনীতিতে স্থায়ী প্রভাব
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনটি মৌলিক প্রভাব রেখেছে:
১. মহিলাদের নেতৃত্বের পথ প্রশস্ত করা— একজন গৃহবধূ থেকে জাতীয় নেত্রী হওয়ার গল্প তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অনন্য দিক।
২. রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মাত্রা— বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বে তিনি শক্ত অবস্থান ও প্রভাব তৈরি করেছিলেন।
৩. গণতন্ত্র ও বিরোধী রাজনৈতিক ভূমিকা— দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপ, আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিরোধী দলের ভূমিকা শক্তিশালী করেছেন।
জনতার আওয়াজ/আ আ