গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো গোয়েন্দা সংস্থার কাজ নয় - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ১:২৮, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো গোয়েন্দা সংস্থার কাজ নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, আগস্ট ২৫, ২০২৫ ৩:২০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, আগস্ট ২৫, ২০২৫ ৩:২০ অপরাহ্ণ

 

ব‍্যারিস্টার নাজির আহমদ

প্রত‍্যেক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে এক বা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা থাকে, হোক সেটা উন্নত রাষ্ট্র অথবা একেবারে দরিদ্র রাষ্ট্র। এটা রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল লক্ষ্য ও কাজ হচ্ছে তথ‍্য জোগাড় ও আদানপ্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে রক্ষা, নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সংবিধান সমুন্নত রাখতে সংশ্লিষ্টদের (যেমন: সরকার, সরকারের সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রভৃতি) সহযোগিতা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো বা হস্তক্ষেপ অথবা বিরোধী দলকে নিপীড়ন করা মোটেই গোয়েন্দা সংস্থা কাজ নয়। দু:খজনক হলেও সত্য যে, এমনটি চলে আসছে আমাদের দেশে অতীতে যার চূড়ান্ত রূপ ছিল গত ষোল বছর।

ফেডারেল ব‍্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ও সিকিউরিটি সার্ভিস। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান। এফবিআই -এর মিশন হচ্ছে “protect the American people and uphold the Constitution of the United States” (অর্থাৎ “আমেরিকান জনগণকে রক্ষা করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সমুন্নত রাখা”)।

অপরদিকে, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা। সিআইএ’র কাজ হচ্ছে “advancing national security through collecting and analyzing intelligence from around the world and conducting covert operations” (অর্থাৎ “বিশ্বজুড়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং গোপন অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তাকে এগিয়ে নেয়া”)। বিশ্বের অনেক অপকীর্তির (Notoriety) জন্য এই সংস্থা আলোচিত ও সমালোচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং সিআইএ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কখনও মাথা ঘামায় না বা কখনও হস্তক্ষেপ করে না। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র। তাদের কাছে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মরণাস্ত্র। শক্তি আর অস্ত্র যদি গোয়েন্দা সংস্থার শক্তিশালী ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের হেতু বা কারণ হতো তাহলে এফবিআই এবং সিআইএ তা নির্দ্বিধায় করতো, কেননা তারা এবং তারা যে বাহিনীর সদস‍্য তাদের কাছে আছে পারমাণবিক অস্ত্র, আছে হাইড্রোজেন বোমা যা দিয়ে আমেরিকা তো বটেই পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে পারে! সুতরাং শক্তি ও অস্ত্র থাকলেই যে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে হবে, নাগরিকদের উপর চড়াও হতে হবে, বিরোধী দলের লোকদের নিপীড়ন করতে হবে বিষয়টি এমন নয়।

ট্রাম্পের মতো বিচিত্র ও অনেকটা আজগুবি টাইপের ব্যক্তিত্বও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। বিশ্বের অনেকের কাছে ট্রাম্প বেমানান হলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ সরাসরি ভোটে তাকে নির্বাচিত করেছে। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসেছেন। ক্ষমতায় আসার আগে অনেক টালমাটাল অবস্থা ছিল। চেষ্টা করেছিলেন ক‍্যাপিটল হিল দখলের। তাকে হত্যার জন্যও চেষ্টা করা হয়েছিল প্রকাশ্য জনসভায়। এতোকিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই কখনো আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেনি। কে ক্ষমতায় আছেন বা আসবেন এটা তাদের মাথা ঘামানোর ব্যাপার নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও বিভিন্ন দেশে সিআইআইের তৎপরতা ও অপারেশন সম্পর্কে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও সিআইএ তার নিজের দেশের সরকার ও রাজনীতি নিয়ে কখনও হস্তক্ষেপ করেনি।দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা বস্তুত: শক্তিশালী গোয়েন্দা দুটির ডিকশোনারিতেই নেই!

ঠিক অনুরূপভাবে, যুক্তরাজ্যের MI5 হচ্ছে অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এবং MI6 হচ্ছে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা। এই দুটি গোয়েন্দা সংস্থা অত্যন্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত। কিন্তু তারা কখনই বৃটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় না। বৃটেনে গত এক দশকের রাজনীতি ছিল টালমাটাল। ব্রেক্সিট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাঁচ বছরের পার্লামেন্টের মেয়াদে একাধিক বার পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছে। এমনকি সরকারে থাকা দল ও রাজনীতির অস্থিতিশীলতার কারণে এক বছরে তিন তিনজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে বৃটেন! রাজনীতিতে এমন অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলত থাকার পরও গোয়েন্দা সংস্থা দুটি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি বা করার চিন্তাই করেনি। গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা কোনো নাগরিককে গুম করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গণমাধ্যমে চাপ বা হুমকি – এগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে অচিন্তনীয় ও অকল্পনীয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রটি Nation State হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারছে না তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রচ্ছন্ন হুমকি ও হস্তক্ষেপের কারণে। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বলা হয় সেখানে আছে “A State within a State” (অর্থাৎ “একটি রাষ্ট্রের মধ‍্যে আরেকটি রাষ্ট্র”)। ডীপ স্টেট তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অস্থিরতা যেন পাকিস্তানের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গণতন্ত্র সেখানে লাগসই হতে পারছে না, পারছে না প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে।

