গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে ইসিকে যেসব পরামর্শ দিলেন বিশিষ্টজনরা
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, মার্চ ২২, ২০২২ ৫:৫২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, মার্চ ২২, ২০২২ ৫:৫২ অপরাহ্ণ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করে আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন দেশের ১৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক। মঙ্গলবার (২২ মার্চ) সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপে সংলাপে বসে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। এতে ৪০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও অংশ নেন বিভিন্ন পেশার ১৯ বিশিষ্টজন।
সংলাপে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিশিষ্টজনরা বলেন, শুধু বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। যদি কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ না পায়, সেক্ষেত্রে পদত্যাগ করা উচিত।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করা, ইভিএম নিয়ে বিতর্কের অবসান, ডিজিটাল কারচুপি রোধ, দলীয় সরকারের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করা, নির্বাচনকালীন মাঠে সব প্রার্থী ও তার সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপের সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা হলেন- গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, মোস্তাফিজুর রহমান ও সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক শামীম রেজা, আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন, লিডারশিপ স্টাডিজ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. সিনহা এম এ সাঈদ, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ, সাবেক সচিব আব্দুল লতিফ মণ্ডল, সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বেগম শাহীন আনাম, নিজেরা করি’র কো-অর্ডিনেটর খুশী কবির, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, বাংলাদেশ ইনডিজিনিয়াস পিপলস ফোরাম সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং ও সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ (সিইউএস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রাইটস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট জহুরুল আলম ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহিউদ্দীন আহমেদ।
সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা ইসির চ্যালেঞ্জ হবে। নির্বাচনকালীন আইন-বিধির যথাযথ প্রয়োগ করতে পারেন কি না, তা দেখা যাবে। অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করবেন। সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, প্রতিবন্ধকতা এলে পদত্যাগের সাহস রাখবেন।
তিনি বলেন, ইভিএমের ব্যবহার চরমভাবে বিতর্কিত হচ্ছে। এটা থেকে দূরে থাকা ভালো। ইভিএম নিয়ে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ইভিএম ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিন বলেন, ভোটের আগে ও পরে ছয় মাস নির্বাচনকালীন কর্তৃত্ব কমিশনের কাছে থাকা উচিত। ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ সংসদের অধিবেশন থাকবে না। এজন্য ভোটের আগে চার মাস এবং ভোটের পরে দুই মাস- এই ছয় মাসের জন্য ক্ষমতা ইসির হাতে থাকতে পারে। আস্থা অর্জন করতে পারলে সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ভোট করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ইভিএম সব সময় বিতর্কিত। এটার সমাধান না করে ব্যবহার করা ঠিক নয়। জোরের সঙ্গে বলবো- ইভিএম ব্যবহার না করার জন্য।
লিডারশিপ স্টাডিজ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. সিনহা এম এ সাঈদ বলেন, ‘ইসির এত সংলাপ করার অর্থ হচ্ছে, এখানে সংকট রয়েছে। আপনার কাজ দিয়ে প্রমাণ করুন, আস্থা অর্জন করুন সবার। নির্বাচনের সময় কতটুকু নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে আমি আশাবাদী মানুষ।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন- নির্বাচনকালীন সরকারের চরিত্রের ধরন, কেমন নির্বাচন হবে, এ নিয়ে বিদ্যমান আইনে কী ধরনের পরিবর্তন আনা যায়, সেসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আইনে কোনো পরিবর্তন করা যায় কি না, তা চিহ্নিত করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকারের অনুগত না থেকে রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে ইস্তফা দেবেন। সব অংশীজন, ভোটার, আমরা আপনাদের পক্ষে আছি।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ক্ষমতায় থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। গত দুটি নির্বাচনে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করার বিষয়টি সরকার প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভোটাররা নির্বাচনবিমুখ হয়ে পড়েছেন। ইসি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অতীতের ভুলভ্রান্তি স্বীকার করে কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সার্চ কমিটির কারণে বর্তমান কমিশন কিছুটা আস্থা সংকটে পড়েছে। সবার নাম প্রকাশ করেনি কমিটি। এছাড়া নূরুল হুদা কমিশনের সাবেক সচিব ও আরেক সাবেক সচিবের শ্বশুর আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় নতুন ইসির দুই সদস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ইভিএমের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, বিনা টেন্ডারে কীভাবে ইভিএম এলো। ইভিএম নিয়ে একজনের এত উৎসাহ কেন, তা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। কোনোভাবে বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে না। চাইলে ৫-১০ কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করতে পারেন। তবে এটা না হওয়াই ভালো।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সাহসী পদক্ষেপ ও সত্য বলার পরামর্শ দিয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশের বিরাট একটি রাজনৈতিক দল বয়কট করে বেড়াচ্ছে, এটা তো বিরাট সমস্যা। অনেকে বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়।’
সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইভিএম ব্যবহার করলেই প্রশ্নবিদ্ধ হবেন। এটাকে (ইভিএম) এড়িয়ে একটি ভালো ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন দেবেন।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ যন্ত্রে যে ম্যানুপুলেট করা যায় না, তা নিশ্চিত না করে আর ব্যবহার করা যাবে না।
এসময় বিশিষ্টজনদের মতামত পর্যালোচনা করে অংশগ্রহণমূলক ভোট করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল।
সিইসি বলেন, ইভিএমে অনেকে অভ্যস্ত নয়। ইভিএমের প্রতি আস্থা নিয়েও কথা উঠেছে। ইভিএমে কোনো অসুবিধা আছে কি না, মেশিনের মাধ্যমে ভোটে কোনো ডিজিটাল কারচুপি হয় কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
ইভিএমের ইতিবাচক দিকই বেশি উল্লেখ করে সিইসি বলেন, ইভিএমের ভালো দিকও রয়েছে, দ্রুত ভোট গণনা করা যায়। তবে পুনর্গণনা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। কারিগরি কমিটির সঙ্গে বৈঠক করে ইভিএম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিতে হবে। কেউ কেউ বলেছেন, সঠিক হলে তা চালিয়ে যেতে হবে। কাজে না লাগলে বর্জন করাই ভালো।
জনতার আওয়াজ/আ আ