সরকার আর রাষ্ট্র এক নয়। রাষ্ট্রের বিরোধিতা আর সরকারের বিরোধিতা এক জিনিস নয়। বাংলাদেশে অনেকে এমনকি সরকারে যারা থাকেন তারাও একটার সাথে আরেকটার তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। রাষ্ট্র সবার, সব নাগরিকের। ১৮ কোটি মানুষ যদি রাষ্ট্রের মধ্যে থাকে তাহলে রাষ্ট্রটি ১৮ কোটি মানুষের। অপরদিকে সরকার হচ্ছে এক বা একাধিক দলের বা বড়জোর একটি জোটের। বেশিরভাগ সময় দেশের শতকরা পঞ্চাশ ভাগের চেয়েও কম মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠিত হয়। সরকারের বিরোধিতা করা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ যার শাস্তি সর্বোচ্চ দণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

কোনো সরকার রাষ্ট্রের শেষ সরকার নয় বা কোনো বিশেষ সরকার (particular government) রাষ্ট্রের জন‍্য অপরিহার্যও নয়। কোনো বিশেষ ব‍্যক্তি বা দল রাষ্ট্রের বিকল্পও নয়। রাষ্ট্র স্থায়ী সত্তা বা আইডেনটিটি, অপরদিকে সরকার ক্ষণস্থায়ী যার পরিবর্তন ঘটতে পারে কয়েক দিনের ভিতরে! মুশকিল হলো- বাংলাদেশে যারা ক্ষমতায় যায় তারাই মনে করে সবকিছু – তারাই রাষ্ট্র, তারাই রাষ্ট্রের জন‍্য অপরিহার্য। তাদের বিরুদ্ধে বলা মানেই যেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলা! অন্তত: এমনটি প্রমাণ করেছে পতিত সরকার।

আমাদের দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দায়িত্ব, কাজ ও ভূমিকায় আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। তাদের কাজগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ (define) করে দেয়া উচিত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজে ও তৎপরতায় কঠোর ও কঠিন মনিটরিং করা দরকার। তাদেরকে যথাযথ জবাবদিহিতার আওতায় আনা অতি জরুরি। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো বা হস্তক্ষেপ মোটেই তাদের কাজ নয়। আয়না ঘর বানিয়ে নাগরিকদের নিয়ে বছরের পর বছর রাখা, রাষ্ট্রের নাগরিকদের গুম করা, বাসা থেকে কোনো পরোয়ানা ছাড়াই সাদা পোশাকে উঠিয়ে নেয়া, সরকারি দলে ভেড়ানো, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ও ফলাফল ম‍্যানোপুলেট করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জাতীয় দৈনিকের সম্পাদককে তুলে নেয়ার হুমকি, গণমাধ্যমে চাপ ও হয়রানি – এগুলো কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার কাজ হতে পারে না। অথচ এগুলোই চলেছে স্বাধীন দেশে বেপরোয়াভাবে গত দেড় যুগে।

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের মালিক জনগণ (অনুচ্ছেদ ৭)। ক্ষুদ্র থেকেই বৃহতের সৃষ্টি। ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল। ঠিক তেমনি একজন একজন মিলেই ১৮ কোটি জনগণ। একজন নাগরিক হয়তো মিলিয়নস-এর মধ‍্যে একজন, কিন্তু তিনিই একা তার পরিবারের জন‍্য মিলিয়নস! স্বাধীন রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীনদের ঈশারা ও আদেশে এবং আঙুলি হেলনে নাগরিকের তুলে নেবে, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (due process) ছাড়া মেরে ফেলবে এটা সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কল্পনাতীত। গত ৫৪ বছরে, বিশেষ করে গত ১৬ বছরে অনেক হয়েছে। আর না। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো বা হস্তক্ষেপ মোটেই গোয়েন্দা সংস্থার কাজ নয়।

অনেক দুর্নাম আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কুড়াতে হয়েছে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের বেআইনি, কুমতলবি ও স্বার্থান্বেষী আদেশ এবং অযাচিত চাপের কারণে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নতুন উদ্যমে ঢেলে সাজানো দরকার যাদের কেবলমাত্র কাজ হবে রাষ্ট্রকে রক্ষা, জনগণকে নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের সংবিধান সমুন্নত রাখতে সংশ্লিষ্টদের সাহায্য করা। ক্ষমতাসীন সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করা নয় বরং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের মূলমন্ত্র (motto) হবে কেবলমাত্র সংবিধান, শুধুমাত্র সংবিধান।

লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